বেশ কিছু দিন ধরেই সকালের সবাদপত্র খুললে বা টেলিভিশন দেখলেই অসম্ভব সব মৃত্যুর খবর সবার জীবন-যাপনকে স্থবির করে দেয়। কিছুদিন দেখা গেল ধর্ষণ ও ধর্ষণের হত্যার খবর। তারপর খুব সহজেই যেন শিশু হত্যা ঘটছে। আবার আরেকজনের ভাত খেয়ে ফেলার অপরাধে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রকে হত্যা। এসব হত্যার ঘটনা তো অবিরাম ঘটেই চলছে। এসব মৃত্যু যে শুধু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির জন্য হচ্ছে, তা নয়। এটা একটা বড় ধরনের সামাজিক বিপর্যয়ের ফলাফল। আর তা আমরা বুঝতে অক্ষম হয়ে যাচ্ছি। কিশোর গ্যাংয়ের কার্যকলাপ তো ভয়াবহ! সম্প্রতি একটা আইফোনের জন্য একটা কিশোরকে হত্যা করে ফেলেছে কিশোর বয়সীরাই। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, আমাদের চিরাচরিত সেই উপলব্ধি—‘আমার সংসারে তো এসব ঘটেনি।’ তাই এসব শুনেই আমরা নিশ্চিন্ত নিদ্রা যাই!
সমাজ বা রাষ্ট্র এবং দেশের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে এর বিপরীতে কী করা যেতে পারে তার জন্য কোনো উদ্যোগ নেওয়ার প্রয়োজন কেউ করছে না। পুলিশ দিয়েই এসব সমস্যা সমাধানের একটা তাৎক্ষণিক চেষ্টা চলছে মাত্র। উন্নত দেশে এসব ঘটলে রাজনীতিবিদেরা তৎপর হয়ে উঠতেন। নাগরিকদের নিয়ে, সমাজ বিশেষজ্ঞদের নিয়েও একটা ভাবনার চেষ্টা করতেন। কিন্তু এখানে শুধু সাংবাদিকেরা দায়িত্ব পালন করছেন, তথ্য পৌঁছে দিচ্ছেন। দেশের নাগরিকেরাও অতিরিক্ত রাজনীতিসচেতন—আমেরিকার কী হলো, সংসদে কী হচ্ছে, সংসদ সদস্যদের কর্মকাণ্ড নিয়ে যতটা তৎপর তারা, শিশু হত্যা নিয়ে তাদের তেমন একটা মাথাব্যথা নেই। যারা খুবই দায়িত্ববান তারা ফেসবুকে একটা পোস্ট দিয়েই খালাস। মানুষ ক্ষমতার রাজনীতি নিয়ে যতটা ব্যস্ত হয়ে পথে নেমে পড়ে, বড় বড় মানবিক বিপর্যয়ে এ রকম কোনো ভূমিকা রাখার প্রয়োজন বোধ করে না।
সচেতন মানুষ মবের কারণেও ভীত। যেকোনো সমাবেশেই মবের ভয় থাকে। একটা সমাজের এত মানুষ যদি ভয়ের মধ্যে থাকে, সহজ কথাটি বলতে ভয় পায়, তাহলে কার লাভ হবে তাতে? সহজভাবে বলতে গেলে লাভ হবে ওই দুর্বৃত্তদের। সরকারকেও দেখা যায় সব ব্যাপারে একটা পালনীয় প্রতিক্রিয়া দেখাতে। আবার সব কাজ একাই করতে চায় সরকার। এখন বিষয়টা এমন দাঁড়িয়ে গেছে যে নাগরিকদের মধ্যে যাদের বাঁচার ক্ষমতা আছে, শুধু তারাই বাঁচবে। সেই তত্ত্ব—‘সারভাইভাল ফর দ্য ফিটেস্ট’—যা প্রাণিজগতের নিয়ম। এই নিয়ম মানতে মানতেই সবাই অভ্যস্ত হয়ে গেছে—সমাজ, রাষ্ট্র বা সরকার বাঁচাবে না; নিজে নিজে বাঁচতে হবে। কিন্তু বাঙালি বা বিশেষ জাতিসত্তার মানুষেরা একা বাঁচতে শেখেনি। তাদের আশপাশে মানুষ দরকার। বিপদে-আপদে তো বটেই, উৎসবে, নানা আয়োজনে মানুষ চাই। আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব তো বটেই, চেনাজানা সব মানুষ চাই। না হলেই অভিমান!
সেই অবস্থারও পরিবর্তন হতে চলেছে, দ্রুত। যেভাবে বিশ্ব ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে, তার পেছনে শত শত বছরের অভিজ্ঞতার প্রয়োজন পড়েছে। তারপর তারা শক্ত করে রাষ্ট্র গড়ে তুলেছে, আইনকানুনের নানা পথ খুঁজে বের করেছে। কিন্তু আমরা রাষ্ট্রটাও গড়তে পারিনি, আবার সমাজটাকেও ভেঙে ফেলেছি। তারপর মানুষ গড়ার যে জায়গাটা ছিল, সেটাও তছনছ করে দিয়েছি। অভিভাবকেরা বড়ই স্বার্থপর হয়ে উঠেছেন। তাঁরা শুধু তাঁদের নিজেদের ছেলেমেয়েদের দেখছেন। আশপাশের কিছুই দেখছেন না। ছেলেমেয়ে প্রথম হবে স্কুলের পরীক্ষায়, গানের স্কুলে পড়বে, ক্রিকেট খেলার মাঠে যাবে, ছবি আঁকা শিখবে একটু; এরপর আছে তাদের জন্য পাঁচ-ছয়জন কোচিং মাস্টার। ছেলেমেয়ের ছোট্ট মাথায় কত কিছু আর ঢুকবে?
