২০২৫ সালটি বাংলাদেশের অর্থনীতির যেমন কোনো বড় সাফল্যের বছর ছিল না, তেমনি সম্পূর্ণ বিপর্যয়ের বছরও ছিল না। বছরটি ছিল অনেকটা স্রোতোবহা নদীর মাঝখানে ভেসে থাকা নৌকার মতো, যেখানে পেছনে প্রবল চাপ আর সামনে অনিশ্চিত পথ। বড় ধরনের ধসের একদম কাছ থেকে ফিরে এসে অর্থনীতি ধীরে ধীরে সামলে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছে। রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাব, বৈদেশিক মুদ্রাব্যবস্থার টানাপোড়েন, মূল্যস্ফীতির চাপ এবং ব্যাংকিং খাতের দীর্ঘদিনের দুর্বলতা মিলিয়ে ২০২৫ সাল অর্থনীতিকে এনে ফেলেছে এক কঠিন সন্ধিক্ষণে। কিছু সূচকে বাইরে থেকে স্বস্তির আভাস মিললেও ভেতরে জমে থাকা অনিশ্চয়তা ও আস্থার সংকট এখনো পুরোপুরি দূর হয়নি।
এই কঠিন বাস্তবতায় অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের ব্যবস্থাপনাকে পুরোপুরি ব্যর্থ বলা যায় না। অন্তত অর্থনীতির তাৎক্ষণিক রক্তক্ষরণ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে। বিশেষ করে বৈদেশিক খাতে রিজার্ভ ও রেমিট্যান্সে যে স্থিতিশীলতা এসেছে, তা না হলে পরিস্থিতি আরও গুরুতর হয়ে উঠতে পারত। তবে এই স্বস্তির পাশাপাশি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও সামনে চলে আসছে। এই অগ্রগতি কি সত্যিকারের পুনরুদ্ধারের পথে এগোনোর ইঙ্গিত, নাকি কেবল সংকট সামাল দিতে সময় কেনার একটি সাময়িক সুযোগ মাত্র।
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলেই সামনে আসে উচ্চ সুদের হার ও বিনিয়োগের স্থবিরতার চিত্র। বর্তমানে ব্যাংকঋণের গড় সুদহার ১২ থেকে ১৫ শতাংশের মধ্যে ঘোরাফেরা করছে, যা ব্যবসা ও শিল্পের জন্য সহায়ক নয় বলে উদ্যোক্তাদের অভিযোগ। বাংলাদেশ যেহেতু মূলত ঋণনির্ভর অর্থনীতি, তাই এই উচ্চ সুদ সরাসরি অর্থনৈতিক কার্যক্রমের গতি কমিয়ে দিয়েছে। উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে, নতুন বিনিয়োগ প্রকল্প থমকে আছে, আর উদ্যোক্তারা ঝুঁকি নিতে অনীহা দেখাচ্ছেন। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের যুক্তিতে সুদের হার কঠোর রাখা হলেও, সরবরাহ ঘাটতি ও কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে এর কাঙ্ক্ষিত সুফল এখনো পুরোপুরি দৃশ্যমান হয়নি।
এর প্রভাব পড়েছে সামগ্রিক প্রবৃদ্ধিতেও। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৩.৯৭ শতাংশে, যা আগের অর্থবছরের ৪.২২ শতাংশ থেকে কম। রাজনৈতিক অস্থিরতা আর কঠোর মুদ্রানীতির ছাপ এখানে স্পষ্ট, যা বিনিয়োগকারীদের সতর্ক করে তুলেছে। বিশ্বব্যাংক যেখানে প্রবৃদ্ধিকে ৪ শতাংশের কাছাকাছি ধরেছে, সেখানে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক বলছে ৩.৯ শতাংশ। তবে এই সংখ্যার আড়ালে একটি গল্প লুকিয়ে আছে। অর্থবছরের প্রথমার্ধে উৎপাদনে ধাক্কা এলেও দ্বিতীয়ার্ধে রপ্তানি আর রেমিট্যান্স অর্থনীতিকে ভর দিয়ে রেখেছে।
