হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

সৌদি-হুতি সংঘাতের নেপথ্যের রাজনীতি

সুলতান মাহমুদ সরকার

হুতিরা এ বছর সৌদি আরবে ড্রোন-ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। ছবি: এএফপি

লোহিতসাগরের পাড়ে এক শরণার্থীশিবিরে সারি সারি তাঁবু। পানির জার কাঁধে নিয়ে কয়েকজন নারী ধীর পায়ে হেঁটে যাচ্ছেন, আর দূর থেকে ভেসে আসছে কামানের গর্জন। কয়েক সপ্তাহ ধরে এ ধরনের খবর প্রকাশিত হয়েছে সংবাদমাধ্যমে। ২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতির পর যে লড়াই অনেকটা থিতিয়ে এসেছিল, এই গ্রীষ্মে তা আবার জেগে উঠেছে আগের চেয়ে আরও বিপজ্জনকরূপে। কিন্তু এই সংঘাতের উৎস ইয়েমেনের মাটিতে নয়, অনেক দূরের দুই রাজধানীতে সেই নেপথ্যের কারণ লুকিয়ে আছে। ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের যুদ্ধনীতিই পুরো অঞ্চলকে ধাপে ধাপে এই বিস্ফোরণের দিকে ঠেলে দিয়েছে। সৌদি-হুতিদের সংঘাত তাই বিচ্ছিন্ন কোনো লড়াই নয়; এটি এক আধিপত্যবাদী প্রকল্পের সর্বশেষ অধ্যায়, যেখানে যুদ্ধ, বাণিজ্যপথ আর ভূরাজনীতির হিসাব একে অপরের সঙ্গে জট পাকিয়ে আছে।

ফেব্রুয়ারির শেষে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে ইরানের ভূখণ্ডে হামলা চালায়। কোনো আন্তর্জাতিক বৈধতা ছাড়া একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের ওপর এই হামলায় দেশটির সর্বোচ্চ নেতা নিহত হন। যে বিশ্বব্যবস্থা নিজেকে গণতান্ত্রিক বলে দাবি করে, তার প্রধান রক্ষকরাই সেই নিয়ম ভেঙেছে। এই দ্বিমুখী আচরণই পশ্চিমাদের নৈতিক অবস্থানের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। নিজেদের মিত্রের বেলায় আইন এক রকম, প্রতিপক্ষের বেলায় আরেক রকম। একই কাজ অন্য কোনো দেশ করলে যে ভাষায় নিন্দা হতো, এখানে সেই ভাষা হঠাৎ রুদ্ধ হয়েছে আর জাতিসংঘের প্রস্তাব কাগজেই থেকে গেছে। এই বৈষম্য দেখতে দেখতে বিশ্বের বহু দেশের আস্থা তলানিতে ঠেকেছে। জবাবে ইরান পাল্টা হামলা চালায় এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়, যাকে তেহরান আত্মরক্ষার অন্যতম উপায় হিসেবে দেখছে।

এই প্রেক্ষাপটে হুতিরা মার্চের শেষে ইসরায়েলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আবার ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া শুরু করে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে গাজা যুদ্ধবিরতির পর তারা হামলা স্থগিত রেখেছিল, লোহিতসাগরেও শান্তি ফিরেছিল। সেই ভঙ্গুর শান্তি ভেঙেছে ফেব্রুয়ারির হামলায়। হুতিদের বক্তব্য হলো, গাজা ও ইরানে আগ্রাসন চলবে আর ইয়েমেন চুপ থাকবে, এটাই বরং অস্বাভাবিক। এখানে হুতিদের অবস্থান ফিলিস্তিনের সঙ্গে সংহতির ধারাবাহিকতা।

বছরের পর বছর ধরে অবরোধ আর বোমার নিচে বেড়ে ওঠা একটি জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে কেন সব সময় বাইরের কোনো শক্তির নির্দেশ বলে ধরে নেওয়া হয়? ইয়েমেন বহু বছর ধরে বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘ ও নীরব মানবিক বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে গেছে, অথচ তার কণ্ঠ কখনো আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে জায়গা পায়নি। মনে করা হয়, এই অবহেলাই একটি জনগোষ্ঠীকে শেষ পর্যন্ত অস্ত্র হাতে নিজের কথা শোনাতে বাধ্য করেছে। জুলাইয়ের মাঝামাঝি সানা বিমানবন্দরে ইরান থেকে আসা একটি বিমান ঠেকাতে ইয়েমেন সরকার হামলা চালালে হুতিরা তার জবাবে সৌদি আরবে ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন হামলা ও লোহিতসাগরে অবরোধ করে। তিন বছরের পুরোনো যুদ্ধবিরতি চূড়ান্তভাবে ভেঙে যায়। ব্যাপারটা এই যে বহিরাগত শক্তির প্ররোচনা ও সমর্থনে ইয়েমেনের ভেতরের বিরোধ নতুন করে উসকে দেওয়া হয়েছে।

