হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

নারীর নিরাপত্তা

মিথিলা জসিম তন্নি

একজন নারীর নিরাপদে বেঁচে থাকা আজ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এক বা দুই দশক আগে বলা হতো নারীরা ঘরের বাইরে অনিরাপদ, ঘরে তারা সুরক্ষিত। কিন্তু বর্তমান সময়ের পরিসংখ্যান ও বাস্তবতা আমাদের এক নির্মম সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ বা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের রিপোর্ট দেখলেই বোঝা যায়, নির্যাতনের বড় অংশই ঘটে পরিচিত মানুষ, আত্মীয়, এমনকি পরিবারের ভেতরেই। ঘরের চেনা পরিবেশ থেকে শুরু করে বাইরের কর্মক্ষেত্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণপরিবহন কিংবা ভার্চুয়াল জগৎ কোথাও নারীরা নিজেদের সম্পূর্ণ নিরাপদ বোধ করতে পারছে না। একজন স্কুলছাত্রী স্কুলে যেতে ভয় পায়, একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী হলে নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কায় থাকে, একজন কর্মজীবী নারী অফিস থেকে ফিরতে দেরি হলে পরিবার দুশ্চিন্তায় থাকে, আর একজন নারী অনলাইনে নিজের ছবি দিতেও দশবার ভাবে। প্রতিদিন খবরের কাগজের পাতা উল্টালেই ভেসে ওঠে নারী ও শিশু নির্যাতনের নানা বিভীষিকাময় খবর। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, এই স্বাধীন ও সভ্য সমাজে নারীর জন্য আসলে নিরাপদ আশ্রয় কোথায়?

নিরাপত্তা কোনো ভৌগোলিক সীমানা বা চার দেয়াল দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। নারীর আসল নিরাপত্তা লুকিয়ে থাকে সমাজের সমষ্টিগত মানসিকতা, দৃষ্টিভঙ্গি এবং রাষ্ট্রের আইনের কঠোর ও দ্রুত প্রয়োগের মধ্যে। যতক্ষণ পর্যন্ত আমাদের সমাজ নারীকে একজন অবলা, দুর্বল কিংবা ভোগ্যপণ্য হিসেবে দেখার মানসিকতা পরিহার না করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো স্থানই তাদের জন্য নিরাপদ হবে না।

যেকোনো পরিবর্তনের প্রথম পাঠশালা হলো পরিবার। আমাদের পারিবারিক শিক্ষায় পরিবর্তন আনা জরুরি। কন্যাসন্তানকে কেবল মানিয়ে নেওয়া, সহ্য করা বা চুপ থাকার শিক্ষা না দিয়ে, তাদের আত্মবিশ্বাসী, প্রতিবাদী ও স্বাবলম্বী হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। তাকে শেখাতে হবে ‘না’ বলতে পারা কোনো অপরাধ নয়, এটা তার অধিকার। একই সঙ্গে, পুত্রসন্তানকে ছোটবেলা থেকেই নারীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে শেখাতে হবে। একটি ছেলে যখন দেখবে তার বাবা তার মাকে সম্মান করছে, তার মতামতকে গুরুত্ব দিচ্ছে, তখনই সে নারীকে সম্মান করতে শিখবে।

নারী নির্যাতনের ঘটনাগুলো বারবার ঘটার অন্যতম প্রধান কারণ হলো বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং দীর্ঘসূত্রতা। একটি মামলা বছরের পর বছর চলতে থাকে, ভুক্তভোগীকে বারবার আদালতে গিয়ে হয়রানির শিকার হতে হয়, সমাজে তাকে প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়। আর অপরাধী প্রভাবশালী হলে পার পেয়ে যাওয়ার যে প্রবণতা, তা সাধারণ অপরাধীদের আরও সাহসী করে তোলে। অপরাধী যেই হোক না কেন, দ্রুততম সময়ের মধ্যে কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালকে আরও সক্রিয় করতে হবে। ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার এবং ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের সংখ্যা ও সেবার মান বাড়াতে হবে, যাতে একজন নারী ভয় না পেয়ে অভিযোগ করতে পারে।

অর্থনৈতিক স্বাধীনতার প্রয়োজনে আজ নারীরা ঘরের বাইরে আসছে এবং দেশের উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখছে। গার্মেন্টস থেকে শুরু করে করপোরেট অফিস, সবখানেই নারীর অবদান। কিন্তু তাদের এই পথচলাকে মসৃণ করতে রাষ্ট্র ও প্রশাসনকে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। গণপরিবহনে নারীদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা, বাসে যৌন হয়রানি রোধে কঠোর ব্যবস্থা, রাস্তাঘাটে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা, সিসিটিভি ক্যামেরা বাড়ানো এবং জরুরি হেল্পলাইন ৯৯৯-এর কার্যকারিতা আরও বাড়ানো দরকার। প্রতিটি সরকারি-বেসরকারি কর্মক্ষেত্রে হয়রানি প্রতিরোধে হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী কার্যকর কমিটি সক্রিয় রাখা এখন সময়ের দাবি।

বর্তমান যুগে নারীদের বড় একটি অংশ সাইবার বুলিং ও অনলাইনের বিভিন্ন সহিংসতার শিকার হচ্ছে। ছবি বিকৃতি, ব্ল্যাকমেইল, ব্যক্তিগত ছবি ছড়িয়ে দেওয়া, কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য আজ নিত্যদিনের ঘটনা। ডিজিটাল মাধ্যমে নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনকে আরও কঠোর ও দ্রুত কার্যকরের আওতায় আনতে হবে। ভুক্তভোগীদের জন্য সহজে, পরিচয় গোপন রেখে অভিযোগ করার ব্যবস্থা করতে হবে এবং স্কুল-কলেজে ডিজিটাল লিটারেসি শেখাতে হবে।

আমাদের পাঠ্যপুস্তকে এখনো অনেক জায়গায় নারীকে দুর্বল করে দেখানো হয়। সেখানে নারী-পুরুষের সমতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং আত্মরক্ষার কৌশল বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। অন্যদিকে, নাটক-সিনেমা-বিজ্ঞাপনে নারীকে পণ্য হিসেবে উপস্থাপন বন্ধ করতে হবে। ‘ইভ টিজিং’কে প্রেম হিসেবে দেখানো বন্ধ করতে হবে। সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ও মানসিকতার পরিবর্তনের আসল লড়াইটা এখানেই—আইন দিয়ে সব হয় না, যদি মানসিকতা না বদলায়।