একটি রাষ্ট্রের অর্থনীতি কতটা স্থিতিশীল, তার অন্যতম সূচক হলো সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান কেমন? যখন মানুষ প্রতিদিনের বাজার খরচ, যাতায়াত ব্যয় কিংবা পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে হিমশিম খায়, তখন উন্নয়নের হিসাবের পাশাপাশি জনজীবনের বাস্তবতাও নতুন করে মূল্যায়নের প্রয়োজন দেখা দেয়। সম্প্রতি জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি বাংলাদেশের অর্থনীতি ও জনজীবনে এমনই এক নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সরকার সম্প্রতি ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রল ও অকটেনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বৃদ্ধি করেছে। প্রশ্ন হলো, আন্তর্জাতিক বাস্তবতার এই চাপের পুরো বোঝা কি সাধারণ মানুষের ওপর বর্তানো উচিত? অর্থনীতির হিসাব যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ মানুষের জীবন ও জীবিকার হিসাবও।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সবচেয়ে তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়েছে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শহরে মোটরসাইকেলনির্ভর কর্মজীবীদের ওপর। বর্তমানে হাজার হাজার তরুণ রাইড শেয়ারিং, অনলাইন ডেলিভারি, কুরিয়ার সেবা ও বিভিন্ন পরিবহনভিত্তিক পেশার মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন। তাঁদের অধিকাংশের আয় নির্ভর করে দৈনিক ট্রিপসংখ্যার ওপর। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির ফলে তাঁদের প্রতিদিনের ব্যয় বেড়ে গেলেও আয় সেই অনুপাতে বাড়বে না।
জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির দ্বিতীয় বড় অভিঘাত আসে পরিবহন খাতে। বাংলাদেশে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের বড় অংশই ডিজেলনির্ভর। ফলে ডিজেলের দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়া স্বাভাবিক। ইতিমধ্যে পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধি করা হয়েছে। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত কর্মজীবী মানুষের ওপর, যারা প্রতিদিন কর্মস্থলে যাতায়াতের জন্য গণপরিবহনের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সমস্যার গভীরতা এখানেই শেষ নয়। জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির প্রকৃত অভিঘাত শুরু হয় বাজারব্যবস্থায়। কৃষকের খেত থেকে বাজারে সবজি পৌঁছানো, খামার থেকে মাছ-মাংস পরিবহন, শিল্পকারখানা থেকে ভোক্তার কাছে পণ্য সরবরাহ—সবকিছুতেই পরিবহন ব্যয় একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ফলে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির কারণে প্রায় সব ধরনের পণ্যের উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যয় বেড়ে যাবে। ফলে তার প্রভাব সব কিছুতেই পড়বে।
বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ এমনিতেই মূল্যস্ফীতির চাপে রয়েছে। খাদ্যপণ্য, বাসাভাড়া, চিকিৎসা ব্যয় এবং শিক্ষা খাতে ব্যয় গত কয়েক বছরে ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর মধ্যে জ্বালানির নতুন করে মূল্যবৃদ্ধি বাজারে আরও মূল্যচাপ সৃষ্টি করেছে। বিভিন্ন অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি ও পরোক্ষভাবে মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিতে পারে।
তাই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব যেন নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনে সংকট তৈরি করতে না পারে, সে জন্য এ শ্রেণির মানুষের জন্য সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমের আওতায় আনতে হবে।
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির সুযোগ নিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা অযৌক্তিকভাবে বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়। তাই বাজার তদারকি ছাড়া এটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না। এ ছাড়া দীর্ঘ মেয়াদে জ্বালানি সমস্যা সমাধানে এ খাত নিয়ে নতুন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সৌরশক্তি, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান এবং জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো ছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা থেকে মুক্তির অন্য কোনো কার্যকর পথ নেই। আজকের বৈশ্বিক বাস্তবতা স্পষ্ট করে দিয়েছে যে আমদানিনির্ভর জ্বালানিব্যবস্থা একটি দেশের অর্থনীতিকে কতটা ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে।
রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অবশ্যই প্রয়োজন।
কিন্তু সেই স্থিতিশীলতা যেন সাধারণ মানুষের জীবনকে অনিশ্চিত করতে না পারে, সেই ভাবনা জরুরি। জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির এই সময়ে সরকারের প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও জনজীবনের প্রয়োজনের মধ্যে একটি ভারসাম্য তৈরি করা।