নদীমাতৃক দেশগুলোর মানুষ হয় সহজ-সরল ও কোমল প্রকৃতির। জলের সঙ্গে হৃদয়ের একটি রহস্যময় যোগ আছে। একটি চমৎকার স্নান দূর করতে পারে উদ্বেগ ও দুঃশ্চিন্তা। জলের স্পর্শে রাগ কমে যায় এবং অলসতা কেটে যায়।
জলের বিস্ময়কর গঠনের কারণে জলও প্রভাবিত হয় মানুষের আবেগ ও চিন্তা দ্বারা। জলের দিকে তাকিয়ে, জলের পাত্র হাতে নিয়ে তাতে আবেগ ও চিন্তা সঞ্চার করা যায়। ফুঁ দিলে জলের আণবিক কাঠামো বদলে দেওয়া যায়। তাই ‘পানি পড়া’ যে জানে, তা তার কাছে কুসংস্কার নয়।
জল শুধু দৈহিক তৃষ্ণা নিবারণ করে না, আত্মিক তৃষ্ণাও নিবারণ করে এবং নতুন জীবন দান করে।
জল যেমন কঠিন, তরল ও বায়বীয় রূপ ধারণ করতে পারে মানুষও তেমনি। কিছু মানুষ বরফের মতো শীতল। কিছু মানুষ তরল। কিছু মানুষ ভেসে বেড়ায় আকাশে মেঘের মতো। কিছু মানুষ আকাশ থেকে অবতীর্ণ হয় বৃষ্টির মতো।
অস্থির চিত্ত ঘোলাজলের মতো। ঘোলাজল যেমন পান করা যায় না, তেমনি অস্থির চিত্তে সম্যক সিদ্ধান্তও নেওয়া যায় না। জল যেমন অপেক্ষা করলে স্বয়ং শোধিত হয়, তেমনি চিন্তাও অপেক্ষা করলে স্বয়ং শোধিত হয়। সাধক জলের মতো নরম, নরম হওয়া দুর্বলতা নয়; নরম হওয়া মানে জলের দুর্দমনীয় স্বভাব অর্জন করা—আচরণে কোমল, স্বরে মৃদু, স্বভাবে শান্ত, ব্যবহারে অনুগ্র, চিন্তায় একাগ্র, প্রবৃত্তিতে স্নেহ, হৃদয়ে প্রেম, আর শাসনে সকাল বেলার রোদের মতো স্নিগ্ধতা অর্জন। ‘জলে জ্যোতি প্রতিষ্ঠিত, জ্যোতিতে জল প্রতিষ্ঠি’, তাই ‘সরস্বতী’ শব্দের দুটি অর্থ: সরস + বতী = সরস্বতী অর্থ জ্যোতির্ময়ী। অন্যদিকে, সৃ ধাতু নিষ্পন্ন করে সর শব্দের অর্থ জল, অর্থাৎ যাতে জল আছে তাই সরস্বতী।
মানবজীবনে জল থেকে অগ্নি উৎপন্ন হয় জ্ঞান চর্চায়। অন্ধকার থেকে আলোর জগতে এবং মৃত্যু থেকে অমৃতে যাওয়ার পথ হলো জ্ঞান। সরস্বতী শুক্লবর্ণা। জ্ঞানদান করেন বলে তিনি জ্ঞানদায়িনী। সরস্বতীর বাহন শ্বেতহংস। রাজহাঁস অসার ফেলে সার গ্রহণ করার প্রতীক। দুধ ও জলের মিশ্রণ থেকে রাজহাঁস জল ফেলে দুধটুকু গ্রহণ করে। তাৎপর্য: জগৎ থেকে অসার পরিহার করে যিনি সার গ্রহণ করতে পারেন, তিনিই জ্ঞান অর্জন করতে পারেন। বীণার সুর মধুর। জ্ঞানপথের যাত্রীদের মুখ নিঃসৃত বাক্যও যেন মধুর হয়। জীবনযাপন যার সংগীতময়, তার জলে প্রতিষ্ঠিত হয় জ্যোতি।