হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

অর্থনীতির সংকটকালে ওয়াশিংটন-মক্কা-বেইজিং নিয়ে ব্যস্ততা

আবু তাহের খান 

মাত্র সাত মাসের মধ্যেই দেশের অর্থনীতিকে সরকার একটি স্থিতিশীল ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়ে ফেলবে—এমনটি নিশ্চয়ই কোনো বিবেকবান মানুষ আশা করে না বা সেটি তাদের কারও দাবিও নয়। তবে সরকার সেটি করতে চায় কি না বা এ বিষয়ে কী করতে চায়, তা বোঝার জন্য সাত মাসই যথেষ্ট।

কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, সরকার তাদের কার্যকালের মধ্যে রাষ্ট্রকে কীভাবে একটি শক্তিশালী ও টেকসই অর্থনৈতিক ভিত্তি এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা দেবে, সে বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো পূর্ণাঙ্গ কর্মপরিকল্পনা বা কর্মকৌশল জনসমক্ষে তুলে ধরেনি। তবে সেটি তারা তুলে না ধরলেও বিভিন্ন দেশের সঙ্গে একাধিক বাণিজ্য ও অস্ত্র ক্রয় চুক্তি সম্পাদন এবং সামরিক জোটে যুক্ত হওয়ার ব্যাপারে তাদের জোরালো তৎপরতা খুবই চোখে পড়ার মতো। এসব আত্মস্বার্থ বিসর্জিত চুক্তি ও ঝুঁকিপূর্ণ সামরিক জোটগত সম্পর্কের ফলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সার্বভৌমত্বের বিষয়টি শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে ঠেকবে, সেটিও শুধু হতাশাব্যঞ্জকই নয়, চরম দুশ্চিন্তার বিষয় বৈকি!

সাধারণ মানুষের ধারণা ছিল, সংসদে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকার কারণে সরকার হয়তো দুশ্চিন্তামুক্ত থেকে জনস্বার্থে প্রশংসনীয় কিছু কাজ করতে পারবে। কিন্তু তাদের গত সাত মাসের কর্মকাণ্ড মানুষকে অনেকটাই হতাশ করেছে। এ সময়ের মধ্যে দেশের অর্থনীতি ও অন্যান্য রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে জনগণের মূল স্বার্থ সংরক্ষণের প্রতি মনোযোগী হওয়ার পরিবর্তে তারা বরং দলীয় নেতা-কর্মীদের ব্যক্তিগত স্বার্থ ও সুবিধার বিষয়গুলোকেই বড় করে দেখেছে। তাদের এ সময়ের কর্মকাণ্ডসমূহকে নির্মোহভাবে ও মোটাদাগে চিহ্নিত করতে গেলে যা দাঁড়ায়, তার একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ নিচে তুলে ধরা হলো।

এক. সাংবিধানিক ও নির্বাহী পদে দলীয় নিয়োগ: সরকার দায়িত্ব নিয়েই সর্বাধিক ক্ষিপ্রতা ও দ্রুততার সঙ্গে সর্বাগ্রে যে কাজটি সম্পন্ন করেছে এবং এখনো করে চলেছে তা হলো, কোনো প্রকার নিয়মনীতি ও আইনকানুনের তোয়াক্কা না করে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির যোগ্যতা-অযোগ্যতাকে বিবেচনায় না নিয়ে সম্পূর্ণ বাছবিচারবিহীনভাবে দলীয় নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে রাষ্ট্রীয় পদপদবি বণ্টন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর থেকে শুরু করে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, সিটি করপোরেশনের প্রশাসক, বিভিন্ন অধিদপ্তর ও করপোরেশনের নির্বাহী প্রধান, সরকারি কর্ম কমিশনের চেয়ারম্যান ইত্যাদি নানা পর্যায়েই এসব বণ্টনের ঘটনা ঘটেছে।

দুই. চটকদার বিচ্ছিন্ন কর্মসূচি: দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই সরকারের উচিত ছিল দেশের সমাজ, রাজনীতি ও অর্থনীতিকে পরবর্তী পাঁচ বছর ধরে তারা কীভাবে পরিচালনা করবে, সে বিষয়ে সময়কাঠামোভিত্তিক একটি পরিকল্পনা জনগণের সামনে তুলে ধরা। কিন্তু ইতিমধ্যে সাত মাস পেরিয়ে গেলেও কাজটি তারা করতে পারেনি। অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যে জাতীয় ও খাতভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়নের পরিবর্তে তারা বরং মনোযোগ দিয়েছে বিভিন্ন ধরনের কার্ড বিতরণ ও তাৎক্ষণিক চমক সৃষ্টিকারী কর্মসূচির প্রতি। এবং সত্যি বলতে কী, এ ধরনের বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ ও কর্মসূচি টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সামাজিক-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে কখনোই সহায়ক হতে পারে না।