এ পর্যায়ে সন্তানের দাবিনামা এসে যায়—মোবাইল ফোন কিনে দাও। যা-তা মোবাইল ফোন দিলে হবে না, আইফোন কিনে দিতে হবে! আরেকটু বড় হলে—একটা মোটরসাইকেল কিনে দাও; স্কুলের টিফিনের টাকা বাড়িয়ে দাও। অভিভাবকেরা দেনও। সীমিত আয় আছে যাঁদের, তাঁরাও দেন। নিজেরাও ব্যবহার করেন। সীমিত আয়ের শিক্ষকদের কাছেও নাকি অনেক সময় থাকে আইফোন। সন্তানকে মাঝেমধ্যে দেনও। আজকাল নাকি ফোনে এআই ব্যবহার করে পরীক্ষায় নকলও করা যায়। বাবা-মায়ের টাকা, মোবাইল ফোন এসব ব্যবহার করে কোনোটারই মূল্য বোঝে না সন্তানেরা। ভালো বিষয়ের প্রতি তাদের কৌতূহলের জায়গাটা আর থাকে না। তারা আর সামাজিক মানুষ হয়ে থাকে না। একা হয়ে যায়। একমাত্র বন্ধু তাদের মোবাইল ফোন আর টিফিনের টাকার সঙ্গে বাড়তি টাকা। টাকার অঙ্ক বাড়ে আর ফোনের মডেলও বাড়ে। কিন্তু তারা যে কী হারিয়ে ফেলে তা বোঝার আর সময়ও পায় না। সবকিছু অচেনা হয়ে যায় তাদের কাছে। আত্মীয়তার বন্ধনও তারা বোঝে না।
অনেক সময় দেখা যায়, আইফোনধারী কোনো অভিভাবকের বাড়িতে আত্মীয়স্বজনের ভিড় বেড়ে যায়। কেন? অভিভাবক সাহেবকে দুর্নীতি দমন মামলায় পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে। পত্রিকার কাগজে তাঁর ছবি ছাপা হয়েছে। এখন ছেলেমেয়েরা স্কুল-কলেজে যাবে কী করে?
দুর্নীতি—এই সমস্যা খুবই প্রাচীন। বহু আগেই এসব শুরু হয়েছে। এতটাই সাধারণ ব্যাপার হয়ে গেছে যে দুর্নীতিবাজ লোকেদের এখন আর কেউ ঘৃণা করে না। আত্মীয়স্বজন
বলবে শত্রুতা করে এসব হয়েছে। দেখা গেল, কিছুদিনের মধ্যেই দুর্নীতিবাজ অভিভাবক ছাড়া পেয়ে গেলেন। বীরদর্পে চলাফেরা শুরু করলেন।
এই যে তুচ্ছ কারণে মানুষ শিশু-কিশোরদের হত্যা করছে, এর সঙ্গে পুরো সমাজের সম্পর্কটা কী? সম্পর্কটা গুরুতর পর্যায়ে গেছে। সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মধ্যে একটা অর্থনীতি তৈরি হয়ে গেছে। সেই মুদ্রাস্ফীতির অর্থনীতিই সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করছে। সেসব মানুষ সমাজে একটি নতুন জৌলুশ তৈরি করেছে। খাদ্য, পোশাক-আশাক, নতুন মডেলের গাড়ি, বিদেশ যাত্রা, ছোট্ট দেশে শত শত রিসোর্ট—এসব হচ্ছে কী করে? তারা বুঝে গেছে দুর্নীতি বা বড় ধরনের অপরাধ করলে কিচ্ছু হয় না। এর মূলে আছে তাদেরই তৈরি একটা সংস্কৃতি।
ইন্টারনেটের কল্যাণে ভায়োলেন্স এবং যৌনতার একটা শিল্প গড়ে উঠেছে। ছোট্ট একটা মোবাইল ফোনে তা চালান করে দেওয়া যায়। আগে আমরা গ্রামকে মনে করতাম একটা সমাজের বিধিবদ্ধ উদাহরণ। কিন্তু সেই গ্রামের মানুষেরাও এই সংস্কৃতিতে ঢুকে পড়ছে। রুচির দুর্ভিক্ষের মধ্যে থেকে তারাও ওপরে উঠতে চাইছে এবং সফলও হয়ে যাচ্ছে। প্রকৃতিকে ধ্বংস করার মহোৎসবে যোগ দিয়েছে অনবরত। ঢুকে পড়ছে এই গড্ডল প্রবাহে।
এই যে এত শিশুমৃত্যু, শিশু হত্যা—এসবের সঙ্গে বিচারহীনতার সংস্কৃতি যুক্ত হচ্ছে। ওই সব শিশু-কিশোরের মুখ দেখে কি রাষ্ট্রযন্ত্রের মায়া হয় না? কিন্তু যে মানুষেরা এখনো ব্যথিত হয়, সুবিচার চায়, সমাজটাতে পরিবর্তন চায়, তাদের সংখ্যা বাড়ারও কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। তাহলে ‘তোমারে বধিবে যে, গোকুলে বাড়িছে সে’ প্রবাদ বা আপ্তবাক্যের প্রসার যারা চায়, তাদের কি অনেক দিন অপেক্ষা করতে হবে?