হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

স্কুল অ্যান্ড কলেজগুলোর গুণগত ‘অর্জন’

বিমল সরকার

পরীক্ষা আছে, তবে এর কোনো কাঙ্ক্ষিত ফল নেই। ছবি: আজকের পত্রিকা

ছয় জেলার সাতটি সরকারি স্কুল অ্যান্ড কলেজ বিগত আওয়ামী সরকারের শাসনামলে ২০১৪ থেকে ২০২৪-এর মধ্যে সরকারীকরণ করা হয়েছিল। তবে এখন পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি ‘স্কুল অ্যান্ড কলেজ’ শুধু ‘স্কুল’ থাকার সময়ের গৌরব ও সুনাম বহন করে চলেছে। স্কুল থেকে কলেজে উন্নীতকরণের পর সেভাবে সুনাম অর্জন করতে পারেনি প্রতিষ্ঠানগুলো। নবম-দশম শ্রেণির পাশাপাশি একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি চালু করে স্কুলের বদলে স্কুল অ্যান্ড কলেজ নামকরণের পর থেকে বলতে গেলে বিপত্তির সূচনা। দিনে দিনে তা ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে।

মূলত কোনো রকম প্রস্তুতি এবং সঠিক পরিকল্পনা ছাড়া প্রধানত আবেগের বশবর্তী হয়ে এমনটা করার কারণে বিপত্তিটার সূচনা বলে শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের অভিযোগ। স্কুলগুলোতে তড়িঘড়ি করে উচ্চমাধ্যমিক স্তর খুলে ‘গরিবের ঘোড়া রোগ’ ডেকে আনার কোনো দরকার ছিল না। বলতে গেলে সবখানে শুধু সুদৃশ্য বহুতল ভবনসহ দৃষ্টিনন্দন নানা স্থাপনা দৃশ্যমান। লেখাপড়া একদম উঠে গেছে, শিক্ষার্থী-শিক্ষকের শুধু আনাগোনাটাই চোখে পড়ে। নানা নামের অভ্যন্তরীণ পরীক্ষা, ফরম পূরণ এবং অতঃপর বোর্ডের চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশ নেওয়া উক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে কৌতূহল না দেখালেও চলবে!

নিজ জেলার পরিস্থিতি অনুধাবন করে ৬৪ জেলা নিয়ে গঠিত পুরো দেশের শিক্ষাচিত্রের খানিকটা অনুমান করা সম্ভব। সামান্য কিংবা ছিটেফোঁটা ব্যতিক্রম কিছু থাকতে পারে, তবে ব্যতিক্রম নিয়ম কিংবা স্বাভাবিকতারই প্রমাণ নির্দেশ করে।

প্রথমে কিশোরগঞ্জ, পরে একে একে ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, জামালপুর, শেরপুর ও টাঙ্গাইল জেলার কিছুটা খোঁজখবর নিয়ে জানা গেছে, সবখানেরই মোটামুটি একই হালহকিকত, একই চিত্র; বড় বেশি ব্যত্যয় নেই।

মূল প্রসঙ্গে চলে যাওয়ার আগে দুটি কথা বলে দেওয়া প্রয়োজন মনে করছি। মাত্র চার দশক সময়, এই তো সেদিনের কথা। ময়মনসিংহ থেকে পৃথক হয়ে কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, জামালপুর ও শেরপুরের স্বতন্ত্র জেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটে। প্রশাসনিক বিভাজন অনুযায়ী, ঢাকা বিভাগ থেকে আলাদা হয়ে ময়মনসিংহ স্বতন্ত্র একটি বিভাগে উন্নীত এবং কিশোরগঞ্জ জেলা ঢাকা বিভাগেরই অধীনে থেকে গেলেও ঐতিহ্যের সূত্র ধরে কিশোরগঞ্জকেও আমি বৃহত্তর ময়মনসিংহের অংশই মনে করি। পাঁচটি জেলাই দীর্ঘদিন ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ছিল। বিভাগ (ডিভিশন) গঠনের পর ময়মনসিংহে স্বতন্ত্র শিক্ষা বোর্ড স্থাপিত হলে কিশোরগঞ্জ ছাড়া বাকি চারটি জেলা ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ডের অধীন হয় আর কিশোরগঞ্জ যথারীতি ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের অধীনেই রয়ে যায়।

