বরিশাল নগরীর ‘বনলতা বুক ক্যাফে’তে ৪ সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত হয় বিশেষ বিজ্ঞান বক্তৃতা—‘নিয়ান্ডারথাল থেকে হোমো স্যাপিয়েন্স: টিকে থাকা ও বিদায়ের গল্প’। ‘কসমিক কালচার’, ‘ডিসকাশন প্রজেক্ট’, ‘চন্দ্রদ্বীপ ডট কম’ ও ‘বনলতা বুক ক্যাফে’ যৌথভাবে এ আয়োজন করে। মূল বক্তব্যের পাশাপাশি শিশুদের জন্য একটি বিজ্ঞানভিত্তিক চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এ উদ্যোগের সুন্দর একটি দিক ছিল স্থানীয় বনলতা বইয়ের দোকানটিকে পাঠকদের কাছে নতুন করে পরিচিত করা। আয়োজনে প্রাগৈতিহাসিক প্রজাতি নিয়ান্ডারথালদের জীবনপ্রবাহ তুলে ধরতে গিয়ে আমার মনে সভ্যতার ভবিষ্যৎ অস্তিত্ব নিয়ে কিছু প্রশ্ন বারবার উঁকি দিয়েছিল।
দীর্ঘদিন ধরে পপ-কালচারে নিয়ান্ডারথালদের ছবি আঁকা হয়েছে এক স্থূল, রুক্ষ ও বুদ্ধিহীন ‘গুহামানব’ হিসেবে। কিন্তু আধুনিক প্রত্নতত্ত্ব, নৃতত্ত্ব এবং প্যালিওজেনোমিকস বা প্রাচীন জিনোম গবেষণা সেই ভুল ধারণা ভেঙে দিয়েছে। বক্তব্যে আমি তুলে ধরার চেষ্টা করেছি, নিয়ান্ডারথালরা কেবল প্রতিকূল ইউরোপীয় হিমযুগীয় পরিবেশে কোনো রকমে টিকে থাকা প্রজাতি ছিল না। তারা ছিল অত্যন্ত সংবেদনশীল, সামাজিক ও বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন এক মানবগোষ্ঠী। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের গভীরে তাকালে দেখা যায়, নিয়ান্ডারথাল সমাজে অসুস্থ ও আহত সদস্যদের বছরের পর বছর যত্নসহকারে বাঁচিয়ে রাখার প্রমাণ রয়েছে। ছিল মৃতদেহের প্রতি যত্নশীল আচরণ, পুষ্পাঞ্জলি বা প্রতীকী সৎকারের চিহ্ন এবং গুহাচিত্র ও অলংকারের মতো নান্দনিক প্রকাশ। মা ও শিশুর নিবিড় স্নেহের বন্ধন কিংবা প্রবীণদের অভিজ্ঞতা থেকে যুবকদের শেখার ধারাবাহিকতা আমাদের নতুন বার্তা দেয়। এটি প্রমাণ করে, মানবীয় মূল্যবোধ ও অনুভূতির সূচনা কেবল আমাদের অর্থাৎ হোমো স্যাপিয়েন্সদের একক আবিষ্কার নয়।
বিজ্ঞান আমাদের অতীত দেখার দৃষ্টিভঙ্গি পুরোপুরি বদলে দেয়। বক্তব্যে আধুনিক জিনোম বিশ্লেষণের অনেক তথ্যই আলোচনায় এসেছিল। আফ্রিকার বাইরে বসবাসকারী প্রতিটি আধুনিক মানুষের ডিএনএতে আজও ১ থেকে ২ শতাংশ নিয়ান্ডারথাল জিন টিকে রয়েছে। এটি প্রমাণ করে, হাজার হাজার বছর আগে এই দুই প্রজাতি একে অপরের মুখোমুখি হয়েছিল এবং তাদের মধ্যে আন্তপ্রজনন ঘটেছিল। সাইবেরিয়ার ডেনিসোভা গুহার প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার সেই ক্যানভাসকে আরও বিস্তৃত ও বিস্ময়কর করে তুলেছে। সেখানে দেখা যায়, নিয়ান্ডারথাল, ডেনিসোভান এবং হোমো স্যাপিয়েন্সরা পাশাপাশি বিচরণ করত। এর অর্থ হলো, মানববিবর্তনের ইতিহাস কোনো সোজা বা সরল পথ ছিল না। এটি ছিল বহু ডালপালায় বিস্তৃত এক জটিল ও সমৃদ্ধ নেটওয়ার্ক।
তবে এই বৈজ্ঞানিক সত্যের সবচেয়ে করুণ অধ্যায়টি শুরু হয় প্রায় ৪০ হাজার বছর আগে। সে সময় পৃথিবী থেকে নিয়ান্ডারথালরা চিরতরে হারিয়ে যায়। শ্রোতাদের সামনে এই প্রশ্নটিই তুলে ধরা হয়েছিল, পরিবেশের সঙ্গে অভিযোজিত থাকার পরেও শক্তিশালী ও বুদ্ধিমান একটি প্রজাতি কেন বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল? বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে উঠে আসে একাধিক কারণ ছিল। আকস্মিক জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশগত চাপ, ক্ষুদ্র জনসংখ্যা এবং জিনগত দুর্বলতা এর অন্যতম কারণ ছিল। এর পাশাপাশি ছিল নানা মহামারি। সর্বোপরি, আমাদের পূর্বপুরুষ হোমো স্যাপিয়েন্সদের বিস্তার এবং সম্পদ দখলের প্রতিযোগিতাও তাদের বিলুপ্তিকে ত্বরান্বিত করেছিল।
নিয়ান্ডারথালদের এই বিলুপ্তির ইতিহাস কেবল অতীতের কোনো বৈজ্ঞানিক তথ্য নয়, এটি আধুনিক মানুষের ভবিষ্যতের জন্য এক চরম সতর্কবার্তা।
প্রশ্নোত্তর পর্বে কেউ কেউ প্রশ্ন করেন, এত সংবেদনশীল আর পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া একটি প্রজাতি কেন এভাবে হারিয়ে গেল? আজ আমরা হোমো স্যাপিয়েন্সরা নিজেদের পৃথিবীর সবচেয়ে বুদ্ধিমান ও সফল প্রজাতি বলে দাবি করি। কিন্তু আমাদের এই বুদ্ধিমত্তা আর প্রযুক্তি কি সত্যিই আমাদের দীর্ঘমেয়াদি অস্তিত্বের নিশ্চিত নিরাপত্তা দিতে পারছে?
