হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

নতুন সরকারের প্রথম দিন ও সামনের পথ

কামরুল হাসান

অঙ্গীকার উচ্চারিত হয়েছে। এখন সময় তা প্রমাণের। ছবি: সংগৃহীত

পবিত্র রমজান মাস শুরু হয়েছে গতকাল। এ সময় এলেই দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকারকে একটি বড় পরীক্ষা দিতে হয়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সব সময় বলে আসছে, দেশে উৎপাদন ও আমদানি চাহিদার তুলনায় সামঞ্জস্যপূর্ণ। কিন্তু বাস্তব ফল উল্টো। ফলমূল, সবজি, মুরগিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আগের মতো এবারেও বেড়েছে। মাঝে সিন্ডিকেটের কথাও শোনা যাচ্ছে। এর মাঝে সরকারের এক মন্ত্রী ফেসবুকে সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন। তাতে ফল কতটা হবে জানি না। তবে বাজার তদারকি জোরদার, সরবরাহ চেইনে স্বচ্ছতা এবং ভোক্তা সুরক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা ছাড়া পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হবেই মনে হচ্ছে। সরকারের এখনো ‘মধুচন্দ্রিমা’ শেষ হয়নি, তারপরও মনে রাখতে হবে, জনগণ খুব দ্রুত সময়ে স্বস্তি প্রত্যাশা করে। আর এই বাস্তবতা উপেক্ষা করার সুযোগও নেই।

দেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভা ও উপদেষ্টা পরিষদের প্রথম বৈঠকে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলার উন্নতিসহ তিন অগ্রাধিকার নির্ধারণ করেছেন। সরকার পরিচালনার শুরুতে এমন সিদ্ধান্ত বাস্তবসম্মত ও জনপ্রত্যাশার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। তবে এসব অগ্রাধিকার বাস্তবায়নে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা করা খুবই জরুরি। নতুন সরকারের প্রথম দিনেই স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে যে শক্ত অবস্থানের কথা প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, সেটা ইতিবাচক বলে আমরা মনে করি। তবে এ নীতি বাস্তবায়ন করতে গেলে শুরু থেকেই মন্ত্রিসভার সদস্যদের জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। সচিবদের সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা বিবেচনায় নয়; মেধার ভিত্তিতে মূল্যায়নের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, জনপ্রশাসনের সব স্তরেই তার বাস্তবায়ন প্রয়োজন।

দেশের অর্থনীতি কয়েক বছর ধরে টানাপোড়েনে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলেছে। খাদ্য, বাসাভাড়া, চিকিৎসা ও শিক্ষার ব্যয় বাড়ায় মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি চাপে রয়েছে। ব্যাংকিং খাতের শৃঙ্খলা, খেলাপি ঋণ—এসব প্রশ্নও উদ্বেগের। ভেঙে পড়া অর্থনীতিকে সঠিক পথে ফেরানো তাই সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা ছাড়া টেকসই স্থিতি আসবে না। দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করায় নতুন সরকারের ওপর জনপ্রত্যাশার চাপ স্বাভাবিকভাবেই অত্যন্ত বেশি। এই বিপুল সমর্থন যেমন রাজনৈতিক স্থিতি এনে দিয়েছে, তেমনি দ্রুত ফল দেখানোর বাধ্যবাধকতাও তৈরি করেছে।

মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠক শেষে ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা দেওয়ার ঘোষণা আশাব্যঞ্জক। তবে কর্মপরিকল্পনা যেন কেবল ঘোষণায় সীমাবদ্ধ না থাকে, তার সুস্পষ্ট সময়সূচি ও পরিমাপযোগ্য লক্ষ্য থাকা জরুরি। অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নে দ্রুত পদক্ষেপ প্রয়োজন। কয়েক বছর ধরে বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যে যে স্থবিরতা বিরাজ করছে, তা কাটাতে উদ্যোক্তাদের আস্থা ফেরানো অপরিহার্য। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি, প্রশাসনিক হয়রানি কমানো এবং নীতিনির্ধারণে পূর্বানুমানযোগ্যতা—এসবই আস্থা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হবে।

বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানির সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা নতুন সরকারের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। শিল্প উৎপাদন ও নাগরিক জীবনে এর সরাসরি প্রভাব রয়েছে। জ্বালানি খাতে পরিকল্পিত বিনিয়োগ, চুক্তির স্বচ্ছতা এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত না হলে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারও ব্যাহত হবে।

