হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

অর্থনীতি পাল্টে দিচ্ছে বিশ্বরাজনীতি

আব্দুর রাজ্জাক 

রাশিয়ার উৎপাদিত জ্বালানি তেল কী দামে কিনছে, তা গোপন রাখছে যুক্তরাষ্ট্র। ছবি: এএফপি

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে রাশিয়ার ওপর যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল অনেকগুলো। রাশিয়ার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি ও জাহাজসহ হাজার হাজার নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। রাশিয়ার এমন কোনো সেক্টর নেই যেখানে যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা দিতে বাকি রেখেছে। রাশিয়াকে চরম শিক্ষা দিতে চেয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। রাশিয়ার মানুষ যেন পুতিনের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলে, পুতিনকে ক্ষমতা থেকে নামিয়ে দেয়, এটাই ছিল যুক্তরাষ্ট্রের একমাত্র উদ্দেশ্য। কারণ, রাশিয়া ইউক্রেনের প্রথমে ক্রিমিয়া পরে পূর্ব দিকের দনবাসসহ বেশ কিছুটা অঞ্চল দখল করে নিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র ভেবেছিল রাশিয়াকে থামাতে হলে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে দিতে হবে।

মাসখানেক আগে কংগ্রেসে পাস করিয়ে নিয়েছে যে যদি ভারত রাশিয়ার তেল কেনে তাহলে প্রেসিডেন্ট ইচ্ছা করলে ভারতের ওপর ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করতে পারবে। এখনো এই শুল্ক কার্যকর হয়নি। তবে আইনটি এমনভাবে পাস করা হয়েছে যাতে প্রেসিডেন্ট ইচ্ছা করলে যেকোনো সময় তা কার্যকর করতে পারবেন। কিন্তু ভারত তারপরেও এই হুমকিকে পাত্তা দেয়নি। ভারত রাশিয়ার সঙ্গে তেল কেনার চুক্তি অক্ষুণ্ন রেখেছে। ভারতের বক্তব্য ছিল অনেকটা এমন—আমাদের অর্থনীতির চালিকাশক্তি জ্বালানি। তাই জ্বালানির নিশ্চয়তার জন্য আমাকে বিভিন্ন দেশ থেকে তা কিনতেই হবে। এই জ্বালানি ক্রয়ের ক্ষেত্রে আমি কারও সঙ্গে কোনো আপস করব না।

রাশিয়া থেকে তেল কেনার আরেকটি বড় কারণ হলো রাশিয়ার তেল সস্তা। আর ভারতের কাছে রাশিয়া ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কম মূল্যে তেল বিক্রি করে থাকে। যুক্তরাষ্ট্র চীনকে হুমকি দিয়ে রেখেছে, রাশিয়া ও ইরান থেকে তেল কিনলে ২০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত এইসব শুল্ক কার্যকর হয়নি। এসব ঘটনার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি ঘোষণা করেছে, তারা রাশিয়া থেকে পরিশোধিত ডিজেল কিনবে ৪৮ লাখ টন।

এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র ভারতের ওপরে রাশিয়ার তেল কেনার জন্য কোনো শুল্ক আরোপ করতে পারবে না। চীনের ওপরও পারবে বলে মনে হয় না। প্রশ্ন হলো, যুক্তরাষ্ট্র এই কাজটি করল কেন? কারণ, নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যবর্তী নির্বাচন। ট্রাম্পকে আস্থা ভোটে জিততে হলে কিছু একটা করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি তেলের দাম গত বছরের তুলনায় ৭০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। এখন প্রতি গ্যালন ডিজেল গড়ে ৬.২০ ডলার। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষক, ট্রাকচালকসহ জ্বালানি তেল ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানগুলো মার খেয়ে যাচ্ছে। এই অবস্থা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিকে উদ্ধার করতে হলে অবশ্যই তেলের মজুত চাহিদা মোতাবেক রাখতে হবে, সঙ্গে দামও ঠিক রাখতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়া থেকে কী দামে তেল কিনছে, সেটা গোপন রেখেছে। তবে অনুমান করা যায়, ভারত যে দামে রাশিয়া থেকে জ্বালানি তেল কেনে, যুক্তরাষ্ট্র মোটামুটি সে দামেই কিনতে পারবে। এই হিসাবে ব্যারেলপ্রতি দাম হবে ১১০ থেকে ১১২ ডলার। তাহলে সেই জ্বালানি তেলের মূল্য হবে গ্যালনপ্রতি ২.৬২ থেকে ২.৬৭ ডলার। রাশিয়াও এই সুযোগ হাতছাড়া করতে চাইছে না। রাশিয়ার প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলার পশ্চিমা বিশ্ব ফ্রিজ করে রেখেছে। তবে রাশিয়া তেল বিক্রির পথ উন্মুক্ত করেছে। এ রকম সুবর্ণ সুযোগ গত কয়েক বছরে রাশিয়া পায়নি।

বিশ্ব অর্থনীতির এই দোলাচলে বড় ধরনের রাজনীতি আছে। যুক্তরাষ্ট্র বুঝে গেছে অনেক ভোটের ব্যবধানে এবারও পুতিনের দল সরকার গঠন করেছে। তাই পুতিনের সঙ্গে বিবাদে না জড়িয়ে দেশের অর্থনীতিকে চাঙা করার জন্য রাশিয়ার তেল কেনা এবং অন্যকে কিনতে দেওয়া মঙ্গলজনক। পশ্চিমা বিশ্ব ও ইউক্রেন কী মনে করল, তাতে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু আসে-যায় না। অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতি আসলে এটাই।

