হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

জনগণের প্রত্যাশা কি সরকার বোঝে

মনিরুজ্জামান অন্তর

প্রতীকী ছবি

বাংলাদেশ এখন এমন একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো রাষ্ট্র কি তার পুরোনো শাসন-ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো অতিক্রম করতে পারবে? ২০২৪ সালে ক্ষমতার পট পরিবর্তনের পর যে রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস শুরু হয়েছিল, তা ২০২৬ সালের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নতুন এক অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। কিন্তু একটি সরকার পরিবর্তন আর একটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক পুনর্গঠন এক বিষয় নয়। দেশের সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো ক্ষমতার পালাবদলকে একটি টেকসই প্রাতিষ্ঠানিক বন্দোবস্তে রূপ দেওয়া। দেশের নাগরিকেরা কেবল সরকারের পরিবর্তন চায়নি। জনগণ রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের সম্পর্কের পরিবর্তনও চেয়েছে। এই আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্রে ছিল জবাবদিহি, ন্যায়বিচার, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা। ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনকে তাই কেবল একটি নির্বাচনী ঘটনা হিসেবে দেখলে এর তাৎপর্য খাটো করা হবে। আন্তর্জাতিক সংকট-পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপও নতুন সরকারের সামনে রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগের কথা তুলে ধরেছে। কিন্তু এখানেই বাংলাদেশের দ্বিতীয় এবং আরও কঠিন পরীক্ষা শুরু।

একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন গণতন্ত্রের প্রয়োজনীয় শর্ত, কিন্তু এটিই কেবল যথেষ্ট নয়। নির্বাচন যদি স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, কার্যকর সংসদীয় জবাবদিহি, স্বাধীন গণমাধ্যম, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠা না পায় তাহলে ক্ষমতা বদলালেও রাষ্ট্রের চরিত্র বদলায় না। দেশের অতীতের অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে সতর্কবার্তা দেয়। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মেরুকরণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় প্রতিযোগিতার অংশে পরিণত করেছে। ফলে নতুন সরকারের জন্য বড় প্রলোভন হবে পুরোনো কাঠামোকে শুধু নতুন রাজনৈতিক আনুগত্য দিয়ে পূরণ করা। সেটি করলে সাময়িক রাজনৈতিক সুবিধা পাওয়া সম্ভব, কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে গণতান্ত্রিক রূপান্তর ব্যর্থ হবে। এ জন্য প্রয়োজন ‘বিজয়ী সবকিছুর অধিকারী’ রাজনীতির পরিবর্তে এমন একটি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি দাঁড় করানো, যেখানে সরকার বদলালেও প্রতিষ্ঠানগুলোর মৌলিক নিরপেক্ষতা অক্ষুণ্ন থাকে।

রাজনৈতিক বৈধতা শেষ পর্যন্ত জনগণের জীবনযাত্রার সঙ্গে সম্পর্কিত। সম্প্রতি দেশের অর্থনীতি প্রবৃদ্ধির গতি হারিয়েছে। মূল্যস্ফীতি উচ্চ রয়েছে এবং ব্যাংকিং খাত দুর্বলতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। আইএমএফের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের মূল্যায়নে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে যাওয়ার আশঙ্কার কথা জানিয়েছে এবং ব্যাংকিং খাত ও রাজস্ব ব্যবস্থায় গভীর সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছে। দেশ এখনো রাজস্ব, আর্থিক খাত এবং মূল্যস্ফীতির উল্লেখযোগ্য চাপের মধ্যে রয়েছে। রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে অর্থনৈতিক বাস্তবতা জড়িয়ে আছে। জনগণ কম দামে খাদ্য, কর্মসংস্থান, স্থিতিশীল মুদ্রা এবং নিরাপদ সঞ্চয় চায়। রাজনৈতিক বৈধতা যদি অর্থনৈতিক স্বস্তিতে রূপান্তরিত না হয় তাহলে নতুন সরকারের ওপরও দ্রুত হতাশা তৈরি হবে।

রাশিয়া, চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং জাপান প্রত্যেকেরই বাংলাদেশের সঙ্গে স্বার্থ রয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক অংশীদারদের একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি, বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা যদি কেবল ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের ভিত্তিতে মূল্যায়িত হয়, তাহলে দেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তর অসম্পূর্ণ থেকে যেতে পারে। আন্তর্জাতিক সমর্থনের সবচেয়ে কার্যকর রূপ হবে এমন সহায়তা, যা দেশের নিজস্ব প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করবে। দুর্নীতি দমন, ব্যাংক তদারকি, নির্বাচন ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু সহনশীলতায় বিনিয়োগ এবং স্বাধীন বিচারব্যবস্থা গঠন করা। বাংলাদেশের প্রয়োজন বিদেশি রাজনৈতিক অভিভাবক নয়, প্রয়োজন শক্তিশালী ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান।

জুলাই আন্দোলনের পরে স্বাভাবিকভাবেই ন্যায়বিচারের দাবি প্রবল হয়েছে। অতীতের মানবাধিকার লঙ্ঘন, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিচার হওয়া দরকার। কিন্তু বিচার যদি প্রতিশোধের ভাষায় পরিচালিত হয়, তবে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তও একই চক্রে আটকে যেতে পারে।

বর্তমান সরকার কি রাষ্ট্রকে নিজেদের রাজনৈতিক শক্তির সম্প্রসারণ হিসেবে দেখবে, নাকি এমন প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করবে যা একদিন তাদের নিজেদের বিরুদ্ধেও কাজ করতে পারে? বর্তমান মুহূর্তকে কেবল সংকট হিসেবে দেখা উচিত নয়। এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্গঠনের সুযোগ। রাজনৈতিক পরিবর্তন, অর্থনৈতিক সংস্কার এবং প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্গঠন যদি একই সময়ে এগিয়ে নেওয়া যায়, তবে দেশটি তার উন্নয়নযাত্রার একটি নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করতে পারে। এর জন্য অন্তত পাঁচটি অগ্রাধিকার জরুরি, স্বাধীন ও বিশ্বাসযোগ্য প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র, ব্যাংকিং ও রাজস্ব ব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার, রপ্তানি ও শিল্পের বৈচিত্র্য এবং তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান।

সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে জনগণের পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা। জুলাই আন্দোলন ক্ষমতা পরিবর্তন এবং পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাকে দৃশ্যমান করেছে। বর্তমানে সেই আকাঙ্ক্ষাকে রাষ্ট্রীয় সক্ষমতায় রূপান্তর করার দায়িত্ব বর্তমান সরকারের।

লেখক ও সাংবাদিক