হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

বিশ্ব শিক্ষক দিবস: শিক্ষকদের জীবনে বঞ্চনার ইতিবৃত্ত

সুলতান মাহমুদ সরকার

একটি প্রচলিত কথা আছে, মোমবাতি নিজে পুড়ে অন্যকে আলো দেয়। শিক্ষকদের ক্ষেত্রেও প্রবাদটি অনেকখানি সত্য। শিক্ষকেরা কোনো শিক্ষার্থীর মনে প্রশ্ন জাগিয়ে দেন, কারও ভেতরে এমন এক আত্মবিশ্বাস সৃষ্টি করে দেন, যা দিয়েই শিক্ষার্থীরা সামনে এগিয়ে যাওয়ার মন্ত্রণা পেয়ে যায়। শিক্ষক হলেন সেই মানুষ, যিনি একটি শিশুর ভেতরের সম্ভাবনাটাকে আগে দেখতে পান, যখন তার পরিবারও সেটা দেখতে পায় না। পাঠ্যবই পড়ানো পুরো কাজের একটা অংশমাত্র। আসল কাজ হলো শেখার আগ্রহটা জাগিয়ে দেওয়া। যে ছেলেটি অধিকাংশ বিষয়ে পিছিয়ে, শিক্ষক তার মধ্যে হয়তো একটা ভালো গল্প বলার ক্ষমতা খুঁজে পান। যে মেয়েটি ভয়ে মুখ খোলে না, তাকে দিয়েই একদিন বলান জোরে নিজের নামটা। এই ছোট ছোট মুহূর্তই একজন মানুষের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

একজন ভালো শিক্ষক একসঙ্গে পথপ্রদর্শক, উপদেষ্টা, কখনো অভিভাবকের মতো ভরসা, আবার কখনো বন্ধুর মতো শ্রোতা। গ্রামের একটি স্কুলে হয়তো কোনো ছাত্র কয়েক দিন ধরে আসছে না। যে শিক্ষক খোঁজ নিতে তার বাড়ি পর্যন্ত যান, তিনি তাকে ঝরে পড়ার হাত থেকে বাঁচান। এ কাজের কোনো বিজ্ঞপ্তি হয় না, কোনো পুরস্কারও জোটে না। তবু সমাজের ভিত এভাবেই শক্ত হয়।

ব্যক্তি গড়ে ওঠা দিয়েই সবকিছুর শুরু হয়। একজন মানুষ কেমন হবে, তা অনেকটাই নির্ভর করে শৈশবে সে কাদের সংস্পর্শে এসেছে তার ওপর। মা-বাবার পরেই শিক্ষকের স্থান। শিশু যা শোনে তার চেয়ে অনেক বেশি দেখে শিখে থাকে। শিক্ষক যদি সময়মতো ক্লাসে আসেন, কথা দিলে কথা রাখেন, ভুল করলে স্বীকার করেন, তাহলে শিশুটি না বলা অবস্থাতেই সময়ানুবর্তিতা, সততা আর বিনয়ের পাঠের শিক্ষা নিয়ে থাকে। আবার এর উল্টোটাও সত্য।

একটি সমাজ কতটা সহনশীল, কতটা ন্যায়বোধসম্পন্ন, কতটা পরস্পরের প্রতি যত্নবান, তা নির্ধারিত হয় তার মানুষগুলোর গড়ন দিয়ে। আর সেই গড়নের কারিগর হলেন শিক্ষক।

যে শিক্ষক ভিন্নমত শোনার অভ্যাস করান, সেই শিক্ষা থেকে পরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থীরা মতের অমিল নিয়ে মারামারি করে না। সেই শিক্ষা থেকেই ধর্ম, বর্ণ বা অর্থনৈতিক অবস্থার কারণে কাউকে ছোট করা হয় না, সেই শিক্ষা থাকার কারণে তারা আর বৈষম্যকে সহজে মেনে নিতে পারে না। সমাজের বড় বড় পরিবর্তন সংসদে বা সচিবালয়ে শুরু হয় না, শুরু হয় কোনো ক্লাসঘরের কোণে, একজন শিক্ষকের একটি সাধারণ বাক্যের মধ্য দিয়েই।

এখানেই মানবিক মূল্যবোধের প্রশ্নটা সামনে আসে। আমরা এমন একসময়ে আছি, যখন তথ্যের অভাব নেই। মোবাইলের পর্দায় এক মিনিটে যা পাওয়া যায়, আগের যুগে তার জন্য হয়তো মাসের পর মাস সময় অপেক্ষা করতে হতো। কিন্তু তথ্য আর জ্ঞান এক জিনিস নয়, আর জ্ঞান আর বিবেকও এক জিনিস নয়। একজন মানুষ অনেক কিছু জেনেও নিষ্ঠুর হতে পারে, দুর্নীতিবাজ হতে পারে, স্বার্থপর হতে পারে। আমাদের চারপাশে উচ্চশিক্ষিত অথচ মূল্যবোধহীন মানুষের অভাব নেই। এর কারণ সম্ভবত এই যে আমরা শিক্ষাকে ক্রমেই ডিগ্রি আর চাকরি পাওয়ার জায়গায় নামিয়ে এনেছি।