অবশ্য একদিক থেকে টাঙ্গাইলকেও বৃহত্তর ময়মনসিংহ হিসেবে গণ্য করা যায়। ময়মনসিংহ থেকে আলাদা হয়ে টাঙ্গাইল স্বতন্ত্র জেলা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৬৯ সালে। শুরু থেকে টাঙ্গাইল ঢাকা বিভাগ ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের অধীন, এখনো তাই আছে।

উচ্চমাধ্যমিক স্তরে পাঠদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রধানত তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায়: ১. জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন ডিগ্রি কলেজ; ২. শিক্ষা বোর্ডের অধীন ইন্টারমিডিয়েট কলেজ এবং ৩. স্কুল অ্যান্ড কলেজ। আমার ভাবনায় বৃহত্তর ময়মনসিংহে বর্তমানে উল্লিখিত তিন ক্যাটাগরির মোট ৪৮০টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ময়মনসিংহ ১৫৩, টাঙ্গাইল ৭৪, জামালপুর ৭৪, কিশোরগঞ্জ ৬৭, নেত্রকোনা ৪৮ এবং শেরপুর জেলায় রয়েছে ৩১টি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সরকারি ৭৩ আর বাকি ৪০৭টি বেসরকারি (এমপিওভুক্ত ও এমপিওবিহীন)। সরকারি ৭৩টির মধ্যে কিশোরগঞ্জ জেলায় ১৭টি, টাঙ্গাইলে ১৫টি, ময়মনসিংহে ১৪টি, নেত্রকোনায় ১১টি, জামালপুরে ১০টি ও শেরপুর জেলায় রয়েছে ৬টি প্রতিষ্ঠান। ৬ জেলার ৭৩টি সরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৭টি হলো স্কুল অ্যান্ড কলেজ। জেলাওয়ারি সরকারি স্কুল অ্যান্ড কলেজ ৭টি হলো: প্রতিষ্ঠাকাল বিবেচনায় ক্রমানুসারে জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলায় অবস্থিত ইসলামপুর সরকারি জে জে কে এম গার্লস হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ (স্থাপিত ১৯১৭), কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর উপজেলায় অবস্থিত হোসেনপুর পাইলট হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ (১৯২০), টাঙ্গাইলের সখীপুর উপজেলায় অবস্থিত সখীপুর পিএম পাইলট মডেল সরকারি স্কুল অ্যান্ড কলেজ (১৯৪৯), কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর উপজেলায় অবস্থিত বাজিতপুর রাজ্জাকুন্নেছা সরকারি পাইলট বালিকা উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজ (১৯৫৫), জামালপুরের সরিষাবাড়ী উপজেলায় অবস্থিত সরিষাবাড়ী সরকারি পাইলট উচ্চমাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় (১৯৫৮), ময়মনসিংহের ধোবাউড়া উপজেলায় অবস্থিত কলসিন্দুর সরকারি উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয় (১৯৭২) এবং ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলায় অবস্থিত সরকারি চারবাড়িয়া হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ (২০০৭)। তবে নেত্রকোনা ও শেরপুর জেলায় এ স্তরের (স্কুল অ্যান্ড কলেজ) বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান থাকলেও এগুলোর কোনোটিই সরকারি নয়।

৯০ বছরের ব্যবধানে (১৯১৭-২০০৭) চার জেলায় উল্লিখিত ৭টি প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে; কোনোটির শুরু ষষ্ঠ-অষ্টম, কোনোটির আবার ষষ্ঠ-দশম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদানের মধ্য দিয়ে। পরবর্তী সময়ে একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি চালু ও নতুন নামকরণ।

২০২৫ সালের উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় ময়মনসিংহের ধোবাউড়া উপজেলার কলসিন্দুর সরকারি উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পাসের হার ৩২.২০ শতাংশ ও অংশগ্রহণকারী মোট পরীক্ষার্থী ছিল ১১৮ জন, গফরগাঁওয়ের সরকারি চারবাড়িয়া হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজের পাসের হার ১.৮৮ শতাংশ এবং মোট পরীক্ষার্থী ছিল ৫৩ জন। কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর রাজ্জাকুন্নেছা সরকারি পাইলট বালিকা উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজের পাসের হার ১১.৭১ শতাংশ এবং মোট পরীক্ষার্থী ছিল ১৩৩ জন; হোসেনপুর সরকারি

