হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

রাজনীতিবিদদের রহস্যময় হলফনামা

কেউ তাঁর পেশা যে রাজনীতি—এ কথাটি লেখেন না। কেন? তাহলে রাজনীতি কি একটা পার্টটাইম প্রফেশন? খণ্ডকালীন পেশাদারেরা দেশ চালাবেন? আমি বুঝি না। রাজনীতি কি পেশা হতে পারে না? পেশা থাকলে পেশাদারত্ব থাকে। পেশাদারত্ব থাকলে সেখানে কিছু নিয়মকানুন থাকে। এ জন্যই কি রাজনীতিতে কোনো নিয়মকানুন বা নীতিনৈতিকতা থাকে না?

মাসুদ কামাল

প্রতীকী ছবি

বহুল চর্চিত ওয়ান-ইলেভেন সরকার ও তার কর্মকাণ্ড নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা-সমালোচনা রয়েছে। আমাদের নির্বাচনী ব্যবস্থায় তারা কিছু মৌলিক পরিবর্তন এনেছিল। এসব পরিবর্তনের কিছু প্রশংসিত হয়েছে, কিছু হয়েছে সমালোচিত। যেমন স্বতন্ত্র প্রার্থীর মনোনয়নের জন্য ১ শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষর সংগ্রহের বিষয়টি খুবই মন্দ একটা সিদ্ধান্ত হয়েছে। আবার বিপরীত দিকে ‘না’ ভোট সংযোজন এবং প্রার্থীদের হলফনামা প্রদানের বিষয় দুটি প্রশংসা করার মতো। সেই ‘না’ ভোটের নিয়মকে অবশ্য বদিউল আলম মজুমদারের নেতৃত্বে গঠিত নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন একেবারে বিকলাঙ্গ বানিয়ে দিয়েছে। তবে হলফনামা প্রদানের বিষয়টি আগের চেয়েও জোরালোভাবে বহাল রয়েছে। এটি সাধারণ ভোটারদের জন্য ভালো হয়েছে। তাঁরা এখন ভোট দেওয়ার সময় ভোটারদের সম্পর্কে একটা ধারণা লাভ করতে পারবেন। তত্ত্বগতভাবে এমনটিই হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে তা হচ্ছে কতটুকু? হলফনামায় কতটুকু সঠিক তথ্য দিচ্ছেন প্রার্থীরা? অথবা ভোটাররাই বা প্রার্থীদের দেওয়া সেসব তথ্যকে কতটুকু বিশ্বাস করছেন?

এ নিয়ে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের আগে আমরা বরং এবারের নির্বাচন সামনে রেখে সম্ভাব্য প্রার্থীরা নিজেদের যে হলফনামা দাখিল করেছেন, সেগুলোর দিকে একটু তাকাতে পারি। অত ডিটেইলে যাব না; বরং কেবল বাৎসরিক আয় আর মোট সম্পদের দিকে একটু নজর দিই। বৃহত্তম দুই দল বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর দুই শীর্ষ নেতার কথাই আগে বলি। হলফনামা অনুযায়ী, তারেক রহমানের বার্ষিক আয় হচ্ছে ৬ লাখ ৭৬ হাজার টাকা। অর্থাৎ তাঁর মাসিক আয় ৫৬ হাজার ৩৩৩ টাকা! এত টাকা দিয়ে উনি কী করেন? কারণ, আমার হিসাবে এই অর্থ ব্যয়ের ওনার কোনো জায়গাই নেই। আমাদের রাজনীতি বা রাজনীতিকদের যে ঐতিহ্য, তাতে ওনার আসলে পকেটে বা মানিব্যাগে হাত দেওয়ার কোনো সুযোগই তো নেই। যদি থাকত এবং তাঁকে নিজের উপার্জনেই চলতে হতো, তাহলে তো তিনি গুলশান এলাকায় বাসা নিয়ে থাকতে পারতেন না। এমনকি তাঁর স্ত্রীর উপার্জনও যদি এখানে যোগ করি, তবু এই দুই উৎসের অর্থ দিয়ে ওই এলাকায় একটা বাড়ি মেইনটেইন করা অসম্ভব। সে ক্ষেত্রে ধরে নেওয়া যায়, এসব ব্যয় তাঁর দল বা দলের কেউ, অথবা অন্য কোনো শুভানুধ্যায়ী বহন করেন। ব্যয়টা দল করলে প্রশ্ন উঠবে—এমন ব্যয় দলের কোন পর্যায়ের কয়জন নেতার জন্য করা হয়? আয় বা ব্যয়ের সেই হিসাব কি নির্বাচন কমিশনকে দেওয়া হয়?