এই সংঘাতের কেন্দ্রে কেবল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নেই। আছে গোটা অঞ্চলে স্বাধীন কণ্ঠগুলোকে স্থায়ীভাবে দমন করার ব্যাপক লক্ষ্য। গাজায় হামাসের সামরিক কাঠামো বিধ্বস্ত, লেবাননে হিজবুল্লাহর নেতৃত্ব বিপর্যস্ত, সিরিয়ায় সরকারের পতন, আর এবার সরাসরি যুদ্ধে ইরানের সর্বোচ্চ নেতৃত্বও আক্রান্ত। একের পর এক প্রতিরোধ-স্তম্ভ ভাঙার এই ধারাবাহিকতা কাকতালীয় নয়। ইরান ও তার মিত্রদের কাছে এটা অস্তিত্বের লড়াই। এমন অবস্থায় হুতিদের সক্রিয় থাকা তেহরানের জন্য যেমন কৌশলগত বাস্তবতা, তেমনি অবরুদ্ধ একটি জনগোষ্ঠীর আত্মমর্যাদারও প্রশ্ন।

গত আড়াই মাসে হুতিরা লোহিতসাগরের পশ্চিম উপকূল ধরে অগ্রসর হয়ে কৌশলগত বন্দর মোখাসহ বিশাল এলাকা দখল করেছে, লক্ষ্য বাব এল মান্দেব প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ। সেপ্টেম্বরে সৌদি জ্বালানি স্থাপনায় হামলায় আরামকোর একাধিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, রিয়াদ ও খামিস মুশাইতের দিকেও ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে। জুলাই থেকে দেড় লাখেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। মারিবে ভারী লড়াই চলছে, আর হুতিরা সানাসহ দেশের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। এই ঘটনাগুলোকে আলাদা করে দেখলে মনে হতে পারে, এক পক্ষ আরেক পক্ষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে। কিন্তু কারণ খুঁজতে গেলে ফিরে যেতে হয় সেই মূল প্ররোচনায়, যে আগ্রাসন গোটা অঞ্চলে ডমিনো প্রভাব তৈরি করেছে। একটি পাথর নদীতে পড়লে ঢেউ কোথায় গিয়ে ঠেকবে, তা পাথর যে ছুড়েছে সে ভাবে না, ভাবতে হয় তীরের মানুষকে।

অর্থনৈতিক বিষয়ও এই সংঘাতের কারণ। হরমুজ বন্ধ হওয়ার ফলে সৌদি আরব বিকল্প পথ লোহিতসাগর দিয়ে তেল রপ্তানি শুরু করেছে।

আর সৌদি আরবের চারপাশে তৈরি হয়েছে নতুন নিরাপত্তাবলয়। ফ্রান্স ইয়ানবু পাহারায় সেনা পাঠাচ্ছে, রিয়াদ পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে সামরিক আলোচনায় বসেছে, উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ হুতিদের হামলার নিন্দা জানিয়েছে। তেহরান বলেছে, আমেরিকা শর্ত মানলে তারা হরমুজ খুলে দেবে। এখানে দায়টা তো ওয়াশিংটনেরই, যে দেশ আগে হামলা চালিয়ে, আলোচনা ভেঙে দিয়ে সংকট বাড়িয়েছে, সমাধানের চাবিও তার হাতেই। এই ফাঁকে সবচেয়ে বেশি লাভবান হচ্ছে সেই আমেরিকাসহ অস্ত্র-ব্যবসায়ী ও শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো, যারা অস্থিরতা বিক্রি করে, ঘাঁটি গড়ে, আর নিরাপত্তা-ছাতার নামে অঞ্চলের ওপর নির্ভরশীলতা চাপিয়ে দেয়। আগুন লাগানো আর পানি বিক্রি করা, এই দুই কাজ একই হাতে হলে সে হাতকে কেউ দমকলকর্মী বলে না।

এই আধিপত্যবাদী কাঠামোর সবচেয়ে বড় শিকার সাধারণ মানুষ: ইয়েমেনের বাস্তুচ্যুত পরিবার, সৌদি সীমান্ত শহরের বাসিন্দা, আর বিশ্বজুড়ে জ্বালানির বাড়তি দামের বোঝা কাঁধে নেওয়া কোটি কোটি ভোক্তা। রাষ্ট্রীয় কৌশলের হিসাব যতই জটিল হোক, তার প্রকৃত মূল্য দেয় সবচেয়ে দুর্বলরাই, যাদের কণ্ঠস্বর কোনো আলোচনার টেবিলে পৌঁছায় না। শরণার্থী শিবিরের শিশুটি জানে না হরমুজ কোথায়, জানে শুধু আজ রাতে খাবার জুটবে কি না?

সৌদি আরবের জন্যও এটি গভীর সংকট। প্রশ্ন হলো, এই অস্থিরতার দায় কার? যে শক্তিগুলো বছরের পর বছর ধরে বিভিন্ন অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়ে, একপক্ষকে অস্ত্র জুগিয়ে ও অন্য পক্ষকে চাপে রেখে এই বারুদের স্তূপ তৈরি করেছে, ইতিহাসের কাঠগড়ায় তাদেরই দাঁড়াতে হবে। রিয়াদ যতই বিদেশি নিরাপত্তা-অংশীদারত্বের দিকে ঝুঁকছে, ততই দীর্ঘ মেয়াদে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা কমছে। হরমুজ ও বাব এল মান্দেব একসঙ্গে অস্থির থাকা মানে বৈশ্বিক বাণিজ্যের ওপর এক অদৃশ্য লাগাম টানা, যা নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে বহিঃশক্তির প্রভাব আরও পাকাপোক্ত হয়। এই অর্থে সংকটটা যত না সৌদি বনাম হুতির, তার চেয়ে অনেক বেশি এই অঞ্চলের স্বাধীনতা বনাম বাইরের নিয়ন্ত্রণের।

এ থেকে উত্তরণের পথ হতে পারে—কার্যকর যুদ্ধবিরতি। চীনের মধ্যস্থতায় সৌদি-ইরান সম্পর্ক পুনঃস্থাপন দেখা গেছে। এ থেকে প্রমাণিত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ছায়ার বাইরেও আঞ্চলিক সমঝোতা সম্ভব। সেই পথ ধরেই হরমুজ ও বাব এল মান্দেবের নিরাপত্তা উপকূলীয় দেশগুলোর যৌথ কাঠামোর মধ্যে আনা দরকার। ইসলামি সহযোগিতা সংস্থাকে আনুষ্ঠানিক বিবৃতির বদলে প্রকৃত মধ্যস্থতাকারী শক্তি হতে হবে, যেখানে পাকিস্তান, তুরস্ক, মিসর, ইন্দোনেশিয়া ও বাংলাদেশ সেতুবন্ধনের ভূমিকা নিতে পারে।

বিশ্বশক্তিগুলোরও উচিত অস্ত্র বিক্রি ও সামরিক উপস্থিতির বদলে সংলাপ ও পুনর্গঠনে বিনিয়োগ করা। কারণ, ধ্বংস হওয়া বন্দর, স্কুল আর হাসপাতাল গড়ার খরচ এক বছরের অস্ত্র ক্রয় বাজেটের চেয়ে অনেক কম, অথচ তার প্রভাব বহু গুণ দীর্ঘস্থায়ী।

ইতিহাস মনে রাখবে, যখন একটি অঞ্চলের মানুষ নিজেদের মধ্যে রক্ত ঝরাচ্ছিল, তখনই দূরের রাজধানীতে কেউ কেউ মানচিত্র আর বাণিজ্যপথের নতুন হিসাব কষছিল। প্রশ্ন হলো, এই অঞ্চল কি আরও কিছুকাল অন্যের আঁকা রণাঙ্গনে লড়ে যাবে, নাকি আধিপত্যের এই ছক ভেঙে নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজেরা লেখার সাহস দেখাবে? শান্তি কোনো উপহার নয়, এটি এক সচেতন সিদ্ধান্ত, আর সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই নিতে হবে।

সুলতান মাহমুদ সরকার, পিএইচডি গবেষক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়