হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

পুতিনেই তাহলে আস্থা রুশদের

আব্দুর রাজ্জাক 

কিছুদিন আগে রাশিয়ার নির্বাচন হলো। রাশিয়ার নিম্নকক্ষের ডুমার নির্বাচন। আমাদের দেশের সংসদ নির্বাচনের মতোই। রাশিয়ার ডুমার আসন ৪৫০। এই ৪৫০ আসনের মধ্যে পুতিনের দল ইউনাইটেড রাশিয়া পেয়েছে ৩৪৯টি। রাশিয়ার কমিউনিস্ট পার্টি ৩৭টি, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি ২৩টি, নিউ পিপল ১৯টি এবং জাস্ট রাশিয়া ১৭টি আসন পেয়েছে। এই নির্বাচনে ভোট পড়েছে প্রায় ৫৯ শতাংশ। কাস্টিং ভোটের প্রায় ৫৮ শতাংশই পেয়েছে ইউনাইটেড রাশিয়া, যা গত নির্বাচনের চেয়ে ৮ শতাংশ বেশি। ২০২১ সালের ডুমার নির্বাচনে তারা পেয়েছিল ৫০ শতাংশের কাছাকাছি ভোট। সারা বিশ্ব জানত, পুতিনের দল জয়লাভ করবে। কিন্তু এত বেশি ব্যবধানে জিতবে, এটা কেউ ভাবেনি।

যখন কোনো দেশ অন্য দেশের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত থাকে, সেই দেশের সেই সময়কার সরকার অজনপ্রিয় হয়। কেননা তখন অনেক জীবন এবং সম্পদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। সেখানে সাধারণ মানুষ প্রতিদিন দেখে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে মৃতদেহের ব্যাগ আসতে। কারও না কারও স্বজন হারায় প্রতিদিন। পশ্চিমা দেশে মৃতদেহের ব্যাগকে খুবই নেতিবাচকভাবে দেখা হয়। কিন্তু রাশিয়ার ক্ষেত্রে এর ফলাফল হলো উল্টো!

রুশরা সচেতন, শিক্ষিত, বিজ্ঞানমনস্ক। তারা কখনো হার মানতে জানে না। রাশিয়ার আপামর সাধারণ মানুষ মনে করেছে, রুশ সরকার অর্থাৎ প্রেসিডেন্ট পুতিন যা করছে তা রুশদের ভালোর জন্য করছে। আমরা দূর থেকে এই যুদ্ধের বিরুদ্ধে বিভিন্ন কথা বলছি। কিন্তু রাশিয়ার জনগণ দেখছে অন্যভাবে। বিশাল রাশিয়া পৃথিবীর এখনো সর্ববৃহৎ দেশ। এই দেশের প্রাকৃতিক এবং খনিজসম্পদের ওপর বিদেশিদের চোখ পড়েছে, দেশটিকে ধীরে ধীরে ঘিরে ফেলছে ন্যাটো—এটা বুঝে গিয়েই রুশরা হয়তো ভাবছে দেশকে বাঁচাতে হলে এই ফাঁদ থেকে বের হয়ে আসতে হবে। তারা ভাবছে, পুতিন যা করছে, রাশিয়ার সার্বভৌমত্ব ও ঐতিহ্য রক্ষার জন্যই করছে। তাই তো রাশিয়ার নির্বাচনে পুতিনের দলের এই উল্লেখযোগ্য বিজয়।

নির্বাচনের পরপরই, অর্থাৎ গত সপ্তাহে রাশিয়ার আশপাশের কয়েকটি ন্যাটোভুক্ত দেশ এই বলে সতর্কতা জারি করেছিল যে রাশিয়া যেকোনো সময়ে বড় ধরনের কোনো হামলা করতে পারে। বিশেষ করে সতর্ক হয়েছিল পোল্যান্ড, রোমানিয়া, লিথুয়ানিয়া, এস্তোনিয়া, লাটভিয়া। এমনকি চার দিনের সব ধরনের খাদ্য, ওষুধ, জ্বালানির মজুত করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল সেসব দেশে। পোল্যান্ড এবং রোমানিয়া সশস্ত্রভাবে প্রস্তুতি নিয়েছিল রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ করার। রোমানিয়া দুটি এফ সিক্সটিন যুদ্ধবিমান উড্ডয়ন করেছিল অবশ্য তাদের ভূমিতে। শেষ পর্যন্ত এই সতর্কতা প্রত্যাহার করা হয়। রাশিয়া কোনো আক্রমণ করেনি। দেশটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তাদের এ রকম আক্রমণ করার কোনো ইচ্ছে নেই।