প্রশ্ন অনেক হয়তো করা যায়। কিন্তু সেসব প্রশ্নের আগে বরং জামায়াতে ইসলামীর নেতার হলফনামার দিকে একটু তাকানো যাক। জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানের বাৎসরিক আয় ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা। মানে প্রতি মাসে তাঁর আয় মাত্র ৩০ হাজার টাকা। হলফনামায় তাঁর আয়ের উৎস হিসেবে দেখানো হয়েছে কৃষি ও দান। এই হিসাবটাও আমার কাছে দুর্বোধ্য মনে হয়েছে। লোকজন তাঁকে দান করে থাকেন—এমন তথ্যকে যদি যথার্থ ধরি, তখন বিস্ময় জাগে দানের পরিমাণটি নিয়ে। এত কম দান করেন? তিনি এমবিবিএস পাস করা ডাক্তার। হলফনামায় পেশা হিসেবে লিখেছেন—চিকিৎসক। পেশা যদি চিকিৎসক হয়, তাহলে আয়ের একটা ক্ষুদ্রাংশও কেন নিজ পেশা থেকে হবে না? বুঝি না। ওনার কি কোনো চেম্বার আছে? কোথায় সেটা?

আবার ধরুন, এনসিপির নেতাদের সম্পদ বা বার্ষিক আয়ের হিসাবের বিষয়গুলো। নাহিদ ইসলামের বার্ষিক আয় ১৬ লাখ টাকা। অর্থাৎ প্রতি মাসে ১ লাখ ৩৩ হাজার টাকা। তাঁর দাবি অনুযায়ী তাঁর পেশা হচ্ছে পরামর্শক। শিক্ষাগত যোগ্যতা স্নাতক। তিনি কী পরামর্শ দেন? কাকে দেন? পরামর্শক হিসেবে তাঁর আয় একেবারে মন্দ নয়। তাহলে সরকারি চাকরির জন্য তিনি আন্দোলনে নেমেছিলেন কেন? নাকি এই ‘পরামর্শক’ পেশাটা তিনি উপদেষ্টা হওয়ার পর লাভ করেছেন?

এনসিপির আরেক নেতা আবদুল হান্নান মাসউদ। গত এক বছরে লোকজন তাঁকে চিনেছেন ‘কান্না মাসউদ’ হিসেবে। তাঁর গলার স্বরটাই এমন, আবেগজনিত কিছু বলতে গেলেই যেন মনে হতো—তিনি বুঝি কান্না করছেন। এই ‘কান্না’জড়িত কণ্ঠেই একবার তিনি বলেছিলেন, তাঁর এলাকায় সবচেয়ে জীর্ণ বাড়িটিই নাকি তাঁদের! সেই মাসউদের হলফনামায় দেখা গেল তাঁর মোট সম্পদের পরিমাণ ৯৮ লাখ ৩৯ হাজার টাকা। বাড়িসংক্রান্ত ওই কান্নাকাটির পর একবার মাসউদ আবার বেশ গর্ব করে বলেছিলেন, তাঁদের এলাকার সবচেয়ে সমৃদ্ধ বাড়িটি নাকি তাঁদের। সেই বাড়িতে পুকুরই আছে তিনটি। এত যে সমৃদ্ধ বাড়ি, সেই বাড়ির মালিক কে? নিশ্চয়ই তাঁর বাবা? মজার ব্যাপার হলো, তাঁর বাবাও এবার অন্য একটা দল থেকে নির্বাচনে অংশ নিতে হলফনামা দাখিল করেছেন। সেখানে সম্পদ দেখানো হয়েছে ২০ লাখ ৯৩ হাজার টাকার। তিন পুকুরসহ সমৃদ্ধ বাড়ির মালিকের সম্পদ ২১ লাখ, আর বেকার ছেলের সম্পদ ৯৮ লাখ—হিসাবটা যেন সহজে মেলে না!

