‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বই নিয়ে বাংলাদেশের বিশিষ্ট মার্ক্সবাদী রাজনীতিক ও তাত্ত্বিক বদরুদ্দীন উমরের সামান্য কিছু মূল্যায়নের কথা গত ৩০ সেপ্টেম্বরের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের একটি পোস্টে তুলে ধরেছেন অধ্যাপক মোরশেদ শফিউল হাসান। তাঁর এই বক্তব্য সত্যিকারভাবে দেশের শেখ মুজিবুর রহমানকে যাঁরা পছন্দ করেন না, তাঁদের হতাশ করেছে। তিনি ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ সম্পর্কে সেই মূল্যায়ন তাঁর মৃত্যুর অল্প কিছু বছর আগে করেছিলেন। বদরুদ্দীন উমর সেই বক্তব্যে উল্লেখ করেছিলেন, ‘না, মুজিব ছাড়া অন্য কারও পক্ষে ওই ঘটনা বা বিষয়গুলো জানার বা ওভাবে বলতে পারার কথা নয়। ওটি মুজিবেরই লেখা।’ বদরুদ্দীন উমর শুধু একজন রাজনীতিক নন, তিনি একজন নিষ্ঠাবান গবেষক ও ইতিহাসবেত্তা হিসেবেও তাঁর পরিচিতি আছে দুই বাংলায়।
আসলে ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ শুধু এ কারণেই গুরুত্বপূর্ণ নয় যে এটি শেখ মুজিবুর রহমানের লেখা। বরং একই সঙ্গে তা আরও অধিক গুরুত্বপূর্ণ এ কারণে যে এটি বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাসেরই অংশ। ফলে কোনো দৈবদুর্বিপাকে পৃথিবী নামক গ্রহ যদি সৌরজগৎ থেকে হারিয়ে না যায়, তাহলে বাংলাদেশের ইতিহাস যেমন মুছে ফেলা সম্ভব নয়, তেমনি সম্ভব নয় ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র তথ্য ও ঘটনাবলিকেও মুছে ফেলা।
‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র বিক্রয় বন্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতাসংগ্রামের সেসব ইতিহাস কি আসলেই মুছে ফেলা সম্ভব? ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ আওয়ামী লীগ বা কোনো রাজনৈতিক দলের ইতিহাস নয়। একইভাবে বঙ্গবন্ধুও এ আত্মজীবনী কোনো রাজনৈতিক দলের অবস্থান থেকে লেখেননি বা এ নিয়ে ভবিষ্যতে গ্রন্থ রচিত হতে পারে, সে ভাবনা থেকেও তিনি এটি করেননি। আর সেখানেই এ গ্রন্থের বস্তুনিষ্ঠতা, গ্রহণযোগ্যতা ও গুরুত্ব এত বেশি। একটি বইয়ের বিক্রি বন্ধ করে কখনো ইতিহাস এবং লেখককে নির্মূল করা সম্ভব না। আর এখন তো কোনোভাবেই সেটা সম্ভব না। ফটোকপি, স্ক্যান করিয়ে পিডিএফ করে যেকোনো বই সহসায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নানা মাধ্যম এবং ইমেইলের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া অসম্ভব কোনো কাজ না।
তবে আশার কথা যে কতিপয় বিপথগামী মানুষ ওই বইটি কিছু সময়ের জন্য বিক্রি বন্ধ করে দিলেও, প্রশাসনিক হস্তক্ষেপে ইউপিএলের বাংলা বাজারের বিক্রয়কেন্দ্র চালু করার ব্যবস্থা করেছে।
সবচেয়ে আশার কথা হলো, এই ঘটনার পরপরই বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হয়েছে। ফলে মব করে বইটির বিক্রি বন্ধ করে দেওয়া ব্যক্তিরা গা ঢাকা দিয়েছেন। তবে প্রশ্ন হলো, প্রশাসন এখন পর্যন্ত ওই ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় নিয়ে আসতে পারেনি। এটা প্রশাসনের একটা বড় ব্যর্থতা।
