ড. কাজী মতিন উদ্দিন আহমেদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেস অনুষদের ডিনের দায়িত্ব পালন করেছেন। ৪০ বছরের বেশি সময়ের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ভূগর্ভস্থ পানি বিশেষজ্ঞ হিসেবে তাঁর পরিচিতি রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বেশি সাইটেড শিক্ষক হিসেবেও তিনি খ্যাত। বর্তমানে তিনি এলপিআরে আছেন। দেশের বিভিন্ন পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের গবেষণাপত্র আন্তর্জাতিক জার্নাল থেকে প্রত্যাহারের ঘটনার কারণ এবং তা থেকে প্রতিকার পেতে করণীয় নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন আজকের পত্রিকার মাসুদ রানা।
প্রথমেই বলতে চাই, গবেষণাপত্র প্রত্যাহারের ঘটনা নতুন কিছু নয়; এটি সব সময়ই কমবেশি ঘটে আসছে। এখন প্রশ্ন হলো, কেন গবেষণাপত্র প্রত্যাহার হয়, এখানেই আমাদের মূল নজর দেওয়া দরকার। মূলত দুটি কারণে এটি হতে পারে। প্রথমত, অনেক সময় আমরা যাকে ইনস্ট্রুমেন্টাল এরর বা অ্যানালিটিক্যাল এরর বলি অর্থাৎ যন্ত্রপাতি বা বিশ্লেষণে ভুল হয়ে যাওয়া—এমন ক্ষেত্রে ভুল হলে তা সংশোধন করা যায় এবং এতে দোষের কিছু নেই। দ্বিতীয়ত, যখন আমরা অনৈতিকভাবে কাজ করি। যেমন প্রকৃতপক্ষে পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করেই ডেটা বানিয়ে ফেলা বা ডেটায় যা নেই তা ফলসিফিকেশন করা, তখন সেটি অপরাধ। এ ছাড়া এখন কিছু চক্র সক্রিয় আছে, যাদের বলা হয় ‘পেপার মিল’ চক্র। এই চক্রগুলোর মাধ্যমে টাকার বিনিময়ে বা অনৈতিক উপায়ে পেপার সাজানো হয়। ফলে প্রকৃত গবেষণা হয় না, কিন্তু গবেষণা হয়ে যায়। এই ধরনের সব কর্মকাণ্ডই অনৈতিক।
যখন কোনো গবেষণাপত্র প্রত্যাহার করা হয়, তখন তার সঙ্গে একটি নির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ করা থাকে। এই কারণের ওপর নির্ভর করে বিষয়টি কতটা গুরুতর, তা বোঝা যায়। যদি অনিচ্ছাকৃত ভুলের কারণে প্রত্যাহার হয়, সেটি ততটা বিপজ্জনক নয়। কিন্তু যদি তা ইচ্ছাকৃত হয় এবং নৈতিকতাবিরোধী হয়, তাহলে সেটি সরাসরি অপরাধ।
আমার কাছে মনে হয়, আমাদের দেশে যেসব গবেষণাপত্র প্রত্যাহার হয়েছে, তার অনেকগুলোর কারণ হিসেবে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের কথাই বলা হয়েছে। যেমন পেপার মিলের ব্যবহার, প্লেজারিজম এবং ডেটা ফলসিফিকেশন। এগুলো মোটেও ভালো নয়, বরং স্পষ্টতই অনৈতিক। এ বিষয়গুলো আরও ভালোভাবে খতিয়ে দেখা দরকার। যেহেতু আমাদের এখানে এখনো এ বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট নীতিমালা নেই। তাই ভবিষ্যতে এই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে হলে আমাদের এখনই এ নিয়ে চিন্তা করা দরকার। যত বেশি এ ধরনের ঘটনা ঘটবে, দেশের গবেষণার মর্যাদা তত কমবে। এটি যেন ভবিষ্যতে না বাড়ে, সে জন্য এখনই ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
আমি মনে করি, এটি মূলত ব্যক্তি পর্যায়ের সমস্যা, সামগ্রিক ব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত নয়। যাদের মধ্যে উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং অনৈতিক কাজ করার মনোভাব থাকে, এই ধরনের ঘটনা মূলত তারাই করে থাকে। তবে এর সঙ্গে একটি সামগ্রিক ইস্যুও জড়িত। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় বা গবেষণায় নৈতিকতার দিকগুলোকে আমরা যথেষ্ট গুরুত্ব দিই না, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নৈতিকতার বিষয়গুলোও ভালোভাবে শেখানো হয় না। এখানে একটা ঘাটতি আছে। কিন্তু সামগ্রিকভাবে আমি বলব না এটি আমাদের গোটা শিক্ষাব্যবস্থার একটি খারাপ চিত্র তুলে ধরছে।
এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় সংখ্যাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। এখান থেকেই আমাদের বেরিয়ে আসা দরকার। সংখ্যাগত নয়, গুণগত মানের ওপর জোর দিতে হবে। সংখ্যা বাড়াতে গিয়ে অনেক সময় দেখা যায়, এত দ্রুতগতিতে গবেষণা করা হচ্ছে যে সেটা আর ভালো মানের হয় না। তাই সংখ্যার ওপর জোর না দিয়ে ভালো মানের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। পুরস্কার দেওয়ার ক্ষেত্রেও সংখ্যাগত মানের চেয়ে গুণগত মানকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালায় এ ধরনের অপকর্ম করার পর শাস্তির বিধান নেই। ফলে গবেষণায় জালিয়াতির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পরও লঘুদণ্ড দেওয়া হচ্ছে একজন শিক্ষককে। উপাচার্য নিজেই বলেছেন, তাঁদের নীতিমালায় এই ধরনের অপকর্মের জন্য কোনো শাস্তির ব্যবস্থা নেই। তাহলে এ ধরনের অপরাধ কীভাবে নির্মূল করা যাবে?
‘নৈতিক স্খলন’কে যদি আমরা বিস্তৃত অর্থে ধরি, তাহলে গবেষণা জালিয়াতি করা বা অনৈতিক কাজ করাও একধরনের নৈতিক স্খলন। সেখানে কোন গবেষণাপত্র কেন প্রত্যাহার হয়েছে, তার পেছনের কারণ যদি অনিচ্ছাকৃত কিছু হয়ে থাকে, তাহলে সেটিকে নৈতিক স্খলন বলা যায় না। কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে ডেটা ম্যানিপুলেশন করা, ডেটা ফলসিফিকেশন করা, টাকার বিনিময়ে রিভিউ করানো—এই সব কাজ করলে সেটি অবশ্যই নৈতিক স্খলন হিসেবে বিবেচিত হবে। বর্তমান আইনেও নৈতিক স্খলনের বিধান রয়েছে। সেই আলোকে এটিকে বিচার করা যায়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আমাদের দেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন পর্যন্ত রিট্রাকশন-সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা নেই। অর্থাৎ এটি করলে কী হবে, কী ধরনের শাস্তি হবে—তা কোনো বিশ্ববিদ্যালয়েই নীতিমালা নেই। এটি করতে হলে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকে এগিয়ে আসতে হবে। ভারতে এ ধরনের নীতিমালা তৈরি করা হয়েছে। আমরাও তেমন একটি নীতিমালা করতে পারি। চীনে ‘মিনিস্ট্রি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি’তে এই বিষয়গুলো মনিটরিং করে এবং সেখানে বিভিন্ন ধরনের শাস্তির ব্যবস্থাও রয়েছে। আমাদের দেশে এখন পর্যন্ত এমন কিছু করা হয়নি।
আমি আগেও গুণগত মানের কথা বলেছি। এখন সংখ্যার ক্ষেত্রে একটা ন্যূনতম প্রয়োজনীয়তা থাকে। যেমন কেউ চার-পাঁচ বছর একটি পদে চাকরি করলেন, এই সময়ের মধ্যে একটি গবেষণা করলে সেটি যত উচ্চ মানেরই হোক না কেন, অনেক সময় সেটাকেই যথেষ্ট ধরা হয়। কিন্তু এখানে যদি কিছু গুণগত মানদণ্ড যুক্ত করা যায়। যেমন গবেষণাপত্রটি কত উচ্চ মানের জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে, এর সাইটেশন সংখ্যা কত—এই বিষয়গুলো যোগ করলে সংখ্যার পাশাপাশি গুণগত মানের ওপরও বেশি জোর দেওয়া সম্ভব হবে। সংখ্যার ক্ষেত্রে হয়তো কিছুটা ছাড় দেওয়া যেতে পারে, কিন্তু গুণগত মানের ক্ষেত্রে কোনো রকম ছাড় দেওয়ার অবকাশ নেই।
