হাসনাত কাইয়ুম সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতি। হাওরের মানুষের অধিকার আদায়ের আন্দোলন করতে গিয়ে কারাভোগ করেছেন। তিনি বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের প্রতিষ্ঠাকালীন সহসভাপতি এবং বাংলাদেশ লেখক শিবিরের সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেছেন। বিএনপি সরকারের করা খসড়া সাইবার সুরক্ষা আইনের বিভিন্ন দিক নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন আজকের পত্রিকার মাসুদ রানা।
আমি মনে করি, এটা শুধু সাইবার সুরক্ষা আইনের বিষয় নয়। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর অন্তর্বর্তী সরকারের করা যেসব আইনে কিছু পরিমাণে জনগণের মানবাধিকার রক্ষার চেষ্টা ছিল, সেগুলোর প্রায় সবকটিই তারা বাতিল করে নতুনভাবে করতে চেয়েছে, নয়তো সংশোধন করা হচ্ছে নিজেদের স্বার্থে। এর মাধ্যমে জনগণের অধিকারের বদলে সরকারের, সরকারি প্রতিষ্ঠানের এবং সরকারের সঙ্গে দায়িত্ব পালনকারী বিভিন্ন ব্যক্তিবর্গের ক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে। জনগণের ওপর সেই ক্ষমতা প্রয়োগের বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা তারা শুরু থেকেই করে আসছে। কেন তারা এটা করছে, সেটা আমি জানি না। কিন্তু গত ছয়-সাত মাসে তারা যতগুলো আইন করার চেষ্টা করেছে, তার সবগুলোই জনগণের বিপক্ষে যাবে, এটা এখন স্পষ্ট। সাইবার সুরক্ষা আইনের প্রস্তাবও এর বাইরে নয়।
উদ্দেশ্যর দিক থেকে আমি কোনো পার্থক্য দেখি না। কিছু শব্দে বা কিছু ধারায় পার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু আমি যেকোনো আইনকে একভাবে দেখি। প্রথমত, সরকার আইনটা কী উদ্দেশ্যে করছে। হাসিনার সরকারকে স্বৈরতান্ত্রিক বলা হয়। সে সরকার জনগণকে দমন করে ক্ষমতায় থাকার জন্য আইন ও প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করেছে এবং জনগণের অধিকার কেড়ে নিয়ে প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতা বাড়িয়েছে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকার ক্ষমতায় থাকে জনগণের সন্তুষ্টির ওপর ভর করে। তখন সরকার এমন আইন করে, যা জনগণের ক্ষমতা বাড়ায়, যাতে মানুষ কথা বলতে পারে, শান্তিতে চলতে পারে এবং অকারণে হয়রানির শিকার না হয়। কোনো সরকার গণতান্ত্রিক শক্তি হলে সে বুঝবে, জনগণ যদি তার সময়ে নিজের অধিকার ভোগ করতে পারে, তাহলে পরেরবার আবারও তাকে ক্ষমতায় আনবে।
এবার নির্বাচনের মধ্য দিয়ে যে সরকার এসেছে, তারা দীর্ঘ স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থা এবং তিনটি নির্বাচনী তামাশার পর একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মধ্য দিয়ে এসেছে। তারা বলেছে, জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা করবে। তারা অভ্যুত্থানের পক্ষে দাঁড়িয়েছে। নির্বাচনী ইশতেহারেও তারা বলেছে, জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চায়। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, হাসিনার আমলের সেই দর্শন থেকে তারা বের হতে পারেনি।
অনেক জায়গায় প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতা এমনভাবে রেখে দেওয়া হয়েছে, যাতে প্রয়োজন হলে জনগণের বিরুদ্ধে আইনের অপব্যবহার করা যায়। আইনটা ব্যবহার করতে চাইলে তারা সেটা করতে পারবে। তাই আমি মনে করি, মৌলিক কোনো পার্থক্য নেই আসলে।