এ ঘটনার পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে কেউ কেউ বলতে চেয়েছেন, আওয়ামী লীগ আমলে শেখ হাসিনার বিশেষ তত্ত্বাবধানে বইটি লেখা হয়। বইটির বিষয়বস্তুর সঙ্গে লেখক হিসেবে শেখ মুজিবের কোনো সম্পর্ক নেই। মানে তাঁরা বলতে চেয়েছেন, শেখ হাসিনা বিশেষ উদ্দেশ্য থেকে বইটি লেখার উদ্যোগ নিয়েছেন। এ ধরনের বক্তব্যে এটাই প্রমাণিত হয় যে তারা শেখ মুজিবের প্রতি রাজনৈতিক ঈর্ষা থেকে গ্রহণ করতে পারেনি। তবে আশার কথা, এর বিরুদ্ধেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি পাল্টা যুক্তি ও তথ্য-উপাত্ত দিয়ে তাঁদের যুক্তি খণ্ডন করেছেন। ফলে শেখ মুজিববিদ্বেষী বলে অভিযুক্তরা হালে পানি পাননি।
তবে নতুন ধরনের মবের ঘটনার সূত্রপাত ঘটেছিল অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে। কিন্তু ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার তো এখন আর ক্ষমতায় নেই। এখন তো নির্বাচিত সরকার। তাহলে এসব ঘটাচ্ছে কারা? তাহলে কি ড. ইউনূস সরকারের সময় শুরু করা মব সন্ত্রাস এখনো কীভাবে চলমান থাকে? প্রশ্ন হলো, দেশ কি তাহলে দৃশ্যমান শক্তির চেয়ে অদৃশ্য শক্তির দ্বারাই পরিচালিত হচ্ছে?
তবে আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, অতীতে, মানে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যাঁরা মুক্তিযুদ্ধের নাম ভাঙিয়ে নানাভাবে সুবিধা ভোগ করেছেন, তাঁদের নিশ্চুপতা! তাঁরা সবাই গর্তে ঢুকে পড়েছেন যেন।
‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে শুধু বাংলাদেশের গত শতাব্দীর রাজনৈতিক ইতিহাসের বর্ণনাই উঠে আসেনি। একই সঙ্গে সেই সময়কার সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও আন্তধর্মীয় মূল্যবোধের নানা ঘটনারও সাক্ষী এ গ্রন্থ। এসব সাক্ষ্য বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের উচ্চশিক্ষাসংশ্লিষ্ট বহু শাখার (ডিসিপ্লিন) জন্য গুরুত্বপূর্ণ আধ্যয়নিক উপকরণ।
‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ কোনো দলের ইতিহাস নয় এবং শেখ মুজিব তা কোনো দলের হয়েও লেখেননি। লিখেছিলেন অবিভক্ত ভারতের ঔপনিবেশিক যুগের শেষ পর্যায়ে ইংরেজবিরোধী আন্দোলন যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে, তখনকার একজন নিম্নমধ্যবিত্ত আধা কৃষক বাঙালি সন্তান হিসেবে। বিশেষ করে এ গ্রন্থ পাঠে, তৎকালীন সময়ের বিশেষ করে ব্রাহ্মণ্যবাদ ভাবধারার হিন্দু সম্প্রদায়ের কিছু ব্যক্তির মুসলমানদের প্রতি বিরূপ ভাবনার কিছু ঘটনা তুলে ধরেছেন লেখক। প্রকৃতপক্ষে এ গ্রন্থ যতটা না সেই সময়কার রাজনৈতিক ঘটনার ইতিহাস, তার চেয়ে অনেক বেশি নিম্নমধ্যবিত্ত আধা কৃষক সন্তানের বেড়ে ওঠা ও নেতৃত্বের গুণাবলি অর্জনের সংগ্রামের ইতিহাস, যে নেতৃত্বক্রমে একটি দেশের স্বাধীনতা অর্জনের সংগ্রামে নেতৃত্বে দানের পর্যায়ে রূপান্তরিত হয়েছিল। আর সে কারণেই প্রতিটি বাঙালির এ গ্রন্থটি পড়া উচিত ইতিহাসের সত্যনিষ্ঠতা বোঝার জন্যও। গ্রন্থটির বিক্রয় কার্যক্রমে বাধা দিতে আসা মব সন্ত্রাসী ও তাদের পৃষ্ঠপোষকদের প্রকাশনা শিল্পের নীতিনৈতিকতা মেনে উত্তম সাহসিকতার সঙ্গে মোকাবিলা করার জন্য ইউপিএলকে আন্তরিক সাধুবাদ ও অভিনন্দন।
লেখক: সাবেক পরিচালক, বিসিক