সাতক্ষীরার ফিংড়ি ইউনিয়নে এক বিকেলে ছয় বছরের এক শিশু স্কুল থেকে ফিরছিল। পথে তার চেনা এক যুবক তাকে ডাকল বিস্কুট দেবে বলে। শিশুটি ভেতরে ঢুকল। কেউ ছিল না। যুবকটি দরজা বন্ধ করল, মুখ চেপে ধরল, হাত-পা বেঁধে ধর্ষণ করল। অভিযুক্ত ওই যুবক পলাতক। শিশুটির মা সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘আমার মেয়ে এখন আর কারও বাড়িতে খেলতে যায় না। বিস্কুট দেখলে কেঁদে ফেলে।’
এই দুটি বাক্যে বাংলাদেশের ধর্ষণ-সংস্কৃতির পুরো চিত্র লুকিয়ে আছে। এখানে ধর্ষক সেই ‘দেব-মানুষ’, যাকে সমাজ বিশ্বাস করে—প্রতিবেশী, শিক্ষক, ইমাম, পুলিশ। আর ভুক্তভোগী সেই শিশু, যার কণ্ঠস্বর সমাজের কাঠামোয় কোথাও পৌঁছায় না।
স্কটিশ সমাজতত্ত্ববিদ স্ট্যানলি কোহেন ১৯৭২ সালে দেখিয়েছিলেন, সমাজ যখন কোনো বিপদকে অতিরঞ্জিত করে, তখন সে এক ‘ফোক ডেভিল’ বানায়—যাকে ঘৃণা করে সব সমস্যার সমাধান খোঁজে। বাংলাদেশে এই প্রক্রিয়াটি উল্টো—এখানে প্রকৃত অপরাধী প্রায়ই ‘দেব-মানুষ’, আর ভুক্তভোগী হয়ে ওঠে সন্দেহের পাত্র!
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম সাত মাসে ৪০০ নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, যার মধ্যে ৩৭ জনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। ২০২৫ সালে ৭৮৬টি ধর্ষণের ঘটনা নথিভুক্ত—২০২৪ সালের চেয়ে ৫২ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ১৯টি যৌন সহিংসতার ঘটনায় ৬৩ শতাংশ ভুক্তভোগী শিশু, অভিযুক্তদের মধ্যে ছিলেন শিক্ষক, ইমাম, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যও।
ডিজিটাল গ্রুমিং এখন ধর্ষণের প্রস্তুতিকক্ষ। ২০২৫ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ইন্টারনেট ব্যবহারকারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৫৩ শতাংশ অনলাইন গ্রুমিংয়ের শিকার হয়েছেন; সাইবারফ্ল্যাশিং ৩৮ শতাংশ, সেক্সটিং ৩৫ শতাংশ, সেক্সটরশন ১২ শতাংশ। অথচ বাংলাদেশের কোনো আইনে ‘গ্রুমিং’ বা ‘পেডোফিলিক প্রস্তুতি’ আলাদা অপরাধ নয়। শিশু আইন ২০১৩-তেও গ্রুমিং নিয়ে আলাদা ধারা নেই। সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর ২৫ ধারায় ডিজিটাল শিশু যৌন নিপীড়নকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ করা হয়েছে—কিন্তু ‘গ্রুমিং’ শব্দটি চিহ্নিত করা হয়নি। গ্রুমিং অপরাধ নয়—এই আইনি অন্ধত্ব কি ধর্ষকদের জন্য খোলা দরজা নয়?
ধর্ষণের বিচারেও অন্ধকার। হাইকোর্টের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৩০ হাজার ৩৬৫টি ধর্ষণ মামলা পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে বিচারাধীন; ৯৯টি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে ১ লাখ ৩২ হাজার ১০৭টি মামলা ঝুলে আছে। ২০২৫ সালে ধর্ষণ মামলায় দণ্ডের হার মাত্র ৩ শতাংশ, শিশুদের ক্ষেত্রে ০ দশমিক ৫২ শতাংশ—অর্থাৎ প্রতি ২০০ শিশুর মধ্যে মাত্র একটির মামলায় দণ্ড হয়। এই বিচারহীনতার নৈতিক দায় কি শুধু বিচারকদের, নাকি সেই রাষ্ট্রেরও—যে রাষ্ট্র পর্যাপ্ত আদালত, প্রশিক্ষিত বিচারক ও সাক্ষী সুরক্ষাব্যবস্থা তৈরি করেনি?