আমি মনে করি এর কোনো যৌক্তিকতা নেই, একদমই নেই। এগুলো আসলে মানুষকে ভয় দেখানো ও হেনস্তা করার উপায়। আর যে আইন আছে, সেটাও না মানার একটা প্রক্রিয়া। মানহানির আইন এখন আর মানা হচ্ছে না। মানহানিকে এমন জায়গায় নেওয়া হয়েছে যে এটা আর ব্যক্তিগত বিষয় নেই। এটা এখন দলীয় ও ক্ষমতাসংশ্লিষ্ট বিষয়ে পরিণত হয়েছে। যারা রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকে, তাদের ‘মান’ থাকে, আর মামলা করার জন্য দলের যে কেউ দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে এগিয়ে আসে। আইন অমান্য করে। মানে যার মানহানি হয়েছে তাকে বাদ দিয়ে অন্য লোক মামলা করে, শুধু অন্যকে হেনস্তা করার জন্য। আদালত সেই মামলা গ্রহণ করে, মামলা চলে, আসামি গ্রেপ্তার হয়, জেলে যায়। এই পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে নতুন নতুন অস্পষ্ট আইন তৈরি করা হয়, যাতে ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে কেউ কথা বলতে না পারে।
ধরুন, আপনি ক্ষমতায় থেকে চুরি করলেন। আপনার চুরির বিরুদ্ধে কেউ কথা বললে তখন বলা হবে, তার মানহানি হয়েছে। আর চোর নিজে মামলা না করে তার অনুসারীরা এসে মামলা করবে। এভাবে আইন অমান্য করে এক ধরনের বেআইনি প্রক্রিয়া এখন আইনের নামে বাংলাদেশে চলছে। সেই প্রক্রিয়াকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার জন্যই এসব বিষয় সাইবার আইনে ঢোকানো হচ্ছে।
না। তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। নিশ্চয়তা থাকলে আমরা সরকারের কর্মকাণ্ড অন্য রকম দেখতাম। মানবাধিকার কমিশনের আইনেও সেটা থাকত বা আরও শক্তিশালী করা হতো। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা তো পরের কথা, আপনি সঠিক সাংবাদিকতা করলেও এই আইনে যেসব ঢালাও বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, তা দিয়ে যেকোনো সময় আপনার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি রাখা হয়েছে। এটাই এখানে পরিষ্কার। আজ হয়তো করছে না, কিন্তু কাল করবে না, সেটাও পরিষ্কার নয়। জুলাই আন্দোলনের রক্ত শুকানোর আগেই ছয়-সাত মাসের মধ্যে যদি হাসিনার আইনের মতোই আইন করা হয়, তাহলে এটা রাজনৈতিকভাবে অপব্যবহার হবে না, এমন ভাবার কোনো কারণ নেই।
কোনো আইন কতটা অসৎ উদ্দেশ্যে করা হয়েছে, তার একটা প্রধান লক্ষণ হলো তাতে দায়মুক্তির ধারা যুক্ত করা হয়েছে কি না। কাউন্সিল থেকে মানবাধিকার কমিশনকে সরানোর কারণ কী? এর অর্থ হলো, আপনি ধরেই নিয়েছেন আপনি মানবাধিকার লঙ্ঘন করবেন। এটা খুবই পরিষ্কার। মানুষের অধিকার হরণ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের পর যাতে কোনো দায় নিতে না হয়, সে জন্যই দায়মুক্তির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
সুরক্ষার ধারণাটা হওয়ার কথা ছিল নাগরিকের সুরক্ষা এবং সেই সুরক্ষা নাগরিকের কাছ থেকেও লাগবে, রাষ্ট্রের কাছ থেকেও লাগবে। অথচ এই আইনগুলো করা হয়েছে রাষ্ট্র, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রক্ষমতা ভোগকারীদের সুরক্ষা দেওয়ার জন্য এবং জনগণের মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য। আর লঙ্ঘন করলে তারা দায়মুক্তি পাবে। এটাই এ আইনের মূল কথা।
তারা যেভাবে নিজেদের জন্য দায়মুক্তি নিয়েছে, সেভাবে যদি সংজ্ঞা দিয়ে বলত যে স্বাধীন সংবাদ সংস্থা বা যারা জনস্বার্থে কাজ করে, যারা সংবাদ প্রতিষ্ঠানে কাজ করে, তাদের ক্ষেত্রে এটা প্রযোজ্য হবে না, তাহলে বলা যেত তাদের সৎ উদ্দেশ্য আছে। কিন্তু আইন যদি এমন হয় যে সরকারি প্রতিষ্ঠান দায়মুক্তি পাবে আর মিডিয়া হাউস থেকে শুরু করে সবাই আইনের আওতায় থাকবে, তাহলে সরকারি প্রতিষ্ঠানের সমালোচনা করলে চাপ আপনার ওপরই আসবে। এটা খুবই স্বাভাবিক।
ভ্রাম্যমাণ আদালতকে সাইবার অপরাধের বিচারের এখতিয়ার দেওয়ার প্রস্তাব কতটুকু সংবিধানসিদ্ধ এবং উচ্চ আদালতের বিচার বিভাগীয় রায়ের সঙ্গে এর কোনো সাংঘর্ষিকতা রয়েছে কি?
