হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

সরকারি চাকরি নয়, প্রয়োজন কর্মসংস্থানের উদ্যোগ

ড. মো. শফিকুল ইসলাম

প্রতীকী ছবি

বাংলাদেশের তরুণসমাজের স্বপ্ন, প্রত্যাশা এবং বাস্তবতার মধ্যে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে, তার একটি স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি দেখা গেল সম্প্রতি একটি সরকারি নিয়োগ পরীক্ষাকে ঘিরে। সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাত্র ১ হাজার ৪৮৫টি পদের বিপরীতে আবেদন করেছে ২১ লাখের বেশি তরুণ। অর্থাৎ প্রতি পদের বিপরীতে লড়াই করছে প্রায় ১ হাজার ৪৩০ জন প্রার্থী। এ পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে ঘটনাটি শুধু একটি নিয়োগ পরীক্ষার প্রতিযোগিতার চিত্র নয়; বরং এটি বাংলাদেশের চাকরির বাজারের নির্মম সত্যের প্রতিচ্ছবি।

একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম প্রধান সূচক হলো কর্মসংস্থান সৃষ্টি। গত কয়েক দশকে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং দারিদ্র্য হ্রাসে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। কিন্তু সেই অগ্রগতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে পর্যাপ্ত মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব হয়নি। ফলে প্রতিবছর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হওয়া বিপুলসংখ্যক তরুণ যখন চাকরির জন্য প্রতিযোগিতায় শামিল হচ্ছে, তখন তারা দেখতে পাচ্ছে সীমিত পদের বিপরীতে কর্মক্ষেত্রের সুযোগও সংকুচিত।

সরকারি চাকরির প্রতি তরুণদের এই বিপুল আগ্রহ নতুন কোনো ঘটনা নয়। তবে সম্প্রতি এর মাত্রা উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। কারণ, সরকারি চাকরি এখন শুধু একটি পেশা নয়; অনেক পরিবারের কাছে এটি সামাজিক নিরাপত্তা, স্থিতিশীল জীবন এবং ভবিষ্যতের নিশ্চয়তার কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। সরকারি চাকরির প্রতি তরুণদের আগ্রহের পেছনে কয়েকটি বাস্তব কারণ রয়েছে। প্রথমত, চাকরির নিরাপত্তা। বেসরকারি খাতে অনেক ক্ষেত্রে চাকরি চলে যাওয়ার আশঙ্কা, তুলনামূলক কম স্থায়িত্ব এবং কর্মপরিবেশের অনিশ্চয়তা রয়েছে। দ্বিতীয়ত, সামাজিক মর্যাদা। বাংলাদেশে এখনো সরকারি চাকরিকে সমাজব্যবস্থা সম্মানের চোখে দেখে। তৃতীয়ত, দীর্ঘমেয়াদি সুযোগ-সুবিধা, যেমন অবসরকালীন সুবিধা ও অন্যান্য সুযোগ—এসব ব্যাপার সরকারি চাকরিকে আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

অন্যদিকে, বেসরকারি খাতের সম্প্রসারণ প্রত্যাশিত গতিতে না হওয়ায় কর্মসংস্থানের বিকল্প ক্ষেত্রও সীমিত হয়ে পড়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, বিনিয়োগের ধীরগতি, ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা এবং শিল্প খাতের সম্প্রসারণে বাধার কারণে নতুন চাকরির সুযোগ কম তৈরি হচ্ছে। বাংলাদেশের শ্রমবাজারের একটি বড় সমস্যা হলো উচ্চশিক্ষিত তরুণদের বেকারত্ব। একসময় মনে করা হতো, উচ্চশিক্ষা অর্জন করলেই ভালো চাকরি নিশ্চিত হবে। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতা ভিন্ন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি থাকলেও অনেক তরুণ চাকরির বাজারে নিজেদের অবস্থান তৈরি করতে পারছে না।

এর অন্যতম কারণ হলো শিক্ষা ও শিল্পের চাহিদার মধ্যে ব্যবধান। শিল্প ও শিক্ষা লিংকেজের ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে, যা আমাদের সরকারকে বিশেষ নজর দিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক ক্ষেত্রে তাত্ত্বিক জ্ঞানকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়, কিন্তু কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজন হয় ব্যবহারিক দক্ষতা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, যোগাযোগ দক্ষতা এবং সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা অর্জনের তাৎক্ষণিক দক্ষতা।

ফলে দেখা যাচ্ছে, একদিকে বিপুলসংখ্যক শিক্ষিত তরুণ চাকরির অপেক্ষায় রয়েছে, অন্যদিকে অনেক প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় দক্ষ কর্মী খুঁজে পাচ্ছে না। এই দক্ষতার সংকট বাংলাদেশের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাপনাকে আরও জটিল করে তুলছে। আমাদের দেশে বর্তমানে শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ বেকার জীবন-যাপন করছে। এরাই দেশের মোট জনসংখ্যার বড় অংশ। অর্থনীতির ভাষায় এটি একটি বড় সম্ভাবনা, যাকে বলা হয় ‘জনমিতিক সুবিধা’।