এই উপমহাদেশের পিতৃতন্ত্র কেবল পুরুষের প্রাধান্য নয়—এটি একটি সম্পূর্ণ জ্ঞানকাঠামো, যা নারীর শরীর, কণ্ঠস্বর ও সম্মতি নিয়ন্ত্রণ করে। এই কাঠামো নারীকে দুইভাবে দেখে—একদিকে ‘পবিত্র মাতা’, অন্যদিকে ‘কামনার বস্তু’। বাংলাদেশে ধর্ষণ কেবল নারীর ওপর আক্রমণ নয়—এটি ‘পরিবারের সম্মান’ লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হয়; আর সেই সম্মান রক্ষার দায় চাপানো হয় ভুক্তভোগীর ওপরই।
এই পিতৃতন্ত্র কেবল পুরুষের নয়—নারী নিজেও এই কাঠামোর অংশ হয়ে অন্য নারীকে দোষারোপ করেন; শাশুড়ি, ননদ, প্রতিবেশী নারী—সবাই মিলে ভুক্তভোগীকে ‘অপরাধী’ বানান। গ্রামীণ সমাজে বিচার হয় সালিসে, সেখানে বসেন বয়োজ্যেষ্ঠ পুরুষেরা—যারা প্রায়ই ধর্ষককে ‘সমাজের ছেলে’ বলে বাঁচিয়ে দেন, আর ভুক্তভোগীকে ‘সম্মান রক্ষার’ নামে চুপ করিয়ে দেন।
পিতৃতন্ত্রের আরেকটি স্তর হলো ভাষা। ধর্ষণের ঘটনায় বলা হয় ‘ইজ্জত গেল’—যেন ইজ্জত নারীর শরীরে থাকে, আর ধর্ষক সেটি চুরি করেছে। যে ভাষায় ধর্ষণকে ‘ইজ্জত হরণ’ বলা হয়, সেই ভাষায় ধর্ষকের শাস্তি নয়, ভুক্তভোগীর ‘চরিত্র’ বিচার্য হয়ে ওঠে।
গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাকের ‘ক্যান দ্য সাবঅল্টার্ন স্পিক?’ (১৯৮৮) তত্ত্বটি এখানে অপরিহার্য। স্পিভাকের মূল প্রশ্ন—যারা ক্ষমতাকাঠামোর বাইরে, যাদের কণ্ঠস্বর ইতিহাস থেকে মুছে দেওয়া হয়েছে, তারা কি আদৌ ‘বলতে’ পারে? বাংলাদেশে ধর্ষণের ভুক্তভোগীর ক্ষেত্রে এটি দুইভাবে ঘটে। প্রথমত, আইনিকাঠামো ভুক্তভোগীর কণ্ঠকে বৈধ জ্ঞানের উৎস হিসেবে স্বীকার করে না। সাক্ষ্য আইনের ১৫৫ (৪) ধারার ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার—যেখানে ভুক্তভোগীর ‘চরিত্র’ বিচার্য ছিল—আজও বিচারব্যবস্থায় প্রোথিত। দ্বিতীয়ত, সামাজিক ও পারিবারিক কাঠামো ভুক্তভোগীর অভিজ্ঞতাকে ‘অবিশ্বাসযোগ্য’ বা ‘কলঙ্কিত’ হিসেবে চিহ্নিত করে।
একজন গ্রামীণ কিশোরী ধর্ষণের পর যখন থানায় যায়, তার অভিযোগ প্রথমে পুলিশের ভাষায়, তারপর আইনজীবীর ভাষায়, তারপর আদালতের ভাষায় অনূদিত হয়—প্রতিটি স্তরে তার মূল অভিজ্ঞতা বিকৃত হয়।
বাংলাদেশের ধর্ষণ-সংস্কৃতিকে ডিকলোনাইজেশন পরিপ্রেক্ষিতে পাঠ করা জরুরি। ব্রিটিশ আমলে প্রণীত পেনাল কোড ১৮৬০ এবং সাক্ষ্য আইন ১৮৭২ আজও বহাল; এই আইনগুলো ধর্ষণকে নারীর শরীরের ওপর আক্রমণ হিসেবে নয়, বরং পুরুষের ‘সম্পত্তি’ বা ‘সম্মান’-এর ওপর হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখত। ২০২২ সালে ভুক্তভোগীর চরিত্রগত সাক্ষ্য নিষিদ্ধের উদ্যোগ নেওয়া হলেও ঔপনিবেশিক মানসিকতা এখনো প্রোথিত।
পোস্ট-কলোনিয়াল রাষ্ট্রে নারীর শরীর ‘জাতির সম্মান’-এর প্রতীক হয়ে ওঠে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে নারীরা যেভাবে যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছিলেন এবং স্বাধীনতার পর তাঁদের ‘বীরাঙ্গনা’ হিসেবে পুনর্বাসনের নামে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও বৈষম্যের শিকার হতে হয়েছিল—তা এই ঔপনিবেশিক মানসিকতারই উত্তরাধিকার।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) আইন, ২০২৬-এ ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড করা হয়েছে। ২০২৫ সালের অধ্যাদেশে তদন্তের সময় ৩০ দিন থেকে ১৫ দিনে এবং বিচারের সময় ১৮০ দিন থেকে ৯০ দিনে কমানো হয়েছে। কিন্তু আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কাগজে সময়সীমা কমিয়ে আনা যথেষ্ট নয়; হাইকোর্ট ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে রায় দিয়েছেন যে নির্ধারিত ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ না হলেও মামলা বাতিল হবে না।