নাম ধরে ধরে এমন হিসাব, আর হিসাবের রহস্য নিয়ে আলোচনা অনেক করা যায়। কিন্তু তাতে লাভটা কী? লাভ কিছুই নেই। কারণ, মানুষের মনে যেসব প্রশ্ন, তার জবাব তো কেউ দেবেন না। জবাব না দেওয়াটাই আসলে প্রচলিত নির্লজ্জতা।

তার চেয়ে আমরা বরং হলফনামা নিয়ে আরও কিছু কথা বলি। ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে প্রার্থীদের হলফনামা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়। তখন হলফনামায় প্রার্থীর বয়স, পেশা, শিক্ষাগত যোগ্যতা, আয়, সম্পদ, মামলাসহ আট ধরনের তথ্য দেওয়া বাধ্যতামূলক ছিল। এবার ১০ ধরনের তথ্য দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। যোগ করা হয়েছে আয়করের সর্বশেষ তথ্য ও নির্ভরশীলদের পেশার তালিকা। এ ছাড়া সম্পদের তথ্যে বিদেশে থাকা সম্পদের হিসাব উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কেবল হলফনামা দেওয়াটাই নয়, হলফনামায় দেওয়া তথ্য প্রচার করাটাও অবাধ করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে এসব তথ্য দেওয়া আছে। যে কেউ চাইলে সেসব ডাউনলোড করতে পারেন। নিজেদের সংগ্রহে রাখতে পারেন। কেউ কেউ হয়তো বলবেন, ডাউনলোড করে রেখে লাভ কী? লাভ আছে। পরে কখনো যখন আপনার মন খুব বিষণ্ন থাকবে, সেসব তথ্য দেখে নেতাদের বুদ্ধিমত্তা অথবা নিস্পৃহতা উপলব্ধি করে আমোদ অনুভব করতে পারবেন। অথবা যদি কখনো দেশের অর্থনৈতিক দুরবস্থা নিয়ে খুব চিন্তিত হয়ে পড়েন, কারণ সম্পর্কে ধারণা পেতেও এসব হলফনামা আপনাকে সাহায্য করতে পারে।

আর রসিকতা নয়, বরং একটা সিরিয়াস প্রসঙ্গ তুলে আলোচনাটা শেষ করি। আচ্ছা, এই যে রাজনীতিবিদেরা, দেশের সম্ভাব্য কান্ডারিরা, তাঁদের আসলে পেশাটা কী? আমি অনেক কটি হলফনামা দেখেছি, সেখানে পেশার একটা ঘর আছে, লিখতে হয় তাঁর পেশাটা কী। কেবল বর্তমান পেশা নয়, পূর্বতন পেশাও লিখতে হয়। স্ত্রীর বর্তমান ও পূর্বতন পেশা লেখার বাধ্যবাধকতাও রয়েছে। কিন্তু বিস্ময়কর বিষয় হচ্ছে, কেউ তাঁর পেশা যে রাজনীতি—এ কথাটি লেখেন না। কেন? তাহলে রাজনীতি কি একটা পার্টটাইম প্রফেশন? খণ্ডকালীন পেশাদারেরা দেশ চালাবেন? আমি বুঝি না। রাজনীতি কি পেশা হতে পারে না? পেশা থাকলে পেশাদারত্ব থাকে। পেশাদারত্ব থাকলে সেখানে কিছু নিয়মকানুন থাকে। এ জন্যই কি রাজনীতিতে কোনো নিয়মকানুন বা নীতিনৈতিকতা থাকে না?

লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক

খেলিছ এ বিশ্ব লয়ে...

নির্বাচনে সাইবার নিরাপত্তা

খেজুরের গুড়ের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ুক

ভেনেজুয়েলায় মাগা বিসর্জন দিলেন ট্রাম্প, পরের ‘বলিযোগ্য’ কী

গ্যাসের দামে পুড়ছে সাধারণের জীবন

অর্থনীতিতে সমস্যা উত্তরণের পথ

এনসিপির ব্যাপারে মানুষের বিশ্বাসটা নষ্ট হয়ে গেছে

পথের প্রাণীদের কল্যাণ ও সুরক্ষা নিশ্চিতে অপারগ আইন

জাতীয় সরকার কি অনিবার্য

অতীতের দুঃস্বপ্নগুলো মুছে দিক ২০২৬