শোনা যায়, আমেরিকা হুমকি দিয়ে রেখেছে বিভিন্ন দেশে—রাশিয়া থেকে কেউ তেল কিনলে তারা স্যাংশন দেবে অথবা উচ্চ ট্যারিফ আরোপ করবে। যেসব দেশ আমেরিকার ওপর নির্ভরশীল, তারা আমেরিকার কথা শুনেছে। অনেক দেশ আবার আমেরিকার কথায় পাত্তা দিচ্ছে না, তারা যথারীতি সস্তায় রুশ তেল কিনছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালির ব্যবহার সীমিত, বাব আল-মান্দেব প্রণালি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় সারা বিশ্বে তেলের বাজার অস্থিতিশীল। প্রতি ব্যারেল তেলের দাম এখন ১০০ ডলারের বেশি। এ অবস্থায় যদি রুশ তেল কেনা না হয়, তাহলে সারা বিশ্বই জালানি-সংকটে পড়বে গভীরভাবে।

রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ বাজার ঠিক আছে, সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ হয়নি যুদ্ধের কারণে। ইউক্রেন সীমান্তসংলগ্ন দু-একটি শহর ছাড়া অন্যান্য শহরের জীবনযাত্রা স্বাভাবিক। ইউক্রেনের পার্শ্ববর্তী শহর বেলগ্রেড বারবার আক্রান্ত হচ্ছে, কয়েকটি জ্বালানি স্থাপনায় ইউক্রেন হামলা চালিয়েছে, বেশ কিছু ক্ষতি হয়েছে রাশিয়ার বিভিন্ন স্থাপনার। এইসব হামলায় ক্ষতি হলেও রাশিয়া তা পুষিয়ে নিচ্ছে খুবই দ্রুত। ইউক্রেন মস্কোতেও বেশকিছু ড্রোন হামলা চালিয়েছিল। রাশিয়া এগুলো প্রতিহত করেছে। ফলে এইসব হামলা রাশিয়ার সাধারণ জনগণ তেমন একটা টের পাচ্ছে না। সাধারণ মানুষের মাথায় যুদ্ধের তেমন আতঙ্ক এই কারণে নেই। এখানেই রাশিয়ার সাফল্য।

সর্বশেষ যে অবস্থা, ইউক্রেনসহ রাশিয়ার পাশের ন্যাটো দেশগুলো আতঙ্কে ভুগছে। সবাই ভয় পাচ্ছে রাশিয়ার নিউক্লিয়ার অস্ত্রকে। এদিকে রাশিয়া নিউক্লিয়ার অস্ত্র সুরক্ষিতভাবে বেলারুশে স্থাপন করেছে। সারা বিশ্ব জানে বেলারুশের প্রেসিডেন্ট লুকাশেঙ্কো পুতিনের অনুগত বিশ্বস্ত বন্ধু। রাশিয়ার পার্শ্ববর্তী ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর এটাও একটা মাথাব্যথার বড় কারণ। বিশ্ব এখন বুঝে গেছে, কোনো স্যাংশনে বা কোনো কিছুর বিনিময়ে রাশিয়াকে প্রতিরোধ করা যাবে না।

রাশিয়ার তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার ফলে সারা বিশ্বেই এখন তেলের বাজার অস্থিতিশীল, আগেই বলেছি। সবাইকে একটা ব্যাপার এখন চিন্তায় ফেলেছে যে রাশিয়া সবদিক থেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ। জনসংখ্যা মাত্র সাড়ে ১৪ কোটি। সবকিছুতে উৎপাদনক্ষমতা নিজেদের চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি। এটাই রাশিয়ার সাফল্য। এটাই রাশিয়ার শক্তি। সবচেয়ে বড় শক্তি রাশিয়ার জনগণের দেশপ্রেম। সবকিছুতে তারা এটা প্রমাণ রেখেছে এবং রাখবে—এটাই পুতিনের ভরসা।

রুশ জনগণ মনে করে, তথাকথিত গণতন্ত্র পশ্চিমাদের চাপানো গণতন্ত্র। সাধারণত পশ্চিমা দেশে যে ধরনের গণতন্ত্র আছে, দেখে মনে হতে পারে অধিকসংখ্যক মানুষের মতামতই গণতন্ত্র। এই গণতন্ত্র হলো গড়পড়তা মানুষের একটা মতামত। রাশিয়ার সচেতন ও শিক্ষিত জনগণ বুঝেশুনে যে মতামত দেয়, সেটাই সে দেশের আসল গণতন্ত্র। গড়পড়তা পশ্চিমাদের গণতন্ত্র রুশরা খুব একটা বিশ্বাস করে না। খালি চোখে রাশিয়ার নির্বাচনে সেটাই বারবার প্রতিফলিত হয়েছে।

আব্দুর রাজ্জাক, প্রকৌশলী