হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

চেতনা: বিজ্ঞান ও দর্শনের নতুন সংশয়

আসিফ

মানব অস্তিত্বের সবচেয়ে গভীর এবং রহস্যময় দিকটি হলো আমাদের অভিজ্ঞতা অর্জনের ক্ষমতা, যাকে সংক্ষেপে আমরা বলি ‘চেতনা’ বা ‘কনশাসনেস’। খুব প্রাত্যহিক কিছু স্মৃতির কথা ধরা যাক: একটি আমলকীকে জিভে পাওয়ার অনুভূতি, ভেজা সৈকতে হাঁটার সময় পায়ের পাতায় নরম বালুর স্পর্শ, কিংবা গোধূলিলগ্নে তুষারাবৃত পর্বতের চূড়ায় সোনালি রোদের ঝিলিক দেখা—এ সবই তো আমাদের সুনির্দিষ্ট মনোজাগতিক চেতনার জীবন্ত প্রমাণ। শত শত বছর ধরে দর্শন ও বিজ্ঞান এই ধারণার ওপর ভিত্তি করেই মানুষের মনকে অনুধাবন করার চেষ্টা চালিয়েছে। কিন্তু একবিংশ শতকে এসে স্নায়ুবিজ্ঞান ও প্রজ্ঞান বিজ্ঞানের (কগনিটিভ সায়েন্স) অভূতপূর্ব অগ্রগতির মুখে দাঁড়িয়ে এক অভূতপূর্ব ও মৌলিক প্রশ্ন তুলেছেন গবেষকেরা: আমরা যাকে ‘চেতনা’ বলছি, তা কি সত্যিই প্রাকৃতিক জগতের কোনো স্বাধীন ও মৌলিক সত্তা? নাকি বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে এই শব্দটি ব্যবহার করাই এক প্রকাণ্ড ভুল?

সম্প্রতি চিলির সান্টিয়াগোতে বিশ্বের সেরা চেতনা-গবেষক ও স্নায়ুবিজ্ঞানীদের এক আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে অন্যান্য একাডেমিক বিতর্কের পাশাপাশি এই মৌলিক সংশয়টি সবচেয়ে জোরালোভাবে সামনে এসেছে। একটি নবজাতক শিশু, ছোট একটি মৌমাছি কিংবা আজকের দ্রুত বিকাশমান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (এআই)—এদের কারোর কি আদৌ অনুভূতি বা চেতনা আছে? আমরা কীভাবে তা পরিমাপ করব? নাকি বৈজ্ঞানিক গবেষণার একটি একক ভিত্তি হিসেবে ‘চেতনা’ ধারণাটিই অনুপযুক্ত এবং বিভ্রান্তিকর?

চেতনা নিয়ে বহুকাল ধরে বহুবিধ গবেষণা হলেও আজ পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা এর কোনো সর্বজনীন, সুনির্দিষ্ট কিংবা সর্বসম্মত সংজ্ঞায় পৌঁছাতে পারেননি। বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখা এবং দর্শনে শব্দটিকে সম্পূর্ণ আলাদা আলাদা প্রেক্ষাপটে ব্যবহার করা হয়। যেমন অনুভূতিশীলতা (সেন্টিয়েন্স): কোনো বাহ্যিক উদ্দীপনা বা ব্যথা-বেদনা সরাসরি অনুভব করার ক্ষমতা; সচেতনতা (অ্যাওয়ারনেস): পরিবেশ এবং নিজের পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে সম্যক ধারণা রাখা; স্বাতন্ত্র্যসূচক অভিজ্ঞতা (কোয়ালিয়া): ব্যক্তিকেন্দ্রিক নিজস্ব অনুভূতির রূপ, অর্থাৎ কোনো বস্তুনিষ্ঠ অভিজ্ঞতার ভেতরের অনুভূতি।

পরিভাষার এই অস্পষ্টতা কোনো সাধারণ বিষয় নয়। এটি আমাদের এক গভীর সন্দেহের মুখে ফেলে দেয়—বিভিন্ন ক্ষেত্রের গবেষকেরা যখন ‘চেতনা’ নিয়ে কথা বলেন, তারা কি আদৌ একই বস্তু বা প্রক্রিয়া নিয়ে কাজ করছেন, নাকি একেকজন সম্পূর্ণ ভিন্ন ভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক বিষয়কে একই নামে ডাকার ভুল করছেন?