রাশিয়ার তেল কেনার আরেকটা কারণ হলো হরমুজ প্রণালি। এখান দিয়ে বিশ্বের মোট ব্যবহৃত জ্বালানি তেলের প্রায় ২০ শতাংশ সরবরাহ হয়। এখন সেটা বন্ধ। লোহিতসাগরের বাব আল-মান্দেব দিয়ে ৫ থেকে ৯ শতাংশ তেল সরবরাহ হয়। হুতিদের সঙ্গে সৌদি আরবের যুদ্ধের কারণে সেটাও বন্ধ হওয়ার উপক্রম। ইতিমধ্যে হুতিরা রিয়াদের কিং খালিদ এয়ারপোর্টসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় ভয়াবহ মিসাইল আক্রমণ করেছে। অর্থাৎ সৌদি আরব ও ইয়েমেন যুদ্ধে জড়িয়ে গেলে বাব আল-মান্দেব বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এই দুই প্রণালি থেকে তেল সরবরাহ বন্ধ হলে যুক্তরাষ্ট্রে তেলের গ্যালন ৬.২০ ডলার থেকে বেড়ে কোথায় যাবে, তা বলা মুশকিল। তাই ট্রাম্প রাজনীতি নিয়ে যা-ই বলুন না কেন, কূটনীতির যত মারপ্যাঁচ করুন না কেন, তিনি তাঁর দেশের অর্থনীতিকে সচল করার জন্যই রাশিয়ার সঙ্গে এই চুক্তি করেছেন।

ফলে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ দেখেছেন শতভাগ। এখানে কে মরল, কে কোন দেশকে দখল করল, কার অর্থনীতি কোথায় গেল, এটা ট্রাম্পের দেখার ব্যাপার না। ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ দেখেছেন, জনগণের লাভ দেখেছেন, জনগণের জীবনযাত্রার মান সহজ করার জন্য যা করার তা-ই করছেন।

যুক্তরাষ্ট্র নিয়ে এই আলোচনার আসল কারণ আমাদের দেশের অর্থনীতি। ভাবছেন, এর মিল কোথায়? বর্তমানে আমাদের দেশের মূল সমস্যা হলো জ্বালানিসংকট। এর কারণে আমরা বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারছি না। আমাদের বর্তমান বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতা ৩২,৬৮৮ মেগাওয়াট। আর আমাদের সর্বোচ্চ চাহিদা ১৪,০০০ থেকে ১৮,১৭৮ মেগাওয়াট। জ্বালানিসংকটের কারণে আমরা পুরোটা উৎপাদন করতে পারছি না। যুক্তরাষ্ট্র যদি রাশিয়ার কাছ থেকে সস্তায় তেল আমদানি করতে পারে, আমরা কেন পারব না? ভারত যে দামে কেনে সেই দামে আমরা যদি রাশিয়ার কাছ থেকে পরিশোধিত ডিজেল এখনই আমদানি করি, তাহলে দাম পড়বে সর্বোচ্চ ৮৫ টাকা প্রতি লিটার। রাশিয়া প্রচুর এলপিজি এবং এলএনজি রপ্তানি করে। আমরা কাতারের পরিবর্তে এখন রাশিয়ার কাছ থেকে এলএনজি ও এলপিজি আমদানি করতে পারি। এলএনজিকে রূপান্তর করে আমরা সিএনজি হিসেবে ব্যবহার করি। রাশিয়ার কাছ থেকে কিনলে আমাদের গ্যাসের সংকট ও জ্বালানি তেলের সংকট মোটামুটি মিটে যেতে পারে।

মানুষের মধ্যে সাংঘাতিক অসন্তোষ আছে বর্তমানে ব্যবহৃত এলপিজির মূল্য নিয়ে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) কর্তৃক নির্ধারিত সবশেষ অফিশিয়াল তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় মাসে দেশে এলপিজির দাম ৬.৩ শতাংশ বেড়েছে। কিন্তু গণমাধ্যমের খবরাখবর অনুযায়ী সাধারণ গ্রাহকের পকেট থেকে বাস্তব খরচ ছয় মাস আগের চেয়েও ২৭ শতাংশ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। আসলেই খেটে খাওয়া মানুষ, সাধারণ মানুষের কষ্টের কারণ এই জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি; চাহিদার তুলনায় কম বিদ্যুৎ প্রাপ্তি ও মূল্যবৃদ্ধি।

এই সুযোগে আমরা ডিজেল, এলএনজি ও এলপিজি আমদানির চুক্তিও করতে পারি। আমাদের ভয় ছিল আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির। যুক্তরাষ্ট্র নিজেই যেহেতু রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কিনছে, তাই যুক্তরাষ্ট্রকে আমরা বলে দিতে পারি—সারা বিশ্বের এই জ্বালানির সংকটময় মুহূর্তে আমরাও রাশিয়ার কাছ থেকে জ্বালানি তেল ও গ্যাস কিনতে চাই। এটা যুক্তি দিয়ে বোঝাতে পারলে যুক্তরাষ্ট্র কোনোক্রমেই ‘না’ বলতে পারবে না। আমাদের জ্বালানি চাহিদা মেটানোর জন্য এটাই সুবর্ণ সুযোগ। সামনে কিন্তু সেচের মৌসুম আসছে। এ কথা বিবেচনায় রেখে আমরা যেন অগ্রসর হই।

লেখক : প্রকৌশলী