সাক্ষাৎকার

গ্যাস অনুসন্ধান না করার কারণে আজকের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে

ড. ইজাজ হোসেন জ্বালানি ও টেকসই উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সাবেক অধ্যাপক, বুয়েটের ফ্যাকাল্টি অব ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ডিন ছিলেন। জ্বালানি দক্ষতা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদন বিষয়ে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন তিনি। জ্বালানি সংকটের ভয়াবহতার কারণ এবং এ থেকে উদ্ধার পেতে করণীয় কী—এ নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন আজকের পত্রিকার মাসুদ রানা

বর্তমানে জ্বালানি সংকটের কারণ কী?

জ্বালানি সংকট তো নতুন কোনো ব্যাপার নয়। আগে থেকেই সেটা ছিল। বর্তমান সংকটটা হলো সরবরাহের সংকট। আর একটা কারণ হচ্ছে, আওয়ামী লীগের শেষ ১০ বছরে নতুন করে গ্যাস অনুসন্ধান করা হয়নি। সে সময় গ্যাস অনুসন্ধান এতটাই অবহেলিত থেকেছে যে গ্যাস আহরণের চেয়ে এলএনজি আমদানিতেই বেশি নজর দেওয়া হয়েছে। গভীর সমুদ্রবন্দরে গ্যাস আহরণের কোনো কাজই আমরা শুরু করতে পারিনি। কয়েকবার টেন্ডার করেও তার ফল আসেনি।

জ্বালানিমন্ত্রী বলেছেন, জ্বালানির কোনো সংকট নেই। কিন্তু পাম্পে লাইন ধরে জ্বালানি নিতে হচ্ছে। তাহলে মন্ত্রীর বক্তব্যের যৌক্তিকতা আছে কি?

জ্বালানিমন্ত্রী হয়তোবা বলতে চেয়েছেন, আমরা জ্বালানি সরবরাহের জন্য যা যা করা দরকার সেটা করছি। কিন্তু তার চেয়েও বড় ব্যাপার হলো, পেট্রলপাম্পে যানবাহনের দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে। সেটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

করোনাকালীন জ্বালানির উৎপাদন ও সরবরাহ বন্ধ থাকার পরেও দেশে কোনো জ্বালানির সংকট ছিল না। তাহলে এখন কেন এই সংকট?

কোভিডকালীন থেকে এখনকার সময়ের বড় পার্থক্য আছে। এর মধ্যে মোটরবাইকের মাধ্যমে যাঁরা রাইড শেয়ারিংয়ের কাজ করেন, তাঁদের ক্ষেত্রটা অনেক বেড়ে গেছে কয়েক বছরের মধ্যে। যেটা কোভিডের সময় দেখা যায়নি। তাঁরাই পেট্রলপাম্পে ভিড় জমাচ্ছেন। কারণ, সেটা তো তাঁদের জীবিকার সঙ্গে সম্পর্কিত। অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে মোটরবাইকের সংখ্যা সাংঘাতিকভাবে বেড়ে গেছে। দ্বিতীয়ত ব্যাপার হলো, আগে ব্যক্তিগত কারণগুলো সিএনজি করা ছিল। যেটা গ্যাসের মাধ্যমে চলত। তারপর দেখা গেল যে সিএনজিতে মহা সমস্যা। সেই সিএনজিচালিত গাড়িগুলো পরবর্তী সময়ে তেলের মাধ্যমে চালানোর জন্য রূপান্তরিত করা হয়েছে।

আর যাঁরা নতুন গাড়ি কিনছেন, তাঁরাও সিএনজিতে রূপান্তরিত করেননি। সে কারণে তেলের চাহিদা অনেক বেড়ে গেছে। এরপর ঢাকা শহরে পেট্রলপাম্পের সংখ্যা খুবই কম। সে কারণে পেট্রলপাম্পে বড় লাইন দেখা যাচ্ছে। আমার ভাবনা ছিল, ইরানে আগ্রাসনের কারণে হয়তোবা ডিজেলের সংকট তৈরি হবে। কারণ, ডিজেলটা সম্পূর্ণরূপে আমদানি করতে হয়। ঢাকায় ডিজেলের সমস্যা না থাকলেও সারা দেশে কৃষির সেচের জন্য ডিজেল দরকার। আর একটা জায়গায় ডিজেল ব্যবহার করা হয়—নৌকাচালিত ইঞ্জিন চালানোর জন্য।