আমাদের দেশের ক্ষেত্রে পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় সব জায়গাতেই এ সমস্যা আছে। এখন আমাদের মূল যে রাষ্ট্রীয় সংস্থা—যারা প্রাইভেট ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার গুণগত মান দেখাশোনা করে—ইউজিসি, প্রথমে তাদের একটি জাতীয় নীতিমালা তৈরি করতে হবে। আন্তর্জাতিক নীতিমালা ইতিমধ্যে রয়েছে। যেমন ‘কমিটি অন পাবলিকেশন এথিক্স’-এর নীতিমালা আছে। ভারতের উদাহরণ আমি আগেই বলেছি। ভারতের ইউজিসি ইতিমধ্যে এ ধরনের কাজ করেছে এবং কী ধরনের অপরাধের জন্য কী ধরনের শাস্তি হবে, তা তাদের নীতিমালায় নির্ধারিত আছে। চীনের ক্ষেত্রেও একই কথা বলেছি। সেখানেও এ ধরনের নীতিমালা আছে। এসব পর্যালোচনা করে আমাদের দেশের উপযোগী একটি নীতিমালা তৈরি করা দরকার।
এই নীতিমালা তৈরির জন্য একটা নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিয়ে ইউজিসি এই কাজ শুরু করতে পারে। এতে খুব বেশি সময় লাগার কথা নয়, দুই-তিন মাসের মধ্যেই ইউজিসি একটি নীতিমালা তৈরি করতে পারে। এ জন্য তারা একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করতে পারে। কমিটিকে দায়িত্ব দিলে তারা একটি নীতিমালার খসড়া তৈরি করবে, স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনা করে সেটি চূড়ান্ত করবে। তবে এই নীতিমালা বাস্তবায়নের মূল দায়িত্ব থাকবে বিশ্ববিদ্যালয় বা গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজেদের ওপর। নীতিমালা তৈরি হওয়ার পর তা সব বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছে দিতে হবে। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব একটি নজরদারি ব্যবস্থা থাকতে হবে। যেহেতু ইউজিসির পক্ষে একা সব বিশ্ববিদ্যালয় নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব নয়, তাই একটি রিপোর্টিং সিস্টেম থাকা দরকার। যার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিয়মিতভাবে ইউজিসিকে জানাবে যে, কোনো বছরে তাদের প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটেছে কি না এবং ঘটে থাকলে তারা কী প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে। তবে মূল দায়িত্ব থাকবে পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের। এই নীতিমালার আলোকে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব একটি কাঠামো থাকতে হবে। এ ক্ষেত্রে একটা সুবিধা হলো, প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন একটি আইকিউএসি সেল রয়েছে, যা প্রাতিষ্ঠানিক মান নিয়ন্ত্রণের কাজ করে। এই সেলের মাধ্যমেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এই দায়িত্ব পালন করতে পারে।
এখন গবেষণাপত্র প্রত্যাহারের বৈশ্বিক প্রবণতার দিকে তাকালে দেখা যায়, আমরা যত ডিজিটালাইজেশনের দিকে এগোচ্ছি, এই সংখ্যাও ধীরে ধীরে বাড়ছে। আগে এই ধরনের ঘটনার সংখ্যা অনেক কম ছিল এবং আন্তর্জাতিকভাবেও এসব নিয়ে তেমন কোনো নীতিমালা ছিল না। ৪০-৫০ বছর আগে ফিরে গেলে দেখা যাবে, আন্তর্জাতিক পর্যায়েও এ বিষয়ে তেমন কিছু ছিল না। এখন যেহেতু নতুন নতুন ধরনের অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে, তাই নতুন নতুন আইনও প্রণয়ন করতে হচ্ছে। ডিজিটাল প্রযুক্তি এবং এরপর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) আসার ফলে এই ধরনের অনৈতিক কর্মকাণ্ড করার সুযোগ বেড়েছে। এবং যাঁরা অনৈতিকভাবে এই সুযোগ নিচ্ছেন, তাঁদের ঠেকাতে নতুন পরিপ্রেক্ষিতে নতুন আইন প্রণয়ন করতে হচ্ছে। আগে এ ধরনের ঘটনা কম ঘটত এবং তা শনাক্ত করাও কঠিন ছিল। এখন এই ধরনের ঘটনা যেমন বেশি ঘটছে, তেমনি তা শনাক্ত করাও তুলনামূলক সহজ হয়ে উঠেছে। আর এই কারণেই এখন এই নীতিমালাগুলো প্রণয়ন করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।
আজকের পত্রিকা ও আপনাকেও ধন্যবাদ।