অর্থনীতিই আসল, অন্য জিনিস ওপরের দৃশ্য। চীন, রাশিয়ার শাসকদের দোষ এটা নয় যে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে তারা গণতন্ত্রী বানিয়েছে। অপরাধ এটা যে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থাটিকে তারা পুঁজিবাদের পথে নিয়ে গিয়েছে। ওপরের আচ্ছাদনটা গণতন্ত্রের, ভেতরের কারসাজি—সবটাই পুঁজিবাদের। তার ফলে একসময় যেসব ব্যাধি একেবারেই অকল্পনীয় ছিল, সেগুলো সেখানে দোর্দণ্ড প্রতাপে তৎপরতা শুরু করে দিয়েছে। বেকারত্ব ও মাদকাসক্তি দেখা দিয়েছে। নারীকে পণ্য করে তুলবার পুঁজিবাদী কীর্তিকলাপ আর কোনো বাধা মানছে না। পৃথিবীর মধ্যে সেরা বলে একদা কথিত রাষ্ট্র গ্রেট ব্রিটেন, সারা পৃথিবীর ওপর কর্তৃত্ব করে বেরিয়েছে সে এক সময়ে, খোদ আমেরিকার ওপরও। কর্তৃত্ব অর্থ অন্য কিছু নয়, লুণ্ঠন। এখন সেখানে মন্ত্রীরা কেবল যৌন কেলেঙ্কারি নয়, অর্থ কেলেঙ্কারিতেও জড়িয়ে পড়ছে। ধনসম্পদে জাপান মনে হয় শিগগিরই সবাইকে ছাড়িয়ে যাবে, সেই জাপানের প্রধানমন্ত্রীরাও ঘুষ খায়। ভারতে বিজেপি যে অত নাচানাচি করে, সেটা যে ধর্মের জোরে, তা নয়। আসলে টাকার জোরে। ধনীদের একাংশই তাদের চাঙা রাখছে কংগ্রেসের বিকল্প হিসেবে। কংগ্রেস যদি না পারে, তবে বিজেপি আসুক, বামপন্থীরা যেন কিছুতেই না আসে, সেটাই ছিল লক্ষ্য। ভারতীয় ধনীদের দৃষ্টিভঙ্গি এটাই। সোভিয়েত ইউনিয়ন গেছে বটে, কিন্তু বামের ভয় কাটেনি। কোনো ধনী দেশেই নয়।
মাস্তান ও মৌলবাদী, উভয়েই পুঁজিবাদের হাতে পুষ্ট। পুঁজিবাদ যে বেকারত্ব, হতাশা ও আগ্নেয়াস্ত্রের সহজলভ্যতা সৃষ্টি করে মাস্তানি তার দ্বারাই পুষ্ট হয়। সেটা তো বোঝা গেল, কিন্তু মৌলবাদ? তার সঙ্গে পুঁজিবাদের সম্পর্কটা কী? পুঁজিবাদ আধুনিক, মৌলবাদ সনাতন, আধুনিক পুঁজিবাদ কেন সনাতন মৌলবাদকে সমর্থন করতে যাবে? সেটা একটা প্রশ্ন বটে। এককালে কমিউনিজমের ভয় ছিল, তখন এটা কোনো লুকোছাপার ব্যাপার ছিল না যে আমেরিকানরা কমিউনিজমকে রুখবার জন্য মৌলবাদীদের সাহায্য করত, আফগানিস্তানে যেমনটা করেছিল কিছুটা উগ্রভাবে। ওই নাটকই বিভিন্নভাবে অভিনীত হতো নানা দেশে। তা তখন করত, কিন্তু এখন করতে যাবে কেন, এখন আবার কিসের ভয়? কিন্তু এখনো করে। মধ্যপ্রাচ্যের ধনী দেশগুলো মৌলবাদীদের মদদ দিতে কার্পণ্য করছে না। এটা জানা কথা, কিন্তু যেটা আরও একটু গভীরের ব্যাপার, সেটা হলো পুঁজিবাদের সঙ্গে মৌলবাদের স্বার্থগত যোগাযোগ। মৌলবাদীরা চায় মানুষকে পেছনের দিকে ঠেলে দিতে। সেটাই ব্যবসা তাদের। পুঁজিবাদীরাও চায় মানুষ পেছনেই থাকুক। দেখতে চায় মানুষ যাতে জেগে না ওঠে, বিদ্রোহ না করে। পুঁজিবাদ যে কারাগার সৃষ্টি করেছে, তাতে বন্দী মানুষের মনে অসহায়ত্ব ও হতাশার বিকাশ ঘটছে। হতাশ মানুষ নেশা করে। মৌলবাদও নেশাই এক প্রকারের। উগ্র নেশা। পুঁজিবাদীরা বরং এই নেশাকে পছন্দ করবে, বিপরীত প্রবণতার বিরুদ্ধে। বিপরীত প্রবণতাটা হচ্ছে রুখে দাঁড়ানো, কারাগারটাকে ভেঙে ফেলবার আহ্বান জানানো। ওই কাজটা বামপন্থীরা করে। পুঁজিপন্থীরা বামপন্থীদের প্রশ্রয় দেবে কেন? হোক, আরও নেশাগ্রস্ত হোক মানুষ, এটাই চাইবে তারা। নেশাখোরেরা অনেক কিছু করে, কিন্তু ব্যবস্থাকে ভাঙে না। তাদের কাছ থেকে আর যারাই থাক, কোনো আশঙ্কা নেই বিপদের।
মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তৃতায় একটা কথা খুব ভালো বলেছিলেন, সেটা হলো তথাকথিত গণতন্ত্রী বিশ্বের দুমুখো নীতি। তারা ঘরে এক রকম, বাইরে আরেক রকম। তবে সত্য এটাও যে এমনকি ঘরেও তারা দুমুখো। কালোদের তো ঘৃণা করেই, এমনকি সাদাদের মধ্যে গরিব যারা তাদেরও ভালোবাসে না। তবে রোগটা, ওই যে বললাম, গণতন্ত্রের অবদান নয়, অবদান সে পুঁজিবাদের।
এই দুমুখো নীতির শিকার হয়ে ফিরেছে আমার পরিচিত এক যুবক, তার যৌবন ও আশা-ভরসা সব হারিয়ে। ছিল ওই দেশে, পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে ধনী যে দেশ, সবচেয়ে শক্তিশালী গণতন্ত্র যেখানে বিদ্যমান, সারা বিশ্বের মানবাধিকারের পুলিশ হিসেবে কর্তব্যরত যে দেশ, সেই আমেরিকায়। নিজের অভিজ্ঞতার কাহিনি বলতে গিয়ে প্রায় কেঁদেই ফেলছিল সে। চোখে পানি দেখতে পাচ্ছিলাম আমি। প্রথমে কানাডায় গেছে, উচ্চশিক্ষার জন্য। সেখানে এমএ করল। ভালো করেছে, তাই স্কলারশিপ নিয়ে পিএইচডি করতে পারবে, এমন আশার সৃষ্টি হলো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত স্কলারশিপটা পেল না। কেউ বলেনি তাকে কারণটা কী। যে বিভাগে পড়ছিল সেখান থেকে সুপারিশ গেছে, বাতিল হয়ে গেল ওপরে গিয়ে।
কানাডা ছেড়ে আমেরিকায় এল। ভাবল এই মুক্ত দেশে থেকে ওই উচ্চ ডিগ্রিটা সেরে নিলে চাকরি পাবে। এখানেও স্কলারশিপের সমস্যা, কেননা এখানে তার আগমনটাই ছাত্র হিসেবে নয়, ভিজিটর হিসেবে। এদিকে-সেদিকে কাজ করে আরেকটা এমএ ডিগ্রি নিল সে। যদি চাকরিতে সুবিধা হয় এবং চাকরি করে উচ্চতর শিক্ষা নিতে পারে, এর পরে আরও ভালো চাকরি পায়, এই আশায়।
ডিগ্রি হলো, চাকরি হলো, তবে খণ্ডকালীন, পূর্ণ সময়ের নয়। কেননা, তার কাছে বৈধ কাগজপত্র নেই। জিজ্ঞাসা করলে কবে এসেছে, কেমন করে এসেছে তা বলতে পারছে না। দুটো উপায় ছিল। এক. রাজনৈতিক আশ্রয় চাওয়া। দুই. অনেক আগে এসেছে এটা প্রমাণ করা। দুটোই সম্ভব ছিল করা। টাকা খরচ করলে এসব কাজ সম্ভব ওখানে। লোক আছে সাহায্য করার। কিন্তু নিজের ভেতরে দুটোর কোনোটাতেই সায় পায়নি সে, নির্জলা মিথ্যা কথা বলতে হবে বলে। অতিষ্ঠ হয়ে চলে এসেছে। ৯ বছর নষ্ট করে অনেক অভিজ্ঞতা নিয়ে, তবে সম্পূর্ণ বেকার অবস্থাতে। আমেরিকাতে তার যারা সম্ভাব্য নিয়োগকর্তা, তারা বলেছে, হ্যাঁ, তার যোগ্যতা আছে, কিন্তু তাকে তারা নিয়োগ দিতে পারছে না, অসুবিধা রয়েছে। অসুবিধা কী তারা বলেনি। সে বুঝেছে। সেটা হলো এই যে সে কাগজপত্র সংগ্রহ করতে পারেনি। আমেরিকার নীতি ওই রকমই দুমুখো। নিজেদের লোকদের একভাবে দেখে, ভিন্ন দেশের লোকদের দেখে অন্যভাবে। যোগ্য হলেও যোগ্য মনে করে না। ঠকায়, কম বেতন দেয়, ব্ল্যাকমেল করে।
সন্দেহ নেই যে শাসনের যত ব্যবস্থা রয়েছে, তার মধ্যে গণতন্ত্রই শ্রেষ্ঠ। তবে প্রকৃত গণতন্ত্র হওয়া চাই, মেকি নয়। ভুয়া নয়, যথার্থ। যে সমাজে নিপীড়ন আছে, বড় বড় বৈষম্য আছে মানুষে মানুষে, সেখানে ওই গণতন্ত্র সম্ভবপর নয়। গণতন্ত্র তো আসলে লক্ষ্য নয়, লক্ষ্য হচ্ছে উন্নত, স্বাভাবিক, পরিচ্ছন্ন জীবন; বাগানের জীবন, জঙ্গলের নয়। গণতন্ত্র একই সঙ্গে ওই উন্নত জীবনের উপায় ও প্রতিফলন। পুঁজির শাসন জঙ্গলের সৃষ্টি করে, তার সমস্ত অগ্রগতি, উদ্ভাবন, উন্নয়ন সত্ত্বেও। তেমন জঙ্গলে উন্নত জীবনের জন্য আবশ্যক যে গণতন্ত্র তাকে পাওয়া যায় না।
গণতন্ত্র ওপর থেকে আসবে না। আসবার বিষয়ও নয়। ওপর থেকে যা আসে, তা হচ্ছে পুঁজির শাসন, আসে স্বৈরতন্ত্র, আসে আমলার শাসন। গণতন্ত্রকে ভেতর থেকেই গড়ে তুলতে হবে। গণতন্ত্রীরাই গড়বে। প্রকৃত গণতন্ত্রীরা, অর্থাৎ যারা বৈষম্যবিরোধী তারা।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়