পাইলট হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজের পাসের হার ১৪.২৩ শতাংশ এবং মোট পরীক্ষার্থী ছিল ২৬০ জন। জামালপুরের সরিষাবাড়ী সরকারি পাইলট উচ্চমাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের পাসের হার ৫১.২২ শতাংশ এবং মোট পরীক্ষার্থী ছিল ২৪৪ জন; ইসলামপুর সরকারি জে জে কে এম গার্লস হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজের পাসের হার ৪২.৩০ শতাংশ এবং মোট পরীক্ষার্থী ছিল ২০৪ জন। এ ছাড়া টাঙ্গাইলের সখীপুর পিএম পাইলট মডেল সরকারি স্কুল অ্যান্ড কলেজের পাসের হার ৩০.১২ শতাংশ এবং মোট পরীক্ষার্থী ছিল ৮৩ জন)।

উল্লেখ্য, অনেকের কাছে হয়তো অবাক লাগবে, ২০২৪ সালে এইচএসসি পরীক্ষায়ও উল্লিখিত ৭টি সরকারি স্কুল অ্যান্ড কলেজের কোনোটিই বোর্ডের পাসের শতকরা হারটিকে স্পর্শ করতে পারেনি। শুধু তা-ই নয়, এগুলোর মধ্যে একাধিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ বিগত পাঁচ বছরের মধ্যে (২০২১-২৫) কখনো পাসের বোর্ড শতকরা হারের কাছাকাছি থাকতে পারেনি।

অথচ সবার সামনে দেখতে দেখতে দিনে দিনে কীভাবে যেন লেখাপড়াটাই উঠে গেল! প্রতিষ্ঠানগুলোতে যা আছে, তা শুধু আনাগোনা। প্রাত্যহিক ঘণ্টার আওয়াজ, অ্যাসেম্বলি, ক্লাস; বিভিন্ন ধরনের ফি এবং বেতনাদির আদান-প্রদান, প্রাইভেট কোচিং, বিশেষ ক্লাস, পরীক্ষা, ফরম পূরণ—সবই ঠিক আছে। আরও আছে নবীনবরণ, বিদায় সংবর্ধনা, শিক্ষাসফর এবং বিভিন্ন উপলক্ষে অনুষ্ঠানাদি। পরীক্ষাও আছে, তবে এর নেই কোনো কাঙ্ক্ষিত ফল। পৌনঃপুনিক, কখনোবা একাদিক্রমে ভয়াবহ ফল বিপর্যয়ের ঘটনা।

কিন্তু ভাবনার ব্যাপার হলো, ঘোড়া রোগটি নিরাময় হওয়া তো দূরের কথা, বরং বছরের পর বছর সেটি যেন নিরাময়ের যোগ্য হয়ে উঠছে। এইচএসসিতে ভালো করা তো দূরের কথা, এর ফলে এসএসসির ফলেও নেতিবাচক প্রভাব এখন দেখা যাচ্ছে।

এ ব্যাপারে এখনই কঠোর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে দাঁড়াতে পারে ‘সকলই হবে গরল ভেল’ অবস্থার মতো।

কী দেখেছি, আরও কী দেখব

পাহাড় কাটা ও সজলদের জীবন

তেলাপোকার উত্থান ও তারুণ্যের ক্ষোভ

টিকার ট্রায়াল ও আফ্রিকার বিপন্ন শৈশব

এক্সপার্ট রিটায়ার্ড পিপলস পুল

সহজ সমাধান তবু উপেক্ষিতই থাকবে

তব ঘৃণা যেন তারে তৃণসম দহে

বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা কখনোই সুদৃঢ় নয়: উম্মে ওয়ারা

এটা আমাদের পৃথিবী, রক্ষার দায়িত্বও আমাদের

বিড়ম্বনাময় এবারের ঈদযাত্রা