দেশীয় কোম্পানিগুলোর ট্যাংকারে পেট্রল ও অকটেন উপচে পড়লেও তা গ্রহণ করছে না সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। এর কারণ কী?

দেশীয় কোম্পানিগুলোর ট্যাংকারে পেট্রল ও অকটেন উপচে পড়ছে, তা সত্যি ঘটনা। কিন্তু কী কারণে বিপিসি সেসব নিচ্ছে না, সেটা কিন্তু রহস্যজনক ব্যাপার। দেশীয় কোম্পানিগুলোর ট্যাংকারে পেট্রল ও অকটেন থেকে চাহিদা পূরণ করা যেতে পারে। এখন যে পেট্রলপাম্পে যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা যাচ্ছে, সেটার সমস্যার সমাধান করা কিন্তু সম্ভব। সে জন্য দেশীয় কোম্পানিগুলোর ট্যাংকার থেকে পেট্রল ও অকটেন নিয়ে পেট্রলপাম্পগুলোতে সরবরাহ করা দরকার। দেশীয় কোম্পানিগুলো যেভাবে পেট্রল ও অকটেন উৎপাদন করছে, সরকার এসব ক্রয় করলে তারাও উৎপাদন খরচ ওঠাতে পারবে। ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার চাপও কমবে। অন্যদিকে পেট্রলপাম্পগুলোও তাদের সংকটের চাহিদা পূরণ করতে পারবে, যদি সরকারি সংস্থা বিপিসি দেশীয় কোম্পানিগুলো থেকে পেট্রল ও অকটেন ক্রয় করে।

আবার ডিজেলের পুরোটাই আমাদের আমদানি করতে হয়। তবে এটা কিছুটা অপরিশোধিত তেলকে রিফাইন করে পাওয়া যায়। অকটেনও এভাবে পাওয়া যায়। বছরে ২ লাখ টনের মতো অকটেন আমাদের আমদানি করতে হয়।

জ্বালানি সংকটের মধ্যেই পেট্রল, ডিজেল ও অকটেনের দাম বাড়ানো হয়েছে। সেবা খাতে এভাবে দাম বাড়ার কারণ কী?

দাম বাড়ানো অবধারিত ছিল। আন্তর্জাতিক বাজারে কিছুদিন আগেও পেট্রল, ডিজেল ও অকটেনের দাম ৭২ ডলারের মতো ছিল, কিছু ক্ষেত্রে ৭৫ ডলার ছিল। সেটা এখন ১০০ ডলারের ওপরে পৌঁছে গেছে। ২০ থেকে ৩০ ডলারের মতো দাম বেড়ে গেছে। এখন দেশে যে কোম্পানিগুলো পেট্রল, ডিজেল ও অকটেন সরবরাহ করছে, তাদের তো বেশি দামে সেসব কিনতে হচ্ছে। আবার নতুনভাবে সরবরাহের অর্ডার দেওয়ার কারণে বেশি দাম দিতে হচ্ছে। যেহেতু তারা বেশি দামে ক্রয় করছে, সে কারণে সরকার আসলে দাম বাড়িয়েছে বলে আমার কাছে মনে হচ্ছে।

এখন দুই ধরনের সমস্যার মধ্যে আমরা পড়েছি। একটা হলো দামের ঊর্ধ্বগতি আরেকটা হলো সরবরাহের সমস্যা। আবার পরিবহন ব্যয় আগের চেয়ে বেশি হয়ে গেছে। এসব কারণে দাম বাড়ানোটা অযৌক্তিক হয়নি।

