বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এক গভীর সংকটকাল অতিক্রম করছে। এটি কোনো একক খাত বা সাময়িক ধাক্কার ফল নয়; বরং উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগে স্থবিরতা, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা ও জ্বালানি সংকট—সব মিলিয়ে অর্থনীতি যেন একযোগে বহু দিক থেকে চাপে পড়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ কার্যত টিকে থাকার লড়াইয়ের মধ্যে আছে। গত এক বছরে ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনার ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৩৫ শতাংশ। অথচ একই সময়ে সাধারণ মানুষের আয় ও ক্রয়ক্ষমতা সে হারে বাড়েনি। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাজারে। ফলে পণ্যের বিক্রি কমেছে ২০-৩০ শতাংশ পর্যন্ত। চাহিদা সংকুচিত হওয়ায় শিল্প উৎপাদন কমছে, মজুত বাড়ছে আর কারখানাগুলো পূর্ণ সক্ষমতা নিয়ে চলতে পারছে না।
অর্থনীতির সবচেয়ে বড় সংকট সৃষ্টি হয়েছে বিনিয়োগ খাতে। পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি) থেকে প্রকাশিত বাংলাদেশ স্টেট অব দ্য ইকোনমি ২০২৫ প্রতিবেদন মতে, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ব্যাংকঋণের সুদহার এখন ১৪-১৬ শতাংশের ঘরে, যা উদ্যোক্তাদের জন্য কার্যত ‘গলার কাঁটা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০২৫ সালের অক্টোবর শেষে বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৬.২৩ শতাংশে, যা ২০০৩ সালের পর সর্বনিম্ন। বিনিয়োগের অন্যতম সূচক মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির এলসি খোলার হার কমেছে ২০ শতাংশের বেশি। এসব তথ্য ইঙ্গিত দেয়, শিল্প খাতে দীর্ঘমেয়াদি স্থবিরতা সৃষ্টি হচ্ছে। ডলারের দাম এখনো স্বাভাবিক অবস্থায় বা অতীতের দরে ফেরত আসেনি। এ ছাড়াও বাজারে ডলারের অপ্রতুলতা কমে আসেনি। তাই ডলার-সংকট এখনো সম্পূর্ণভাবে সমাধান করা যায়নি।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে জিডিপি প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ২ শতাংশে। কৃষি, শিল্প ও সেবা—তিন খাতেই প্রবৃদ্ধি দুর্বল। বিশেষ করে শিল্প ও সেবা খাতে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও বাজার স্থবিরতার প্রভাব স্পষ্ট। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ‘আমাদের অর্থনীতিতে ইতিবাচক ঝুড়ির চেয়ে নেতিবাচক ঝুড়ি বেশি ভারী। অর্থাৎ অর্থনীতির সংগ্রামের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জীবিকার সংগ্রামও তীব্রতর হচ্ছে।
ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণ, তারল্যসংকট ও দুর্বল সুশাসন ব্যবসায়িক আস্থাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। নির্বাচিত সরকারকে খেলাপি ঋণের বিষয়ে কঠোর হতে হবে। বড় শিল্পের পাশাপাশি ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি শিল্প সবচেয়ে বেশি চাপে রয়েছে। প্রায় ৭৮ লাখ সিএমএসএমই দেশের জিডিপির এক-চতুর্থাংশ অবদান রাখে এবং মোট শ্রমশক্তির ৪০ শতাংশের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে। এ খাত দুর্বল হলে কর্মসংস্থান ও দারিদ্র্য পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠবে।
বিশ্ববাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় রপ্তানি খাতেও স্বস্তি নেই। টানা চার মাস রপ্তানি কমেছে। শুধু নভেম্বর মাসেই রপ্তানি আগের বছরের তুলনায় কমেছে ৫.৫৪ শতাংশ। তৈরি পোশাক খাতে অর্ডার কমে যাওয়ায় বেশ কিছু কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, যা শ্রমবাজারে নতুন চাপ সৃষ্টি করছে। ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের বড় অংশ মনে করেন, সংকট থেকে উত্তরণের মূল চাবিকাঠি হলো রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নীতিগত নিশ্চয়তা। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে একটি নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নিলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরতে পারে—এ প্রত্যাশাই এখন অনেকের ভরসা। দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক রোডম্যাপ, ব্যাংকিং খাত সংস্কার, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিতকরণ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ছাড়া অর্থনীতির গতি ফেরানো কঠিন হবে।