আজ আমরা এমন এক যুগে বাস করছি, যাকে বিজ্ঞানীরা বলছেন ‘অ্যানথ্রোপোসিন’ বা মানবকেন্দ্রিক যুগ। একদিকে আমাদের হাতে রয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মহাকাশ অভিযান ও জিন প্রকৌশলের মতো প্রযুক্তি। অন্যদিকে এই প্রযুক্তির অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার আর আমাদের অপরিণামদর্শী আচরণের ফলেই দ্রুত বাড়ছে বিশ্ব উষ্ণায়ন, ধ্বংস হচ্ছে পরিবেশ আর ঘনিয়ে আসছে পারমাণবিক যুদ্ধের অশনিসংকেত। প্রায় ৪০ হাজার বছর আগে নিয়ান্ডারথালরা হয়তো জলবায়ুর প্রাকৃতিক পরিবর্তন কিংবা জনসংখ্যার সংকটে পড়ে বিলুপ্ত হয়েছিল। কিন্তু আজকের হোমো স্যাপিয়েন্সরা কোনো প্রাকৃতিক শক্তি ছাড়াই নিজের বিলুপ্তির ফাঁদ নিজেই তৈরি করছে।
নিয়ান্ডারথালদের এই করুণ গল্প আমাদের শেখায়, প্রকৃতির বিচারে কোনো প্রজাতিই অমর বা অপরিহার্য নয়। কেবল বুদ্ধিমত্তা কিংবা প্রযুক্তি থাকলেই টিকে থাকা নিশ্চিত হয় না। টিকে থাকার জন্য সেই বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে যুক্ত হতে হয় পারস্পরিক সহমর্মিতা, প্রাকৃতিক ভারসাম্যের প্রতি শ্রদ্ধা এবং সুদূরপ্রসারী দূরদর্শিতা।
বিজ্ঞান, দর্শন, সমাজনীতি, ধর্মের ঘোর প্যাঁচে সেদিন বনলতা বুক ক্যাফের পরিবেশটা যেন কেমন হয়ে উঠেছিল। একটি সরু করিডরের দুপাশে বইয়ের সারি। মাঝে আলো-আঁধারিতে নিমগ্ন হয়ে বসে ছিলেন ৪৫ জন কৌতূহলী শ্রোতা। প্রতিজন ২৫০ টাকা দিয়ে এসে পুরো সময় মনোযোগ দিয়ে বক্তব্য শুনেছেন। প্রজেক্টরের পর্দায় ফুটে ওঠা প্রাগৈতিহাসিক দৃশ্যগুলোর দিকে মাঝে মাঝে তাঁরা বিস্ময়ে তাকাচ্ছিলেন। তরুণদের এই গভীর আগ্রহ আমাকে দারুণভাবে আলোড়িত করছিল। প্রশ্নোত্তর পর্বে একের পর এক প্রশ্ন আসতে থাকে। প্রায় ১০ জন শ্রোতা সরাসরি আলোচনায় অংশ নেন। খুব কম অভিজ্ঞতায় এমন প্রাসঙ্গিক ও গভীর প্রশ্ন পেয়েছি।
প্রাগৈতিহাসিক মানুষের যে করুণ সমাপ্তি ঘটেছিল, তার পাঠ যদি আমরা আজও অনুধাবন করতে না পারি, তবে আমাদের সব প্রযুক্তিগত অগ্রগতি অর্থহীন হয়ে পড়বে। এই ভাবনাটিই শ্রোতাদের প্রশ্ন থেকে বারবার উঠে আসছিল। প্রজাতি হিসেবে আমাদের টিকে থাকা নির্ভর করছে অতীত থেকে অর্জিত শিক্ষা এবং নিজেদের আত্মঘাতী আচরণ শুধরে নেওয়ার ওপর।