কিন্তু এই সুবিধা কাজে লাগাতে হলে তরুণদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা জরুরি। কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী যদি দক্ষতা ও কাজের সুযোগ না পায়, তাহলে এই জনমিতিক সুবিধাই ভবিষ্যতে সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারে। একজন তরুণ যদি বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করার পর কয়েক বছর শুধু একটি চাকরির জন্য পরীক্ষার প্রস্তুতিতে ব্যয় করেন, তাহলে তাঁর উৎপাদনশীল সময়ের বড় অংশ নষ্ট হয়। এতে ব্যক্তি যেমন পিছিয়ে পড়েন, তেমনি দেশের অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

একটি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির বিপরীতে ২১ লাখের বেশি আবেদন গ্রহণ করা প্রশাসনিকভাবেও বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। এত প্রার্থীর পরীক্ষা আয়োজন, কেন্দ্র নির্ধারণ, প্রশ্নপত্র ব্যবস্থাপনা, খাতা মূল্যায়ন এবং ফল প্রকাশ একটি জটিল প্রক্রিয়া। এই পরিস্থিতি স্পষ্ট করছে যে নিয়োগব্যবস্থাকেও আধুনিকায়ন করা প্রয়োজন। প্রযুক্তির ব্যবহার, প্রাথমিক পর্যায়ে স্বয়ংক্রিয় বাছাইব্যবস্থা, দক্ষ পরীক্ষা ব্যবস্থাপনা এবং সময়মতো নিয়োগ সম্পন্ন করার উদ্যোগ প্রয়োজন।

তবে শুধু নিয়োগপ্রক্রিয়া সহজ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। মূল সমস্যা হলো পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়া। প্রথমত, বেসরকারি খাতকে শক্তিশালী করতে হবে। একটি দেশের কর্মসংস্থানের প্রধান উৎস সাধারণত সরকারি খাত নয়; বরং বেসরকারি শিল্প, ব্যবসা ও উদ্যোক্তা খাত। বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি, ব্যবসায়িক বাধা কমানো এবং নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠায় উৎসাহ দেওয়া প্রয়োজন।

দ্বিতীয়ত, শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শুধু চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতিমূলক শিক্ষা নয়, বরং কর্মজীবনের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা তৈরিতে গুরুত্ব দিতে হবে। কর্মমুখী শিক্ষার প্রতি অধিকতর গুরুত্ব দিতে হবে। প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা বিশ্লেষণ, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং আধুনিক ব্যবস্থাপনা দক্ষতার ওপর জোর দিতে হবে।

তৃতীয়ত, তরুণদের মধ্যে উদ্যোক্তা হওয়ার মানসিকতা তৈরি করতে হবে। সব তরুণের ভবিষ্যৎ যে কেবল চাকরির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে, এই ধারণা পরিবর্তন করা প্রয়োজন। এই ধারণা থেকে বের হয়ে আসতে হবে আমাদের নতুন প্রজন্মকে। ছোট ও মাঝারি উদ্যোগ, স্টার্টআপ, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসা এবং ফ্রিল্যান্সিংয়ের মতো ক্ষেত্রগুলোকে আরও শক্তিশালী করতে হবে।

সরকারি চাকরি অবশ্যই সম্মানজনক এবং গুরুত্বপূর্ণ পেশা। কিন্তু একটি দেশের ভবিষ্যৎ কেবল সরকারি চাকরির সংখ্যার ওপর নির্ভর করতে পারে না। একটি শক্তিশালী অর্থনীতির জন্য প্রয়োজন এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে একজন তরুণ চাকরি পাওয়ার পাশাপাশি নিজেও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারেন। ২১ লাখ আবেদনকারীর এই ঘটনা আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়, বাংলাদেশের তরুণরা কাজ করতে চায়, তারা সুযোগের অপেক্ষায় আছে। এখন দায়িত্ব হলো সেই সুযোগ তৈরি করা।

আমাদের উন্নয়নের পরবর্তী অধ্যায় হতে হবে কর্মসংস্থাননির্ভর উন্নয়ন। শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সংখ্যা নয়, সেই প্রবৃদ্ধি কত মানুষের জন্য মর্যাদাপূর্ণ কাজের সুযোগ তৈরি করছে, সেটিই হওয়া উচিত মূল বিবেচনা। কারণ, একটি দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার তরুণ জনগোষ্ঠী। এই সম্পদকে কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে আরও দ্রুত। আর যদি এই শক্তিকে কাজে লাগানো না যায়, তাহলে হতাশা ও অনিশ্চয়তা বাড়বে। তাই এখন সময় এসেছে সরকারি চাকরির প্রতিযোগিতার সংখ্যা গোনার পরিবর্তে কর্মসংস্থানের নতুন পথ তৈরি করা।

ড. মো. শফিকুল ইসলাম

সহযোগী অধ্যাপক, কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়