আজ ২০২৬ সালের এই অতি-প্রযুক্তিনির্ভর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাচালিত দ্রুতগতির জীবনে দাঁড়িয়ে আমরা অধিকাংশ তথ্য গ্রহণ করি স্ক্রিনের দৃশ্য কিংবা কানের হেডফোনের মাধ্যমে। কিন্তু কোনো এক বিকেলে হঠাৎ ভেসে আসা ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধ, পুরোনো বইয়ের সুবাস, কিংবা একছত্র বকুল ফুলের ঘ্রাণ পেলেই আমাদের প্রযুক্তিমুগ্ধ আধুনিক মন মুহূর্তেই থমকে দাঁড়ায়। নিমেষেই আমরা পৌঁছে যাই দশকের পর দশক পিছিয়ে থাকা শৈশবের চেনা কোনো স্মৃতির সাগরে। প্রযুক্তির অগ্রগতিতে বিশ্ব বদলালেও মানুষের ঘ্রাণশক্তির মাধ্যমে অতীতে ফিরে যাওয়ার আদিম সংবেদনশীলতা এতটুকু বদলায়নি। কেন একটিমাত্র সুপরিচিত গন্ধ আমাদের কোনো যুক্তিতর্ক বা চিন্তাভাবনা করার সুযোগ না দিয়েই স্মৃতির অতলে ডুবিয়ে দেয়? সাহিত্যের পাতায় যা একসময় ‘প্রুস্ট ইফেক্ট’ নামে পরিচিত ছিল, স্নায়ুবিজ্ঞান আজ তার পেছনের রহস্য পুরোপুরি উন্মোচন করেছে।
সাহিত্যের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ফরাসি সাহিত্যিক মার্সেল প্রুস্ট তাঁর বিখ্যাত উপন্যাসে প্রথম এই মনস্তাত্ত্বিক অভিজ্ঞতার এক অনবদ্য বর্ণনা দিয়েছিলেন। চায়ে ভেজানো এক টুকরা বিস্কুটের মিষ্টি সুবাস নাকে যেতেই লেখক বিস্ময়ের সঙ্গে আবিষ্কার করেন, তিনি মুহূর্তে ফিরে গেছেন তাঁর শৈশবের দিনগুলোতে। সাহিত্যে এই বিশেষ সুবাসজনিত স্মৃতিজাগরণকে বলা হয় ‘প্রুস্ট ইফেক্ট’। দীর্ঘদিন পর্যন্ত এটিকে কেবল এক চমৎকার সাহিত্যিক অলংকার কিংবা কবির ভাবালুতা হিসেবেই দেখা হতো। কিন্তু আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞান প্রমাণ করেছে, প্রুস্ট যা লিখেছিলেন, তা ছিল মানুষের মস্তিষ্কের এক অকাট্য জৈবিক সত্য।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক জীববিজ্ঞানবিষয়ক গবেষণা সাময়িকী ‘প্লস বায়োলজি’-তে প্রকাশিত একটি গবেষণায় স্নায়ুবিজ্ঞানীরা সুনির্দিষ্টভাবে দেখিয়েছেন, শৈশবের এই ঘ্রাণজনিত স্মৃতিগুলো আমাদের মস্তিষ্কে ঠিক কীভাবে ও কোথায় স্থায়ীভাবে জমা থাকে। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, আমাদের অন্যান্য ইন্দ্রিয় (যেমন, চোখ বা কান) যেভাবে কাজ করে, ঘ্রাণশক্তি কিন্তু সেভাবে কাজ করে না। আমরা চোখে যা দেখি বা কানে যা শুনি, সেই তথ্যগুলোর সংকেত প্রথমে পৌঁছায় মস্তিষ্কের মূল তথ্য আদান-প্রদান কেন্দ্র বা ‘থ্যালামাস’-এ। থ্যালামাস তা বিশ্লেষণ ও বিন্যস্ত করে আমাদের চিন্তাভাবনা ও যুক্তিনির্ভর অংশে পাঠায়। ফলে কোনো দৃশ্য বা শব্দ নিয়ে মস্তিষ্ক কিছুটা হলেও যুক্তিভিত্তিক বিশ্লেষণ করার সময় পায়।