মূল্যবোধ আসলে বক্তব্য দিয়ে শেখানো যায় না। দয়া, সততা, দায়িত্ববোধ, শ্রমের প্রতি মর্যাদা, বড়দের প্রতি সম্মান আর ছোটদের প্রতি স্নেহ শিশু শেখে পরিবেশ আর বাস্তব অবস্থা থেকে। যে শিক্ষক পরীক্ষার হলে নকলের সুযোগ দেন না, সেই শিক্ষক বই না খুলেই শিক্ষার্থীকে সততা শিখিয়ে দেন। যিনি দারোয়ান আর অধ্যক্ষকে একই ভদ্রতায় সম্বোধন করেন, তিনি মানুষের মর্যাদা নিয়ে এমন একটা পাঠ দেন, যা কোনো সিলেবাসে লেখা থাকে না। এ কারণেই আমরা পরবর্তী জীবনে পাঠ্যবইয়ের অধ্যায়ের চেয়ে বেশি মনে রাখি কোনো এক স্যার বা ম্যাডামের একটা কথা বা একটা আচরণের ঘটনা।

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের কথা ভাবলে প্রথমেই মনে আসে অর্থনীতি, প্রতিরক্ষা, অবকাঠামো। কিন্তু এগুলোর কোনোটাই শূন্য থেকে তৈরি হয় না। সড়ক বানাতে প্রকৌশলী লাগে, হাসপাতাল চালাতে চিকিৎসক ও নার্স লাগে; আইন প্রয়োগ করতে দক্ষ ও সৎ কর্মকর্তা লাগে। এদের সবাইকে কেউ না কেউ পড়িয়েছেন, আর তিনিই হলেন আমাদের শিক্ষাগুরু।

আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ দেশের জনগণ। বিশেষ করে তরুণ জনগোষ্ঠী। জনসংখ্যাকে বোঝা না বানিয়ে সম্পদে পরিণত করার একমাত্র পথ হলো মানসম্মত শিক্ষা। আর মানসম্মত শিক্ষার প্রথম শর্ত মানসম্মত শিক্ষক।

কিন্তু শিক্ষকেরা চাকরির খাতায় একজন কর্মচারী মাত্র। সরকারি-বেসরকারি স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা থেকে এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পর্যন্ত অনেক শিক্ষকের আর্থিক অবস্থা শোচনীয়, যা বলার অপেক্ষা রাখে না। বেতন-ভাতার দাবিতে শিক্ষকদের রাস্তায় নামতে হয়। এই অনিশ্চয়তা থেকেই জন্ম নেয় প্রাইভেট টিউশন আর কোচিংয়ের সংস্কৃতি, যেখানে শিক্ষক ধীরে ধীরে শিক্ষাদাতা থেকে পরিষেবাদাতা হয়ে যান। এর দায় কেবল শিক্ষকের নয়। যে ব্যবস্থা তাঁকে সম্মানজনক জীবনযাপনের সুযোগ দেয় না, তার দায় অনেক বেশি।

এর সঙ্গে যোগ হয়েছে আরও কিছু সমস্যা। শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতার অভাব, দলীয় প্রভাব, বদলিতে তদবির, প্রশিক্ষণের নামে আনুষ্ঠানিকতা। আবার প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো কলঙ্কে কিছু শিক্ষকের নাম জড়ালে পুরো পেশাটাই প্রশ্নের মুখে পড়ে। পেশার ভেতরের জবাবদিহি আর নৈতিকতার চর্চা শিক্ষকদেরও নিজেদেরই জোরদার করতে হবে। সম্মান দাবি করা যতটা সহজ, সম্মান অর্জন করা ততটা সহজ নয়।

এখানেই রাষ্ট্রের দায়িত্বের প্রশ্নটা আসে। আমরা শিক্ষার আধুনিকায়নের কথা বলি, ডিজিটাল ক্লাসরুমের কথা বলি, কারিকুলাম বদলানোর কথা বলি। কিন্তু প্রতিবার নতুন কারিকুলাম এলে সবচেয়ে বিপাকে পড়েন শিক্ষকেরাই। যাঁকে নতুন পদ্ধতিতে পড়াতে হবে, তাঁকে যদি যথেষ্ট প্রশিক্ষণ, উপকরণ আর সময় না দেওয়া হয়, তাহলে সেই পরিবর্তন শেষ পর্যন্ত কাগজেই থেকে যায়। শিক্ষা আধুনিক হবে, অথচ শিক্ষক পড়ে থাকবেন পুরোনো অবস্থায়, এ হতে পারে না। বই বদলানোর চেয়ে শিক্ষক তৈরির কাজ অনেক কঠিন এবং অনেক বেশি জরুরি। তাই শিক্ষার আধুনিকায়নের পাশাপাশি শিক্ষককেও সেভাবে গড়ে তোলা রাষ্ট্রের অবশ্যকর্তব্য, কোনো করুণা বা অনুগ্রহ নয়।

এই গড়ে তোলার মানে কী? প্রথমত, শিক্ষক হওয়ার পথটাকে মেধাবীদের কাছে আকর্ষণীয় করে তোলা। এখন অনেক মেধাবী তরুণ শিক্ষকতাকে শেষ বিকল্প হিসেবে দেখেন, কারণ এ পেশায় মর্যাদা আর আয় দুটোই অনিশ্চিত। যেদিন সেরা শিক্ষার্থীরা স্বেচ্ছায় শিক্ষক হতে চাইবেন, সে দিন বুঝব আমরা ঠিক পথে আছি।

লেখক: সুলতান মাহমুদ সরকার, শিক্ষক গাজীপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