১৯৯০-এর দশকে ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (এমআইটি) প্রখ্যাত দার্শনিক নেড ব্লক এই বিভ্রান্তি দূর করতে এক বিশেষ পরিভাষা উপস্থাপন করেন—‘ফেনোমেনাল কনশাসনেস’ বা অনুভূতির চেতনা। সহজ কথায়, এটি হলো কোনো অভিজ্ঞতা অর্জনের সময় ভেতরের সেই মূল অনুষঙ্গ, মনস্তাত্ত্বিক পরিভাষায় যাকে বলা হয় ‘কেমন লাগছে’ অনুভূতি (ফিলস লাইক সামথিং)।

আমরা যখন সজাগ ও স্বাভাবিক থাকি, তখন আমাদের ভেতরে অনুভূতির একটি অবিরাম ও অলক্ষিত ধারা প্রবাহিত হতে থাকে। কিন্তু যখন একজন মানুষ গভীর, স্বপ্নহীন ঘুমে মগ্ন থাকেন কিংবা কোনো শল্যচিকিৎসার পূর্বে তাঁকে চেতনানাশক বা অ্যানেসথেসিয়া দেওয়া হয়, তখন এই ‘কেমন লাগছে’ ভাবটি সাময়িকভাবে পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে যায়।

তিন দশক ধরে এই ‘ফেনোমেনাল কনশাসনেস’-এর ধারণাই চেতনা-বিজ্ঞানের প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে। বিজ্ঞানের পাশাপাশি এটি নৈতিকতা ও দর্শনের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, কোনো একটি সত্তা—তা কোনো মানব শিশু হোক, কোনো মৌমাছি হোক কিংবা সিলিকন চিপে তৈরি কোনো অত্যাধুনিক অ্যালগরিদম হোক—তার যদি ‘কেমন লাগছে’ টাইপের নিজস্ব অনুভূতি থাকে, তবেই সেটিকে নৈতিক অধিকার বা বিশেষ সুরক্ষার আওতায় আনার প্রশ্ন ওঠে।

আমাদের মনে হতে পারে, চেতনার এই অনুভূতি সর্বজনীন ও চিরন্তন। কিন্তু ঐতিহাসিক ও ভাষাগত বিশ্লেষণ আমাদের এক নতুন সত্যের মুখোমুখি করে। ব্রিটিশ দার্শনিক ক্যাথলিন ভি. উইলকস তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন যে মানব সংস্কৃতিতে ‘চেতনা’ বা ‘ফেনোমেনাল কনশাসনেস’-এর মতো সমন্বিত কোনো ধারণার উপস্থিতি সব সময় ছিল না। প্রাচীন গ্রিক, ম্যান্ডারিন, ক্রোয়েশীয় কিংবা ১৭ শতকের আগের ইংরেজিতে এই আধুনিক চেতনার কোনো প্রত্যক্ষ সমার্থক শব্দই খুঁজে পাওয়া যায় না।

এমনকি পৃথিবীর বিভিন্ন আদিবাসী সংস্কৃতি ও প্রাচীন ভাষার মনস্তাত্ত্বিক পরিভাষায় মন ও চিন্তাকে যেভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, তা আধুনিক পাশ্চাত্য বিজ্ঞানের চেতনার সংজ্ঞার সঙ্গে মেলে না। এর অর্থ দাঁড়ায়, যে ‘চেতনা’কে আমরা মানুষের সর্বজনীন মানসিক অবয়ব ভেবে এসেছি, তা হয়তো প্রাচীন সভ্যতার কোনো মৌলিক সত্য নয়; বরং আধুনিক ইউরোপীয় দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিক চিন্তাকাঠামোর তৈরি একটি বিশেষ ঐতিহাসিক ধারণা মাত্র।