কিন্তু ঘ্রাণশক্তির ক্ষেত্রে পথটি একেবারেই ভিন্ন। ঘ্রাণজাতীয় সংকেত কোনো মধ্যবর্তী থ্যালামাসের তোয়াক্কা করে না। নাক দিয়ে গন্ধ প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গেই তা অলফ্যাক্টরি বাল্ব হয়ে সরাসরি মস্তিষ্কের আবেগ ও স্মৃতির প্রধান কেন্দ্র ‘হিপোক্যাম্পাস’ এবং ‘অ্যামিগডালা’য় পৌঁছে যায়। এই সরাসরি ও সরাসরি যোগাযোগের ফলেই কোনো সুপরিচিত গন্ধ নাকে পৌঁছালে মস্তিষ্ক তা নিয়ে যুক্তিসংগত চিন্তাভাবনা করার আগেই মনে গভীর এক আবেগ বা স্মৃতি সজীব হয়ে ওঠে।
প্লস বায়োলজির এই গবেষণায় স্নায়ুবিজ্ঞানীরা মস্তিষ্কের ঘ্রাণকেন্দ্রের এক অদ্ভুত কারিগরি উদ্ঘাটন করেছেন, আর তা হলো ‘গ্র্যানিউল কোষ’। সহজ কথায় বলতে গেলে, এই বিশেষ কোষগুলোকে আমাদের মস্তিষ্কের ঘ্রাণ কাঠামোর ‘স্মৃতি সংগ্রাহক’ বা আর্কিভিস্ট বলা চলে। জন্মের পর থেকেই শিশুর মস্তিষ্কের ঘ্রাণপ্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রে অত্যন্ত সূক্ষ্ম অথচ অসাধারণ দীর্ঘ জীবনকালের এই গ্র্যানিউল কোষগুলো তৈরি হতে শুরু করে। মস্তিষ্কের অন্যান্য অনেক কোষ যেখানে সময়ের সঙ্গে বদলে যায় বা নতুন রূপ নেয়, সেখানে এই কোষগুলো দশকের পর দশক ধরে প্রায় অপরিবর্তিত অবস্থায় টিকে থাকতে পারে। শৈশবের এই দিনগুলোতে যখনই কোনো তীব্র, আনন্দদায়ক বা আবেগময় গন্ধ নাকে পৌঁছায়, এই গ্র্যানিউল কোষগুলো তৎক্ষণাৎ সক্রিয় হয়ে ওঠে। এরা সেই ঘ্রাণকে ঘিরে মস্তিষ্কে অত্যন্ত শক্তিশালী ও স্থায়ী স্নায়বিক সংযোগ (নিউরোনাল নেটওয়ার্ক) তৈরি করে ফেলে।
শৈশব-কৈশোর হলো মানুষের অনুভূতির প্রথম পাঠশালা। শৈশবে আমরা অনেক গন্ধই জীবনে প্রথমবারের মতো অনুভব করি। যেমন, মায়ের হাতের সুস্বাদু রান্নার সুবাস, প্রথম বৃষ্টির ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধ, কিংবা নতুন বইয়ের ঘ্রাণ, কিংবা কাউকে প্রথম দেখে মন ভালো হয়ে যাওয়ার সেই অনাবিল শিহরণ। মস্তিষ্কের প্রাকৃতিক নিয়ম হলো, যেকোনো প্রথম অভিজ্ঞতার স্নায়বিক ছাপ বা স্মৃতি অনেক বেশি শক্তিশালী ও দীর্ঘস্থায়ী হয়। বয়স বাড়ার পর বহু বছর কেটে গেলেও যখন আমরা সেই একই গন্ধ আবার পাই, তখন গ্র্যানিউল কোষগুলোতে সুপ্ত থাকা পুরোনো নিউরোনাল নেটওয়ার্ক মুহূর্তের মধ্যে সচল হয়ে ওঠে। আমরা যেন ঠিক সেই শৈশবের দিনটিতেই ফিরে যাই।
