১৯৭২ সালের ৩০ জুন জাতীয় সংসদে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম বাজেট ঘোষণা করেছিলেন অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ। একসঙ্গে দুই বছরের বাজেট ঘোষণা করেছিলেন তিনি। প্রথম বছরের বাজেট ছিল ৭৮৬ কোটি টাকার। এর মধ্যে উন্নয়ন বাজেট ছিল ৫০১ কোটি টাকার, আর রাজস্ব বাজেট ২৮৫ কোটি টাকার। সেটি ছিল সম্পূর্ণ করমুক্ত বাজেট। দেশ পুনর্গঠনই ছিল ওই বাজেটের মূল উদ্দেশ্য। ওই বছর বাজেট-উত্তর সংবাদ সম্মেলনে দেশের প্রথম রাজনীতিবিদ অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ বলেছিলেন, ‘না খেয়ে মরব, তবু শর্তযুক্ত ঋণ নেব না।’
এর ৫৫ বছর পর আরেক রাজনীতিবিদ অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী দেশের ৫৬তম বাজেট ঘোষণা করেছেন। বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের এটি প্রথম বাজেট। ৫৫ বছরে বাজেট ১ হাজার ১৯৩ গুণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, এবারের বাজেটের মূল লক্ষ্য হবে অর্থনীতির গণতন্ত্রীকরণ। সব ক্ষেত্রে সরকারি নিয়ন্ত্রীকরণ কমিয়ে আনার চেষ্টা করা হবে। বাজেটকে আরও ব্যবসায়ী-বান্ধব করার কথাও বলেছেন তিনি। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দেওয়ার চিন্তার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
এটি বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাজেট হলেও মূল চ্যালেঞ্জ থাকবে রাজস্ব আহরণে। কারণ, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে দেশের অর্থনীতিতে একধরনের নেতিবাচক ধারা তৈরি হয়েছিল। সেই ধারা থেকে বের হয়ে আসার চেষ্টা রয়েছে এই বাজেটে। নির্বাচিত সরকার হিসেবে শুরুতেই অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর বাজেট বক্তৃতায় সেই আভাস পাওয়া গেছে, যা দেশের অর্থনীতিকে সামনে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টার প্রতিফলন।
তবে সাড়ে ৯ হাজার কোটি টাকার বাজেটে উন্নয়ন বাজেট বরাদ্দের তুলনায় পরিচালন ব্যয় অনেক বেশি। এই হিসাব মেলাতে হিমশিম খেতে হতে পারে বিএনপির সজ্জন নেতা হিসেবে পরিচিত অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে।
বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকারের এটি ১৩তম বাজেট। বিএনপি সরকারের সাবেক অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান একাই ১২টি বাজেট দিয়েছেন। ১২টি বাজেট দেওয়ার রেকর্ডে নাম রয়েছে আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতেরও। এই দুই নেতাই দেশের প্রায় অর্ধেক বাজেট দেওয়ার বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
এর বাইরে এ আর মল্লিক একটি, মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান তিনটি, এম এন হুদা একটি, এম সাইদুজ্জামান চারটি, মেজর জেনারেল আব্দুল মোনেম দুটি, ওয়াহিদুল হক একটি, শাহ এ এম এস কিবরিয়া ছয়টি, এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম দুটি, আ হ ম মুস্তফা কামাল একটি, আবুল হাসান মাহমুদ আলী একটি এবং সালেহউদ্দিন আহমেদ একটি বাজেট দিয়েছেন।
বাংলাদেশের মতো দেশে সব অর্থমন্ত্রীর জন্য আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলানো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। কারণ, এখানে নানা কারণে আয়ের চেয়ে পাল্লা দিয়ে ব্যয় বাড়ছে। মানুষের গড় আয়ু বাড়লেও মূল্যস্ফীতি বেড়ে প্রায় ১০-এর কাছাকাছি। ফলে খরচ নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না সাধারণ মানুষ। মানুষ আসলে বাজেটের হিসাব দেখতে চায় না। মানুষ চায় বাজেট তাকে স্বস্তি দেবে। সরকার এমন বাজেট দেবে, যাতে সব মানুষের অর্থনৈতিক স্বস্তি আসে। নতুন সরকারের নতুন বাজেটে মানুষ সেই স্বস্তি পাবে বলে সবাই আশা করে। বিএনপির নতুন সরকারের প্রথম বাজেট প্রণেতা অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে আগাম অভিনন্দন।