ভ্রাম্যমাণ আদালত নিজেই একটি অসাংবিধানিক ব্যবস্থা। ভ্রাম্যমাণ আদালত এত দিন নানা রকম মামলা-মোকদ্দমা করে এসেছে। এখন সাইবার অপরাধের মতো একটি বিষয় যদি তার হাতে দেওয়া হয়, তার মানে দাঁড়ায় অপরাধ করার আগেই আপনার বিচার এবং সাজাও হয়ে যাবে। তাহলে তো আর ট্রাইব্যুনাল রাখারই দরকার নেই।
আমি মনে করি, এসব রাষ্ট্র, সরকার বা প্রতিষ্ঠানের হাতে এমন ক্ষমতা তুলে দেওয়া, যাতে তাদের সমালোচনা করা, ভুলভ্রান্তি ধরিয়ে দেওয়া, ত্রুটি-বিচ্যুতি তুলে ধরার স্বাভাবিক প্রবণতাকে দমন করা যায়। আমরা যেভাবে গণতান্ত্রিক অধিকার, মানবাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার কথা বলি, সেই জায়গাগুলো খর্ব করার একটা সামগ্রিক পরিকল্পনার সুনির্দিষ্ট অংশ হলো ভ্রাম্যমাণ আদালতের হাতে এই ক্ষমতা দেওয়া। এটা সুনির্দিষ্ট না করে ঢালাওভাবে রাখা হলে বোঝা যায়, আপনি জনগণের ওপর একটা ত্রাস চালাতে চাইছেন।
আমি এই পর্যবেক্ষণের সঙ্গে একমত। যে অঙ্গীকার তারা বিরোধী অবস্থানে থেকে করেছিল, ক্ষমতায় এসে তার উল্টো পথে হাঁটছে।
এসব সংশোধনী তো হাসিনার চেয়েও এক ধাপ এগিয়ে আইনগুলোকে কঠোর করেছে। বিএনপি সরকার কি তাহলে হাসিনার পথেই হাঁটছে?
আমি বলব, তারা হাঁটতে শুরু করেছে। কারণ, আইনগুলো তারা বানাচ্ছে। আইনের প্রয়োগ শুরু হলে তখন বোঝা যাবে তারা হাসিনা হয়ে উঠেছে কি না। কিন্তু এখনই দেখা যাচ্ছে, হাসিনার আমলের হাতিয়ারগুলোকে তারা আরও শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে। এই অস্ত্র তারা মজুত করছে জনগণের ওপর প্রয়োগ করার জন্য।
আপনারা যাকে সরকারি দল আর বিরোধী দল বলেন, আমি তাকে বলি সরকারের প্রধান অংশ আর অপ্রধান অংশ। অপ্রধান অংশ সরকারের সব সুবিধা উপভোগ করে। আপনারা দেখবেন, প্রধান ও অপ্রধান অংশের মধ্যে কিছু কিছু প্রশ্নে মৌখিকভাবে ভিন্ন ভাষা বা ভিন্ন মত থাকলেও যখন জাতীয় স্বার্থবিরোধী কিছু আসে, দলগুলো নিজেদের স্বার্থ বা তাদের বিদেশি প্রভুদের স্বার্থের প্রশ্ন আসে, তখন তারা নিশ্চুপ থাকে। মার্কিন চুক্তির বেলায় এটা স্পষ্ট। সেখানে সংসদে কোনো বিরোধী দল খুঁজে পাবেন না। অর্থাৎ মৌলিক জনবিরোধী জায়গাগুলোতে সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে কোনো মৌলিক পার্থক্য নেই।
বাংলাদেশে যারা প্রচলিত রাজনীতিতে আছে, তাদের প্রত্যেকেই এসব আইনের সুফল ভোগ করবে। শেখ হাসিনার আমলের জনগণ-দমনের এই হাতিয়ারগুলো এখন খালেদা জিয়ার সন্তানের সময়ে ব্যবহার হবে। আর খালেদা জিয়ার সন্তান যে হাতিয়ার বানাচ্ছেন, সেগুলো ভবিষ্যতে বিরোধী দলে যারা আছে, তারাও ব্যবহার করবে। এটাই শাসনের ধারাবাহিকতা। এর বিপরীতে জনগণের ক্ষমতায়ন দরকার, আর সে জন্য জনগণের রাজনীতি লাগবে। সেই জায়গা থেকে জনগণের শক্তিকেই এর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে এটা বন্ধ করতে হবে। বিরোধী দল এটা বন্ধ করে দেবে, এমন আশা করলে আপনার-আমার বড় ক্ষতি হয়ে যাবে।
আমার প্রস্তাব হলো, আইনটাকে সুনির্দিষ্ট করতে হবে। সাইবার মাধ্যম ব্যবহার করে যাতে কেউ জনগণের ক্ষতি করতে না পারে, আইনের চিন্তা, আইনের ধারণা ও মূলনীতি সেই জায়গায় নিয়ে যেতে হবে। মৌলিক অধিকার যাতে কেউ নষ্ট করতে না পারে, সে জন্যই মানুষের সাইবার সুরক্ষা দরকার। কিন্তু জনগণের সুরক্ষা আর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সুরক্ষাকে যখন আপনি এক করে ফেলেন, তখন আইনটা আর জনগণের কাজে আসে না।
সেখানে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে, সরকার জনগণের বিরুদ্ধে এই আইনকে ব্যবহার করার একটা বাজে পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। আইনটাকে যদি শুধু সাইবার সুরক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয় এবং এর মধ্যে ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা বা মানহানির মতো বিষয় না আনা হয়, তাহলেই এই আইন জনগণের স্বার্থে কাজে লাগতে পারে এবং রাষ্ট্র জনগণকে প্রকৃত সুরক্ষা দিতে পারে।