তবে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা—২০২৬ সালের সংশোধিত আইনেও ‘গ্রুমিং’ বা ‘অনলাইন প্রিডেটরি আচরণ’ আলাদা অপরাধ হিসেবে স্বীকৃত নয়। শিশু আইন ২০১৩ এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮—কোনোটিই অনলাইন গ্রুমিং মোকাবিলায় উপযুক্ত নয়। প্রসিকিউটর ও তদন্তকারীরা প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ বা সরঞ্জাম পান না।
এই চক্র ভাঙতে হলে আমাদের রাজনৈতিক নৈতিকতার চারটি স্তর চিনতে হবে।
প্রথমত, রাষ্ট্রের দায়। ৩ শতাংশ দণ্ডহার, ৩০ হাজার বিচারাধীন মামলা, ঘুষ নিয়ে ধর্ষককে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ—এসব রাষ্ট্রের ব্যর্থতা। যে রাষ্ট্র ধর্ষণ প্রতিরোধে পর্যাপ্ত বাজেট দেয় না, বিচারক নিয়োগ করে না, সাক্ষী সুরক্ষা নিশ্চিত করে না—সে কি তার নাগরিকদের প্রতি দায় এড়াতে পারে?
দ্বিতীয়ত, নাগরিকের দায়। যে নাগরিক ধর্ষণের খবর শুনে মুখ ফিরিয়ে নেন, যে নাগরিক ভুক্তভোগীকে ‘চরিত্রহীন’ বলেন, যে নাগরিক ‘সম্মান রক্ষার’ নামে মামলা করতে বাধা দেন—সবাই এই সংস্কৃতির অংশ। প্রতিবেশী, আত্মীয়, সহকর্মী—সবাই জানেন কে ধর্ষক, কিন্তু কেউ মুখ খোলেন না। এই নীরবতা কি নিরপেক্ষতা, নাকি অপরাধে সহযোগিতা?
তৃতীয়ত, প্রতিষ্ঠানের দায়। থানায় ভুক্তভোগীকে ‘ফিরিয়ে দেওয়া’, মিডিয়ায় ভুক্তভোগীর নাম-ছবি প্রকাশ, স্কুলে শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ পেলে তাঁকে বদলি করা—এসব প্রতিষ্ঠানগত অপরাধ। প্রতিষ্ঠানের নৈতিক দায় তাদের ক্ষমতার সমান।
চতুর্থত, আন্তর্জাতিক দায়। বাংলাদেশে ধর্ষণ-সংস্কৃতি কেবল দেশীয় পিতৃতন্ত্রের ফল নয়—এটি ঔপনিবেশিক আইনের উত্তরাধিকার, বিশ্বব্যাপী লিঙ্গ-অসমতার অংশ, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নীরবতার ফসল। যখন জাতিসংঘ বাংলাদেশে নারী নির্যাতনের তথ্য চায়, কিন্তু বাস্তবে কিছু করে না—তখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নৈতিক দায় কী?
গ্রুমিং ও পেডোফিলিয়াকে আলাদা অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে; ভিকটিম ব্লেমিং বন্ধ করে সম্মতির শিক্ষা চালু করতে হবে; ৯০ দিনের বিচার কাগজে নয়, বাস্তবে নিশ্চিত করতে হবে; ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার বাড়াতে হবে; বাংলা ভাষায় কনটেন্ট মডারেশন ও ডিজিটাল সাক্ষরতা শক্ত করতে হবে এবং রাষ্ট্র, নাগরিক, প্রতিষ্ঠান ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়—সবাইকে নিজ নিজ নৈতিক দায় স্বীকার করতে হবে।
সাতক্ষীরার সেই শিশুটি এখন আর বিস্কুট খেতে চায় না। সে হয়তো কোনো দিন জানতেও পারবে না, তার কণ্ঠস্বর কেন সমাজের কাঠামোয় পৌঁছাল না। কিন্তু আমরা জানি—যে সমাজে ধর্ষক ‘দেব-মানুষ’, যে সমাজে ভুক্তভোগীর ‘চরিত্র’ বিচার্য, যে সমাজে ৩০ হাজার মামলা বিচারের অপেক্ষায় পড়ে থাকে, সেই সমাজে ‘ফোক ডেভিল’ বদলাবে, কিন্তু আগুনে পুড়বে কে—আমাদেরই কন্যাশিশুরা নয় কি?