দুর্দশাগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর করা সরকারের আরেক বড় দায়িত্ব। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। দীর্ঘদিন ধরে যেসব অনিয়ম ও দুর্বলতা জমেছে, তা কাটাতে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রশাসনিক দৃঢ়তা প্রয়োজন। দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও নিরপেক্ষ অবস্থান না নিলে জনগণের আস্থা টেকসই হবে না।

নতুন সরকারের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসনব্যবস্থা। নির্বাচনে বিপুল জয় পাওয়া মানে এই নয় যে ভিন্নমত উপেক্ষিত হবে। বরং বিরোধী কণ্ঠকে গণতান্ত্রিক কাঠামোর অংশ হিসেবে সম্মান দেখানোই দীর্ঘ মেয়াদে রাজনৈতিক স্থিতি নিশ্চিত করবে। প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে নিরপেক্ষভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে।

সবশেষে, প্রথম দিনের প্রতীকী অঙ্গীকারকে বাস্তব নীতিতে রূপান্তর করাই হবে আসল পরীক্ষা। স্বাধীনতার চেতনা, গণতন্ত্র ও মানবিক রাষ্ট্রব্যবস্থার যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, তা বাস্তবে প্রতিফলিত হলে জনগণের আস্থা আরও সুদৃঢ় হবে। নতুন সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জ কম নয়; তবে শক্তিশালী জনসমর্থন ও স্পষ্ট নীতি থাকলে পথ অতিক্রম করা অসম্ভব নয়।

প্রথম দিনের অঙ্গীকারে যে উচ্চারণ ছিল—মানবিক, গণতান্ত্রিক ও সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠনের—তা এখন বাস্তব নীতিতে রূপ নেওয়ার অপেক্ষায়। ইতিহাস প্রতীকের কথা মনে রাখে, কিন্তু মূল্যায়ন করে কাজের ভিত্তিতে। নতুন সরকারের সামনে সুযোগ আছে—জনসমর্থনকে শক্তিতে রূপান্তর করে সুশাসন ও স্থিতিশীলতার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করার।

অঙ্গীকার উচ্চারিত হয়েছে। এখন সময় তার প্রমাণের। জনগণ আশাবাদী, তবে প্রত্যাশায় কঠোর। নতুন সরকারের সাফল্য নির্ভর করবে কত দ্রুত তারা প্রতিশ্রুতিকে বাস্তবে রূপ দিতে পারে, তার ওপর।

বাংলাদেশের নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্যদের সঙ্গে সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের মধ্য দিয়ে নতুন সরকারের কার্যক্রম শুরু করেছেন। রাষ্ট্র পরিচালনার আনুষ্ঠানিক সূচনাকে স্বাধীনতার চেতনার সঙ্গে যুক্ত করার এই পদক্ষেপ রাজনৈতিকভাবে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। পরিদর্শন বইয়ে তিনি মুক্তিযুদ্ধ, চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানসহ দেশের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র রক্ষায় আত্মদানকারী শহীদদের আকাঙ্ক্ষার একটি নিরাপদ, মানবিক, গণতান্ত্রিক ও সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। তাঁর এই কার্যক্রম ঐতিহ্যের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের পাশাপাশি সবার কাছে একটি বার্তাও পৌঁছে দেয়।

তবে মনে রাখতে হবে, গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পারে কেবল একটি কার্যকর জাতীয় সংসদ। সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নিয়ে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে যে মতপার্থক্য ও টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে, তা যেন কোনোভাবেই রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় রূপ না নেয়। মতভেদ গণতন্ত্রের স্বাভাবিক উপাদান; কিন্তু তার সমাধান হতে হবে সংসদের ভেতর আলোচনার মাধ্যমে। শক্তিশালী বিরোধী দল, গঠনমূলক বিতর্ক ও কার্যকর কমিটি ব্যবস্থা—এসবই সংসদীয় গণতন্ত্রকে প্রাণবন্ত করবে।

একুশের এক বিস্মৃত শহীদ আবদুস সাত্তার

মধ্যপ্রাচ্যে কি কোনো দিন শান্তি আসবে

মারণ-রাজনীতির নয়া হাতিয়ার এআই-অ্যালগরিদম

আরব বিশ্বের নতুন সমীকরণ

বাংলাদেশের অর্থনীতি: বর্তমান সমস্যা ও ভবিষ‍্যৎ অন্তরায়

‘কলি’র ক্রীতদাস

জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত

স্টারমার ও ৫০ ব্যবসায়ীর চীন সফরের অর্থনীতি

সুস্থ, সৎ ও মুক্তবুদ্ধির চর্চা দরকার

আর কবে জামায়াত এমন সুযোগ পাবে