তবে প্রশ্ন জাগতে পারে, বিবর্তনের ধারায় মানুষের ঘ্রাণশক্তি ও স্মৃতির মাঝে এমন নিবিড় ও সরাসরি যোগাযোগ গড়ে ওঠার কারণ কী? বিখ্যাত স্নায়ুবিজ্ঞানীরা এই প্রশ্নের বিবর্তনীয় ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে উল্লেখ করেছেন যে স্নায়ুবিজ্ঞান গন্ধের স্মৃতি জাগিয়ে তোলার ক্ষমতার পেছনের যে কার্যপ্রণালি উন্মোচন করেছে, তার উৎপত্তি মূলত বিবর্তনগত। স্নায়ুবিজ্ঞানী সন্দ্বীপ দত্তের মতে, আমাদের প্রাচীন পূর্বপুরুষেরা যখন বনে-জঙ্গলে ঘুরে বেড়াতেন, তখন চারপাশের মানচিত্র তৈরিতে এবং তারা কোথায় কোথায় গিয়েছিলেন তা মনে রাখতে মূলত গন্ধের ওপর নির্ভর করতেন। বেঁচে থাকার তাগিদে, খাদ্যের সন্ধান পেতে কিংবা শিকারির হাত থেকে বাঁচতে গন্ধ চেনা ছিল অপরিহার্য।
প্রকৃতপক্ষে, আমরা মানুষের আদি মস্তিষ্ককে ঘ্রাণশক্তি, দিকনির্দেশনার অনুভূতি এবং স্মৃতিশক্তির এক নিখুঁত সমন্বয় হিসেবে ভাবতে পারি। আদিম মানুষের কাছে কোনো স্থানের গন্ধ মানেই ছিল সেই জায়গার ভৌগোলিক পরিচিতি ও স্মৃতির সংযোগ। বিবর্তনের সেই প্রাচীন সংযোগ ধরে রাখার কারণেই আজ পর্যন্ত মস্তিষ্কের এই সমস্ত কাঠামো এত গভীরভাবে সংযুক্ত রয়ে গেছে এবং গন্ধের স্মৃতি আমাদের মনে এত তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।
২০২৬ সালের আধুনিক ভার্চুয়াল বাস্তবতা কিংবা ডিজিটাল অভিজ্ঞতার ভিড়ে ঘ্রাণশক্তির এই অলৌকিক ক্ষমতা আমাদের মনে করিয়ে দেয় মানবদেহের এক চিরন্তন সৌন্দর্যের কথা। এটি কেবল গবেষণাগারের বিজ্ঞান নয়, এটি আমাদের আবেগময় অস্তিত্বের মূল ভিত্তি। নির্জন কোনো বিকেলে এক চিলতে বকুল ফুলের গন্ধ যখন নাকে ভেসে আসে, অথবা বেলি ফুল পরা কাউকে হেঁটে যেতে দেখলে কি যেন মনে পড়ে যায়, তখন বিজ্ঞান ও অনুভূতি একসঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।
মন তখন বর্তমানের সব ব্যস্ততা ভুলে মুহূর্তের ডুবে যায় ছেলেবেলায় কাটানো দিনগুলোতে। যেমন, আমার বেলায় হারিয়ে যাই বকুলগাছগুলোর পাশে মেরিনের ছোট্ট সেই পথে। ঘ্রাণ হলো মানুষের মস্তিষ্কের সেই সুপ্ত টাইমমেশিন, যা আমাদের অজান্তেই অতীত ও বর্তমানকে এক সুতোয় বেঁধে রাখে। বিজ্ঞান ও শিল্পকলার ব্যাখ্যাকার জ্যাকব ব্রনোওস্কির ভাষায়—‘ভুলে যাওয়ার বিরুদ্ধে স্মৃতিকে ধরে রাখাই সভ্যতার সবচেয়ে বড় সংগ্রাম।’ অতীতের স্মৃতি আর বর্তমানের অনুভূতির সংযোগকারী এই সুতোটা ঠিক কতটা শক্ত অথচ নমনীয়, তার ওপরই নির্ভর করে আমাদের মানবিক মূল্যবোধ ও সভ্যতার গাঁথুনি কতটা ভারসাম্যপূর্ণ এবং সুন্দর হয়ে উঠবে। ঘ্রাণের হাত ধরে অতীতে ফিরে যাওয়ার এই আবেগময় ব্যাকুলতাই আধুনিক প্রযুক্তির যুগে আমাদের হৃদয়কে স্পন্দিত রাখবে।
আসিফ, বিজ্ঞান বক্তা ও সম্পাদক, মহাবৃত্ত