বর্তমান পরিস্থিতি স্পষ্ট করছে যে, এটি শুধু চক্রাকার মন্দা নয়, বরং কাঠামোগত দুর্বলতার ফল। সংকট যত গভীরই হোক, সঠিক নীতি, আস্থার পুনর্গঠন ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার মাধ্যমে অর্থনীতি আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারে। প্রশ্ন হলো, সে সাহসী সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হবে কি না এবং কত দ্রুত সেসব গ্রহণ করা হবে? বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটকে আর বৈশ্বিক অভিঘাত বা সাময়িক মন্দা বলে ব্যাখ্যা করা যাবে না। বাস্তবতা হলো, নীতিনির্ধারণে দোদুল্যমানতা ও সিদ্ধান্তহীনতাই সংকটকে দীর্ঘায়িত করছে। একদিকে সরকার মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের কথা বলছে, অন্যদিকে যে নীতিগুলো নেওয়া হচ্ছে, সেগুলো অর্থনীতির মূলমন্ত্র—বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানকে তেমন একটা গতিশীল করতে পারেনি।
উচ্চ সুদের হার এখন আর শুধু একটি আর্থিক সূচক নয়; এটি একটি রাজনৈতিক নীতিগত সিদ্ধান্তের প্রতিফলন। সুদের হার ১৪-১৬ শতাংশে আটকে রেখে বিনিয়োগ বাড়বে—এমন প্রত্যাশা বাস্তববিবর্জিত। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের একমাত্র হাতিয়ার হিসেবে সুদকে ব্যবহার করা হচ্ছে অথচ বাজার ব্যবস্থাপনা, সরবরাহ ঠিক রাখা ও প্রতিযোগিতা নীতির ব্যর্থতা প্রায় উপেক্ষিত। ফলে মুদ্রানীতি হয়ে উঠেছে একপেশে, আর এর বোঝা বহন করছে উৎপাদনশীল কৃষি ও শিল্প খাত।
নীতিনির্ধারকেরা প্রায়ই বলেন, স্থিতিশীলতা ফিরলেই বিনিয়োগ আসবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কোন স্থিতিশীলতা? যখন উদ্যোক্তা জানেন না ছয় মাস পর করের হার কী হবে, ডলারের দাম কোথায় দাঁড়াবে, গ্যাস পাবেন কি না, কিংবা ব্যাংক হঠাৎ ঋণ বন্ধ করে দেবে কি না? তখন বিনিয়োগ স্থগিত থাকাটাই স্বাভাবিক। অনিশ্চয়তাই এখন সবচেয়ে বড় নীতিগত ব্যর্থতা। ব্যাংকিং খাতে সংস্কারের কথা বহু বছর ধরে শোনা যাচ্ছে; কিন্তু বাস্তবে সংস্কারের নামে চলছে সংকট ব্যবস্থাপনা। খেলাপি ঋণের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার বদলে বারবার ছাড় ও পুনঃ তফসিল দেওয়া হচ্ছে। ঝুঁকি নিলে লাভ, নিয়ম মেনে চললে শাস্তি—এ নীতিগত দ্বিচারিতা ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর আস্থা ভেঙে দিয়েছে এবং ভালো উদ্যোক্তাদের ব্যাংকের বাইরে ঠেলে দিচ্ছে।
রাজস্ব নীতিতেও একই ছবি। কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর চাপ সামলাতে কর প্রশাসন সহজ পথ বেছে নিয়েছে—বিদ্যমান করদাতাদের ওপর চাপ বাড়ানো। কিন্তু কর খাতের সম্প্রসারণ, স্বচ্ছতা ও হয়রানিমুক্ত করব্যবস্থা গড়ে তোলার রাজনৈতিক সদিচ্ছা স্পষ্ট নয়। এতে ব্যবসায়ীরা করকে উন্নয়নের অংশীদার না ভেবে ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, নীতিনির্ধারণে সময়ের গুরুত্ব উপেক্ষিত। অর্থনীতি শূন্যতা সহ্য
করে না। বিনিয়োগ না এলে কর্মসংস্থান হয় না, কর্মসংস্থান না হলে চাহিদা বাড়ে না, আর চাহিদা না বাড়লে প্রবৃদ্ধি কাগজ-কলমেই থেকে যায়। এই দুষ্টচক্র ভাঙতে হলে অর্ধেক সিদ্ধান্ত নয়; বরং স্পষ্ট, সাহসী ও সময়োপযোগী নীতিগত সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। সংকট নিজে নিজে কেটে যাবে—এই আশায় বসে থাকার সময় শেষ। প্রশ্ন এখন একটাই, নীতিনির্ধারকেরা কি অর্থনীতির বাস্তব সংকেত শুনবেন, নাকি সংকট আরও ঘনীভূত হওয়ার পর সিদ্ধান্ত নেবেন? ইতিহাস বলে, দেরিতে নেওয়া সঠিক সিদ্ধান্তও অনেক সময় ভুল সিদ্ধান্তের মতোই ক্ষতিকর হয়।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়