তবে সরকার এসবের দাম না বাড়িয়ে অন্যভাবে ম্যানেজ করতে পারত। অবশ্য সরকার জ্বালানি পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে দুই ধরনের ট্যাক্স কমিয়ে দিয়েছে। সরকার এটা করেছে বিতরণ কোম্পানিগুলোর যেন কোনো ধরনের লোকসান না হয়। তবে পরে আবার শোনা গেছে, সরকার কমিয়ে দিলেও বিতরণ কোম্পানিগুলো সেটা বাড়িয়ে দিয়েছে।

জ্বালানির দাম বাড়ার পর সাধারণ মানুষের সামগ্রিক ক্ষেত্রে যে নৈরাজ্যকর অবস্থার সৃষ্টি হয়, সরকার এসব জায়গায় কোনো নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না কেন?

আমাদের জ্বালানি পণ্য এতখানি আমদানিনির্ভর যে সেখানে এখন কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত বলে আমি মনে করি। জ্বালানি খাত আগেও যেভাবে ছিল এখনো যদি একইভাবে চালাতে চায়, তাহলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের একটা বোঝা আমাদের ঘাড়ে অবশ্যই পড়বে। যদি আমাদের জ্বালানির স্টক থাকত, যেটাকে স্ট্র্যাটেজিক রিজার্ভ বলা হয়—তেলের দাম যখন ব্যারেল ৭০ ডলার ছিল, সে সময় তেল ক্রয় করে স্টক করা সম্ভব হলে, এখন সংকটের সময়ে সেটা ব্যবহার করা যেত। এর ফলে আমাদের জনগণের ওপর বাড়তি অর্থের বোঝা চাপানোর প্রয়োজন পড়ত না।

আর একটা বড় ব্যাপার হলো, সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) প্রায় তিন বছরে ৩ হাজার কোটি টাকা করে লাভ করেছে। এই টাকা কোথায় গেছে? তারা তো জ্বালানি তেল থেকে সে টাকা লাভ করেছে। এই সময়ে সে টাকা তারা কেন বের করছে না? করছে না এই কারণে যে এই লাভের টাকা তারা অন্য খাতে খরচ করেছে। এটাকে আমি অন্যায় বলব। কারণ, রাষ্ট্রের এক খাতের টাকা অন্য খাতে খরচ করা ঠিক না।

আর জ্বালানি তো হলো সেবা খাত। এই খাতে তো সরকারকে ভর্তুকি দেওয়া উচিত। আর বিপিসির সেই লাভের টাকা সরকার এই সংকটের সময়ে কাজে লাগালে তো আর জ্বালানি পণ্যের দাম বাড়ানোর কোনো প্রয়োজনই পড়ত না।

কেন আমাদের জ্বালানি খাত আমদানিনির্ভর? কোনো সরকারই কেন নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে গুরুত্ব দেয় না?

এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। অনেকেই বলছেন আমাদের যথেষ্ট গ্যাস থাকার পরেও আমরা গ্যাস অনুসন্ধান না করার কারণে ফুরিয়ে যাচ্ছে। আমাদের নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধান না করে এলএনজির দিকে ধাবিত হয়েছি। এলএনজি আমদানিনির্ভরতার পরিণতি এখন আমরা দেখতে পাচ্ছি। এ কারণে এখন বিদ্যুৎ সংকটের কারণে লোডশেডিং বেড়ে গেছে এবং এটা সামনে আরও বাড়বে, শিল্প-কলকারখানায় উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে।

কোনো সরকারই গ্যাস অনুসন্ধানের দিকে মনোযোগ দেয়নি। গ্যাস অনুসন্ধান অব্যাহত রাখা গেলে আজকের পরিস্থিতি তৈরি হতো না। কথা হলো, সেটা আগে করা সম্ভব না হলেও এখন গ্যাস অনুসন্ধান ত্বরান্বিত করা দরকার। যদিও গ্যাস অনুসন্ধানের দুটি প্রোগ্রাম চলছে, কিন্তু সেটা যথেষ্ট নয়। এখন আমাদের বেশি গ্যাস পাওয়ার জন্য যা যা করণীয় তা করতে হবে। আরও বেশি গ্যাস যেন পাই, সেটার ব্যবস্থা করতে হবে।