এই পুরো ছবির সবচেয়ে স্পষ্ট ক্ষতচিহ্ন হয়ে উঠেছে মূল্যস্ফীতি। সাধারণ মানুষের জীবনে এর চাপ সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয়েছে। নভেম্বরে পয়েন্ট টু পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি ৮.২৯ শতাংশে উঠেছে, যা আগের মাসের চেয়ে সামান্য বেশি। খাদ্যে মূল্যস্ফীতি ৭.৩৬ শতাংশ আর খাদ্যবহির্ভূত ৯.০৮ শতাংশ। চাল আর প্রোটিনজাতীয় পণ্যের দাম বাড়ার কারণেই এই চাপ। ২০২৫ সালে মূল্যস্ফীতি ৯ থেকে ১০ শতাংশের ওপর ঘোরাফেরা করেছে, যদিও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর নীতির ফলে বছরের শেষে কিছুটা কমার ইঙ্গিত মিলছে। বৈশ্বিক জ্বালানি দামের ওঠানামা আর দেশের ভেতরের সরবরাহ সমস্যাই এখানে মূল কারণ, যা সবচেয়ে বেশি ভুগিয়েছে নিম্ন আয়ের মানুষকে। তবু আশার কথা, সরকারের ফিসকাল সংযম আর আমদানি নিয়ন্ত্রণ ঠিকঠাক থাকলে ২০২৬ সালের জুন নাগাদ এটি ৭ শতাংশের নিচে নামার সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে।
এই অস্থিরতার মধ্যে অর্থনীতির সবচেয়ে বড় ভরসা হয়ে উঠেছে রেমিট্যান্স। ২০২৫ সালে মোট রেমিট্যান্স ৩০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২৫ থেকে ২৬ শতাংশ বেশি। নভেম্বরে এসেছিল ২.৮৮ বিলিয়ন ডলার। ডিসেম্বরে এসেছে ৩.২৩ বিলিয়ন ডলার। মার্চে রেকর্ড ৩.৩০ বিলিয়ন ডলার এসেছিল। হুন্ডি দমন আর ফরমাল চ্যানেলের প্রণোদনাই এই সাফল্যের পেছনে বড় কারণ। প্রবাসীদের পাঠানো এই অর্থই তখন দেশের অর্থনীতিকে টিকিয়ে রেখেছে, যখন অন্য অনেক খাত হাঁপিয়ে উঠছিল।
রপ্তানির চিত্রটা অবশ্য এতটা সরল নয়। তৈরি পোশাক খাত শক্ত থাকলেও সামগ্রিকভাবে ওঠানামা চোখে পড়ার মতো। নভেম্বরে রপ্তানি আয় নেমেছে ৩.৮৯ বিলিয়ন ডলারে, যা আগের মাসের তুলনায় ৫.৫৪ শতাংশ কম। অক্টোবরে সামান্য ঘুরে দাঁড়ালেও আগস্টেই দেখা গিয়েছিল পতনের ইঙ্গিত। জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত আরএমজি রপ্তানি ৩৫.৫৯ বিলিয়ন ডলার হয়েছে, যা মূলত ইইউ আর যুক্তরাষ্ট্রের চাহিদার ফল। কিন্তু কিছু পণ্যে যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ শুল্ক আর বৈশ্বিক চাহিদা কমে যাওয়ায় বছরের শেষ দিকে ধস নেমেছে। খাতটি এখনো ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে, তবে ঝুঁকিও কম নয়।
এই টালমাটাল অবস্থার মাঝেই কিছুটা স্বস্তি দিয়েছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। ডিসেম্বরের মাঝামাঝি গ্রস রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩২.৭২ বিলিয়ন ডলারে, আর বিপিএম ৬ হিসাবে ২৮.০৩ বিলিয়ন। এক বছর আগের তুলনায় এই উন্নতি দেখায় যে ডলার ব্যবস্থাপনায় কিছুটা শৃঙ্খলা এসেছে। এই রিজার্ভ দিয়ে তিন মাসের বেশি আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব, যা বৈশ্বিক ঝাঁকুনির সময় বড় ঢাল হিসেবে কাজ করছে। তবে ডলারের দাম ১২২ থেকে ১২৩ টাকায় ঘোরাফেরা করায় পুরো স্থিতিশীলতা এখনো নিশ্চিত নয়।
সবচেয়ে গভীর ক্ষতটা রয়ে গেছে ব্যাংকিং খাতে। খেলাপি ঋণের ভার যেন পুরো অর্থনীতিকে চেপে ধরেছে। সেপ্টেম্বরে খেলাপি ঋণ পৌঁছেছে ৬.৪৪ লাখ কোটি টাকায়, যা মোট ঋণের ৩৫.৭৩ শতাংশ। এটি ২৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। নেট এনপিএল ২৬.৪ শতাংশ, যা এশিয়ায়ও সর্বোচ্চ পর্যায়ে। পুরোনো অনিয়ম, রাজনৈতিক প্রভাব আর দুর্বল তদারকিই এই সংকটের মূল কারণ। ব্যাংক একীভূতকরণ আর রেজলিউশন অর্ডিন্যান্সের মতো সংস্কার শুরু হলেও এই খাত এখনো মেরামতের মাঝপথে আটকে আছে।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে বেকারত্বের চাপ, যা অর্থনীতির সামাজিক দিকটাকে আরও গাঢ় করেছে। ২০২৫ সালে বেকারত্বের হার প্রায় ৫ শতাংশে পৌঁছেছে। যুব বেকারত্ব প্রায় ১০ শতাংশের কাছাকাছি। মোট বেকার ২৭.৪ লাখ মানুষ। বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় নতুন চাকরি তৈরি হয়নি, ফলে দারিদ্র্যের চাপ বেড়েছে। সরকার দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি চালালেও এর প্রভাব এখনো খুব সীমিত।