তিন. উৎপাদন ও কর্মসংস্থান উপেক্ষিত হওয়া: সরকার আর্থিক খাতের আওতায় উৎপাদন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিমূলক কর্মকাণ্ডকে অগ্রাধিকার না দিয়ে এর পরিবর্তে রুগ্‌ণ শিল্পের পুনর্বাসন, ঋণখেলাপিদের দীর্ঘমেয়াদি পুনঃ তফসিলকরণের সুবিধা দেওয়া, রপ্তানিকারকদের জন্য নগদ প্রণোদনার পরিমাণ বৃদ্ধি করা ইত্যাদির প্রতি বিশেষ আগ্রহ দেখিয়ে চলেছে। অথচ উচিত ছিল বিদ্যমান চালু কারখানাগুলোতে যাতে উৎপাদন ব্যাহত না হয় সে জন্য সেখানে গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি ইত্যাদির সার্বক্ষণিক সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং অন্য সেবা-সহায়তাগুলো দক্ষতার সঙ্গে কার্যকর রাখা। কিন্তু সরকার সেদিকে মনোযোগ দিতে ব্যর্থ হওয়ায় ইতিমধ্যে সহস্রাধিক শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে এবং প্রায় লাখখানেক শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছেন। বিশ্বব্যাংক তাদের পূর্বাভাসে জানিয়েছে, সামনে এ পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটতে পারে।

চার. বৃহৎ ও পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে বাড়তি কর সুবিধা দেওয়া: রাজস্ব আদায় ব্যবস্থাকে আরও যৌক্তিক, দক্ষ ও স্বচ্ছতাপূর্ণ করার লক্ষ্যে বর্ধিত উদ্যোগ গ্রহণের পরিবর্তে সরকার প্রত্যক্ষ কর-হার কমিয়ে উল্টো সাধারণ মানুষের ওপর পরোক্ষ করের বোঝা বাড়িয়ে চলেছে। তদুপরি নিজেদের পছন্দমাফিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে ঢালাওভাবে কর ও শুল্ক অব্যাহতি সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। সম্প্রতি গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য থেকে দেখা যাচ্ছে যে সরকার প্রতিবছর যে পরিমাণ কর ও শুল্ক আদায় করছে, অব্যাহতি দিচ্ছে তার চেয়ে অনেক বেশি। বিষয়টি শুধু বিস্ময়করই নয়, একই সঙ্গে রাষ্ট্রের রাজস্বনীতির দুর্বলতা, অস্বচ্ছতা ও অদক্ষতারও পরিচায়ক।

পাঁচ. দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেওয়া: দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে দুর্নীতি প্রশ্রয় পায় এ রকম কর্মকাণ্ডকে আরও বেশি করে উৎসাহ দিয়ে চলেছে সরকার। এটি সরকারি দপ্তরের অভ্যন্তরে নির্বাহী বিভাগের সংশ্লিষ্টতায় যেমন ঘটছে, তেমন ঘটছে ব্যবসায়ী, ঠিকাদার ও দলীয় নেতা-কর্মীদের যুক্ত থাকার মধ্য দিয়েও। দলের নেতা-কর্মীদের ‘মূল্যায়ন’ করতে গিয়ে এ ধরনের দুর্নীতির ক্ষেত্র দিন দিন আরও প্রসারিত হচ্ছে।

ছয়. জাতীয় সংসদকে অকার্যকর করে রাখা: জাতীয় সংসদের কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে যেসব রীতিনীতি ও বিধিবিধান অনুসৃত হওয়ার কথা, বর্তমান জাতীয় সংসদ তার ধারকাছ দিয়েও যাচ্ছে না। মন্ত্রণালয়সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলো গঠনের কাজ সম্পন্ন হয়েছে দীর্ঘ সাত মাস পর, ১০ সেপ্টেম্বর। সংসদে উত্থাপিত বিল বা প্রস্তাব নিয়ে সেখানে কোনো আলোচনা হয় না। অধিকাংশ বিল পাস হচ্ছে এক-দুই মিনিট আলোচনা করে। মোটকথা, জাতীয় সংসদের কোনো চরিত্র বা বৈশিষ্ট্যই সেখানে বহাল নেই।