আমরা সর্বোচ্চ ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস একসময় উৎপাদন করেছি। পরবর্তী সময়ে সেটা ১ হাজার ৭০০-তে নেমে এসেছিল। এখন আবার আগের চেয়ে এলএনজি আমদানি কম করছি। ফলে দেশে গ্যাসের ভয়াবহ সংকট দেখা দিয়েছে।

জ্বালানি খাতের সিস্টেম লস এবং দুর্নীতি কমাতে কী ধরনের কাঠামোগত সংস্কার করা জরুরি বলে আপনি মনে করেন?

দেশে সবচেয়ে ভয়ংকর অবস্থার মধ্যে পড়েছে গ্যাসের সংকট। গ্যাস ভান্ডারের তথ্যমতে, সাড়ে ৮ শতাংশ গ্যাস চুরি বা সিস্টেম লসে চলে যায়। আর চুরি সবচেয়ে বেশি হয় গৃহস্থালি বা আবাসন ক্ষেত্রে। এ জায়গায় হাজার হাজার অবৈধ সংযোগ দেওয়া হয়েছে। পেট্রোবাংলার হিসাব মতে, ১১ শতাংশ গ্যাস গৃহস্থালিতে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু সত্য ঘটনা হলো, সেটা ৬ শতাংশের বেশি না। তাহলে বাকি গ্যাস কোথায় যায়? অর্থাৎ ৫ শতাংশের মতো গ্যাস চুরি হয়ে যাচ্ছে। এর বাইরে আরেক ধরনের চুরি আছে, যেটাকে তারা স্বাভাবিক ঘটনা বলে থাকে। সেখানে প্রায় ৫ শতাংশের মতো চুরি হয়ে থাকে। এভাবে আমাদের ১০ শতাংশ গ্যাস চুরির কারণে চলে যাচ্ছে। এটাকে যদি আবার এলএনজির সঙ্গে তুলনা করা যায়, তাহলে সেটা কয়েক বিলিয়ন টাকার মতো হয়ে যায়।

এ ধরনের চুরি বা সিস্টেম লস প্রতিরোধ করা অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য সহজ ছিল। কিন্তু সেই সরকার সেটা করতে পারেনি। এখন জরুরি হলো, এ সেক্টরে যে ভূত ঢুকে আছে, তাদের আগে বের করতে হবে। যারা অবৈধ সংযোগের সঙ্গে যুক্ত তাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এরপর শাস্তি দিতে হবে। এসবের সঙ্গে তিতাস ও আগ্রাবাদের লোকজনও যুক্ত আছে। এগুলো কিন্তু অনেক দিন ধরে চলছে। আমরা এসব নিয়ে নানা সময়ে কথা বলেছি। কিন্তু কোনো সরকারই কোনো ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। তবে এই চুরির মাশুল আমাদের সবাইকে দিতে হচ্ছে।

সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

আপনাকে এবং আজকের পত্রিকাকেও ধন্যবাদ।

২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ: দরকার সক্ষমতা ও পরিকল্পনা

উদ্বেগজনক শিক্ষাব্যবস্থা

বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তি: কী অর্জনের জন্য এত বিসর্জন

ক্ষমতার রাজনীতি ও গুপ্ত রাজনীতির পাকে বাংলাদেশ

দাম বাড়ল জ্বালানির, চাপ বাড়ল জীবনে

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র কেন চুক্তিতে পৌঁছাতে পারছে না

পশ্চিমবঙ্গে বাদ ৯১ লাখ ভোটার: নির্বাচনের ফলে প্রভাব ও পরিচয় হারানোর শঙ্কা

‘দেশ মানে এক লোকের পাশে অন্য লোক’

যুদ্ধ কলঙ্কিত করে বিজ্ঞানীদের অর্জন

মাছের শরীরে বিষাক্ত ধাতু