বিজ্ঞান যদি চেতনার কোনো নির্দিষ্ট বস্তুগত বা স্নায়বিক ভিত্তি খুঁজে না পায়, তবে এই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই—আমরা কি একটি কাল্পনিক বা ভুল ধারণাকে সত্য ধরে নিয়ে উত্তর খুঁজছি? বিজ্ঞান ও পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, এমনটি আগেও ঘটেছে। সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতকে বস্তুর দহনপ্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করার জন্য ‘ফ্লজিস্টন’ নামে এক অদৃশ্য উপাদানের অস্তিত্ব কল্পনা করা হয়েছিল। আবার ঊনবিংশ শতাব্দীতে মহাশূন্যে আলোর তরঙ্গ সঞ্চালনের মাধ্যম হিসেবে কল্পনা করা হয়েছিল ‘ইথার’-কে। শত বছর ধরে তৎকালীন সেরা বিজ্ঞানীরা এই ইথার ও ফ্লজিস্টনের ধর্ম পরিমাপ করার জোর চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। কিন্তু বিজ্ঞান যখন আরও বস্তুনিষ্ঠ রূপ নিল, দেখা গেল প্রকৃতিতে এগুলোর কোনো অস্তিত্বই নেই। ধারণাগুলো স্রেফ আমাদের চিন্তার ভুল ছিল।

অনেক প্রজ্ঞান বিজ্ঞানী ও স্নায়ুবিজ্ঞানী মনে করছেন, ‘চেতনা’ ধারণাটির পরিণতিও হয়তো ফ্লজিস্টন বা ইথারের মতোই হতে যাচ্ছে। চেতনা হয়তো একক কোনো বস্তু, তরল বা নির্দিষ্ট স্নায়বিক প্রক্রিয়া নয়। বরং এটি মনোযোগ (অ্যাটেনশন), তথ্য সংরক্ষণ বা স্মৃতি (মেমোরি), আবেগের প্রকাশ এবং আত্মসচেতনতার (সেল্‌ফ-অ্যাওয়ারনেস) মতো মস্তিষ্কের শত শত জটিল কাজের এক সমন্বিত ফল। এই পুরো ব্যবস্থাটিকে একটিমাত্র ‘চেতনা’ নামের শব্দে বন্দী করে উত্তর খোঁজা বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের পথকে ব্যাহত করছে।

এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গির সূচনা

‘চেতনা বাস্তব কোনো সত্তা নয়’—এই সম্ভাবনার কথা বলার অর্থ কিন্তু এটি নয় যে আমাদের প্রেম, আনন্দ, দুঃখ, ব্যথা বা নান্দনিক অভিজ্ঞতার কোনো বাস্তব মূল্য নেই। বরং এর আসল বার্তা হলো: মানব মন, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতার অসীম জটিলতাকে প্রকাশ করার জন্য আমাদের প্রচলিত ভাষা এবং বৈজ্ঞানিক কাঠামোটি হয়তো অত্যন্ত অপ্রতুল।

বিজ্ঞান যদি ‘চেতনা’ নামে একটি গোলকধাঁধাপূর্ণ একক শব্দের পেছনে ছুটতে থাকা বন্ধ করে, এবং এর পরিবর্তে মস্তিষ্ক কীভাবে মনোযোগ সাজায়, কীভাবে স্মৃতির অণুগুলো ধরে রাখে বা কীভাবে বিভিন্ন সংবেদনকে একত্রিত করে একটি নির্দিষ্ট প্রতিক্রিয়া তৈরি করে, সেই নির্দিষ্ট স্নায়বিক প্রক্রিয়াগুলোকে আলাদাভাবে অনুধাবন করার চেষ্টা চালায়, তবেই হয়তো আমরা আসল উত্তরের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারব। কেবল এই বস্তুনিষ্ঠ দৃষ্টিভঙ্গিই পারে মানব মন, প্রাণিজগতের বৈচিত্র্যময় জগৎ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার মূল রহস্য উন্মোচনে বিজ্ঞানকে নতুন এক দিগন্তে নিয়ে যেতে।

লেখক: বিজ্ঞান বক্তা ও সম্পাদক, মহাবৃত্ত