রাষ্ট্রের অধিকাংশ জনস্বার্থমূলক কর্মকাণ্ডই এখন পরিচালিত হচ্ছে খণ্ডকালীন চিন্তাভাবনা এবং অগভীর দৃষ্টিভঙ্গির দ্বারা প্রভাবিত হয়ে। তদুপরি সরকারের এসব চিন্তাভাবনা ও গভীরতাহীন দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে সাধারণ জনগণের প্রতি উপেক্ষা ও অবহেলার ছাপও সুস্পষ্ট। কিন্তু এসবের বিপরীতে বিদেশের, বিশেষত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তোলার ব্যাপারে সরকার এতটাই মরিয়া হয়ে উঠেছে যে নিজেদের সামর্থ্যের সব সীমা ও রাষ্ট্রের সমুদয় স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে হলেও তারা বোয়িংয়ের কাছ থেকে বিনা দরপত্রে লক্ষাধিক কোটি টাকা ব্যয়ে ২৫টি উড়োজাহাজ কিনতে কৃতসংকল্প, যে বিষয়ে ইতিমধ্যে প্রতিবাদ জানিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নও (ইইউ)। এর বাইরে বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গত ৯ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি (এআরটি) স্বাক্ষরিত হয়েছিল, মানুষ আশা করেছিল, নতুন সরকার ক্ষমতায় এসে তা বাতিল না করলেও অন্তত পর্যালোচনা করবে। কিন্তু সেসব কিছু করা তো দূরের কথা, এ সরকার বিগত সরকারের চেয়ে অধিক উৎসাহের সঙ্গে ওই চুক্তি বাস্তবায়নের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নানাভাবে তাদের অঙ্গীকার ব্যক্ত করে চলেছে।

অন্যদিকে চীনের কাছ থেকে যুদ্ধবিমান ও সমরাস্ত্র কেনার ব্যাপারেও বাংলাদেশ অত্যন্ত দৃঢ়তা ও দ্রুততার সঙ্গে এগিয়ে যাচ্ছে। এ প্রসঙ্গে সাধারণ মানুষের একটাই প্রশ্ন—কার সঙ্গে যুদ্ধ করবেন এসব বিমান দিয়ে, কার ভূমিতে বোমা ফেলবেন? দেশে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর হার গত দুই বছরে ২০ শতাংশ থেকে বেড়ে ২৮ শতাংশে এসে দাঁড়িয়েছে (সূত্র: পিপিআরসি)। পিপিআরসি ও বিশ্বব্যাংক উভয়ের মতেই সামনের দিনগুলোতে এ হার আরও বাড়বে। আর এ অবস্থার মধ্যেই মক্কা সামরিক জোটে যোগদানের ব্যাপারে বাংলাদেশ তার আগ্রহের কথা জানিয়েছে, যে আগ্রহের অর্থ হচ্ছে এর পর থেকে বাংলাদেশ কার্যত সৌদি-তুরস্ক-পাকিস্তান জোটের হয়ে ইরান বা যুক্তরাষ্ট্রবিরোধীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে। কিন্তু এ রকম সমীকরণে প্রবেশের আগে বাংলাদেশ কি বুঝতে পারছে, এতে করে সে শুধু হরমুজ প্রণালিতেই নিজেদের প্রবেশাধিকার হারাতে যাচ্ছে না, আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়ে নিজেদের অনেক দেশের শত্রু হিসেবেও জাহির করবে?

তাহলে কি ধরে নিতে হবে, বাংলাদেশ ৫৫ বছর ধরে ‘সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়’ নীতির ভিত্তিতে যে পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে আসছিল, বর্তমান সরকার তা থেকে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে? বাংলাদেশ কি তাহলে সহসাই বিশেষ সামরিক জোটের অংশ হতে যাচ্ছে, দেশের ২৮ শতাংশ মানুষকে দারিদ্র্যসীমার নিচে রেখে হলেও? যে দেশ তার নাগরিকদের একটি বড় অংশের জন্য এখনো চাহিদা অনুযায়ী খাদ্য, চিকিৎসা, বাসস্থান ইত্যাদি জোগান দিতে পারে না, যে দেশে গ্যাস, বিদ্যুৎ, জ্বালানি তেলের অভাবে হাজার হাজার শিল্পকারখানা ও সেচপাম্প বন্ধ হয়ে যায়, যে দেশের সরকারকে রাষ্ট্রের দৈনন্দিন খরচ মেটানোর জন্য স্থানীয় ব্যাংক ও বৈদেশিক সূত্র থেকে অর্থ ধার করে চলতে হয়, সে দেশে সামরিক খাতের এ বর্ধিত ব্যয় কোত্থেকে কীভাবে মেটানো হবে? এ দেশের অসহায় দরিদ্র সাধারণ মানুষের ওপর এ রাষ্ট্রের সরকারগুলো আর কত নিপীড়ন ও নিষ্পেষণ চালাবে? কেন এ দেশের সরকার যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নিজেদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব হারানোর ঝুঁকি নিচ্ছে?

আশা করব, দেশ, রাষ্ট্র ও জনগণের বৃহত্তর স্বার্থের কথা ভেবে সরকার এ ধরনের হীন বৈদেশিক সম্পর্ক ও চুক্তি থেকে নিজেদের পরিপূর্ণভাবে বিরত রাখতে সচেষ্ট হবে।