খাদ্য আর জ্বালানি খাতে কিছুটা স্থিতিশীলতা থাকলেও বিতরণের দুর্বলতা বড় চ্যালেঞ্জ। খাদ্যস্ফীতি ৮ শতাংশের ওপরে থাকলেও আমদানি আর ওপেন মার্কেট সেলের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া গেছে। উৎপাদন স্থিতিশীল থাকায় চালের দাম বছরের শেষে কমেছে অনেকটা। জ্বালানি খাতে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ৩০ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি হলেও গড় সরবরাহ আটকে আছে ১৫ থেকে ১৬ হাজারে। এই ভারসাম্যহীনতাই দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করছে।
রাজস্ব আর ফিসকাল নীতিতে সংস্কারের চেষ্টা শুরু হয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে ভাগ করা হয়েছে, বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে ব্যয় সংকোচন করা হয়েছে। তবে রাজস্ব জিডিপি অনুপাত এখনো ১০ শতাংশের নিচে, যা দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে কম। কাগজে নকশা তৈরি হলেও বাস্তবে দাঁড়াতে সময় লাগছে।
এ সবকিছুর ওপর ভর করে আছে বৈশ্বিক চাপ আর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা। যুক্তরাষ্ট্রের ট্যারিফ, ইউরোপের চাহিদা কমে যাওয়া আর দেশের ভেতরের নির্বাচনী প্রস্তুতি নীতিনির্ধারণকে প্রভাবিত করছে। সুদহার ১৫ শতাংশে ওঠায় বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৬.৩৫ শতাংশে, যা দুই দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। কেউ বলছেন, এই কঠোরতা মূল্যস্ফীতি ঠেকিয়েছে। কেউ বলছেন, এতে অর্থনীতি হাঁপিয়ে পড়েছে। এই দ্বন্দ্বই যেন ২০২৫ সালের অর্থনীতির আসল চরিত্র।
তবু সামনে তাকালে চিত্রটা পুরোপুরি অন্ধকার নয়। ২০২৬ সালে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৮ থেকে ৫ দশমিক ১ শতাংশে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে। রাজনৈতিক স্থিরতা বজায় থাকলে এবং সংস্কারপ্রক্রিয়া থেমে না গেলে মূল্যস্ফীতি নেমে আসতে পারে ৫ দশমিক ৫ শতাংশে। এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চাবিকাঠি।
সব মিলিয়ে ২০২৫ সাল বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য ছিল মেরামতের সময়। অর্থনীতি এখনো পুরোপুরি সুস্থ নয়, তবে আইসিইউ থেকে বেরিয়ে আসার প্রচেষ্টা স্পষ্ট। রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কিছুটা ভরসা জোগালেও খেলাপি ঋণ, মূল্যস্ফীতি ও বেকারত্ব এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়ে গেছে। এই চাপ কাটিয়ে উঠতে পারলে ২০২৬ সাল সত্যিই নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে, যেখানে সংকট পেছনে পড়ে যাবে এবং সামনে খুলে যাবে স্থিতিশীলতার পথ।
লেখক: ব্যাংকার ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক