হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

মেঘলা চিতা কেন গুরুত্বপূর্ণ

ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র 

মেঘলা চিতা আগে বাংলাদেশের সিলেট, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় দেখা যেত। ছবি: সংগৃহীত

আগে লোকালয়ের কাছাকাছি বা বড় কোনো গাছে বা বাঁশঝাড়ে যে ছোট বাঘটিকে দেখে মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়ত, সেটিই মেঘলা চিতা। মানুষ এদের আক্রমণাত্মক মনে করত। আদতে এরা মানুষের কোনো ক্ষতি করে না, বরং বনেই লুকিয়ে থাকতে পছন্দ করে। এই গেছো বাঘ বা মেঘলা চিতা একটা কাজেই পটু; মানুষ বলে থাকে, এরা চোখের পলকে এক গাছের ডাল থেকে উড়ে যেতে পারে আরেক গাছের ডালে। এমনকি মানুষ গাছের নিচ দিয়ে হেঁটে চলার সময়ও এদের দেখতে পায় না।

কিছুদিন আগে ইনানীতে মেঘলা চিতা পাওয়ার খবরটি প্রায় সব মিডিয়াতে এসেছে। এই খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই প্রসঙ্গও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, মেঘলা চিতা নিয়ে সবার মধ্যে কেন এত উৎসাহ-উদ্দীপনা? এর গুরুত্ব কতটুকু? সংরক্ষণবিদেরা কেন এটি নিয়ে ভাবছেন?

কক্সবাজার থেকে সামান্য দূরে ইনানী জাতীয় উদ্যান। এই উদ্যানে এক গবেষণায় ২৩ প্রজাতির বন্য প্রাণীর সন্ধান পাওয়া গেছে। ক্যামেরা ট্র্যাপ, লাইন ট্রানসেক্ট, স্পটিং প্রভৃতির মাধ্যমে এই গবেষণা চালানো হয়। পুরো উদ্যানকে ১১টি জোনে ভাগ করে এই গবেষণা চালানো হয়। ৩২টি স্থানে ক্যামেরা, সরাসরি দেখা ও শব্দ শুনে শনাক্ত করা হয়। এশিয়ান হাতি, মায়া হরিণ, বুনো শূকর, লাল বানর, শহরমুখী বানর, মুখপোড়া হনুমান, বড় বাগডাশ, মেছো বিড়াল, কাঁকড়াভুক বেজি, গন্ধগোকুল, ছোট গন্ধগোকুল, ইরাবতী কাঠবিড়ালী, লাল উড়ন্ত কাঠবিড়ালী প্রভৃতি পাওয়া গেছে।

মেঘলা চিতা একটি বিড়াল প্রজাতির বন্য প্রাণী। এরা দৈর্ঘ্যে ৯৫ সেন্টিমিটার থেকে ১২০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। অর্থাৎ মাঝারি আকারের। এদের গেছো বাঘ বা লাম চিতাও বলা হয়। এরা মূলত বৃক্ষচর প্রাণী। এদের পা ও লম্বা লেজ আছে। যার সাহায্যে তারা গাছের ডালে ভারসাম্য রক্ষা করতে পারে। এরা শিকারি। এ জন্য এদের দাঁতও অনেক বড় হয়।

শিকারের কারণে মেঘলা চিতা বিভিন্ন স্তন্যপায়ী প্রাণীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখে। এদের সংখ্যা কমে গেলে অন্যান্য প্রাণী, যাদের এরা শিকার করে, তাদের সংখ্যা বেড়ে যাবে। ফলে বিভিন্ন স্তন্যপায়ী প্রাণীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। এ জন্য মেঘলা চিতাকে বনের স্বাস্থ্য নির্দেশক বলা হয়। এদের উপস্থিতি দ্বারা এটা বোঝা যায় যে পরিবেশগত দিক থেকে বনটি কতটা ঘন ও স্বাভাবিক অবস্থায় আছে।

আগে বাংলাদেশের সিলেট, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় এদের দেখা যেত। বলা হয়ে থাকে, ২০০৬ সালে মেঘলা চিতা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অল্প বিস্তর দেখা গেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মুনতাসির আকাশের মতে, ২০০৬ সালে মেঘলা চিতা জামালপুরে, ২০০৯ সালে রাঙামাটি, ২০১৪-১৫ সালে বান্দরবান, ২০১৮ সালে মাতামুহুরী ও ২০২১ সালে কাপ্তাই জাতীয় উদ্যানে দেখা গেছে। ২০১৭ সালে কক্সবাজারের পাহাড়ি বনাঞ্চলে এটিকে দেখা যায়।

মেঘলা চিতার মূল বিস্তার হিমালয়ের পাদদেশে। দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া ও চীনে এদের পাওয়া যায়। একটি তথ্যমতে, এদের সংখ্যা সারা পৃথিবীতে ১০ হাজারের কম। গেছো বাঘ খুবই লাজুক। এরা নিশাচর বৃক্ষবাসী। বড় বড় গাছের ডালে এরা শুয়ে বসে বিশ্রাম নেয়। এদের প্রধান খাদ্য বানর, কাঠবিড়ালী, ইঁদুর, গেছো ইঁদুর, পাখি ইত্যাদি। বুনো শূকর, হরিণ, বুনো ছাগলও এরা শিকার করে। বন্য অবস্থায় এরা ১১ থেকে ১২ বছর পর্যন্ত বাঁচতে পারে। এরা লাজুক প্রকৃতির হলেও খুব তাড়াতাড়ি পোষ মানে। আসামের চা-বাগানের মালিকেরা গেছো বাঘ পুষতেন। এরা এক থেকে তিনটি বাচ্চা দেয়। এক বছর পর্যন্ত বাচ্চারা মায়ের সঙ্গেই থাকে। দুই বছর বয়সে এরা প্রজননক্ষম হয়।

কিন্তু নানা কারণে এদের সংখ্যা এখন বিলুপ্তির দিকে চলে গেছে। বিশেষ করে বন উজাড়, পাহাড়ি বন ধ্বংস ও অবৈধ চামড়া ও হাড়ের বাণিজ্যের কারণে এদের সংখ্যা নেই বললেই চলে এখন। আইইউসিএন মেঘলা চিতাকে সংকটাপন্ন হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ২০২১ সালে এটিকে বৈশ্বিকভাবে বিপন্ন প্রজাতি হিসেবে ঘোষণা করে। এই অবস্থায় মেঘলা চিতাকে আমাদের পরিবেশে টিকিয়ে রাখা অনেক গুরুত্বপূর্ণ।