হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

ট্রেনের টিকিট: আসন কম, নাকি নিয়ন্ত্রণে গলদ

শোয়েব সাম্য সিদ্দিক

অনলাইনে টিকিট কেটেও অনেকে ট্রেনের আসন পান না। ছবি: হাসান রাজা

সামনে পূজার ছুটি। শহর ছেড়ে লাখো মানুষ তখন ছুটবেন গ্রামের বাড়ির পথে। তাঁদের বড় ভরসা ট্রেন। প্রতিবছরের মতো এবারও কেউ ভোরে কাউন্টারে দাঁড়াবেন, কেউ মোবাইল ফোন হাতে বসে বারবার টিকিট কাটার চেষ্টা করবেন। কিন্তু বিক্রি শুরুর কয়েক মিনিট পরই দেখা যাবে, টিকিট শেষ। তখন স্বাভাবিকভাবেই মনে হয়, আসন কম, চাহিদা বেশি। কিন্তু আসল প্রশ্নটা হলো, আসন কম বলেই কি টিকিট পাওয়া যাচ্ছে না? নাকি যে আসনগুলো আছে, সেগুলোর একটা অংশ সাধারণ যাত্রীর হাতে পৌঁছানোর আগেই কোথাও আটকে যাচ্ছে?

সরকারের পরিবহন অডিট অধিদপ্তরের আইটি অডিটে এই দ্বিতীয় আশঙ্কার কথাই এসেছে। রেলের অনলাইন টিকিটিং ব্যবস্থার পাঁচ অর্থবছরের কার্যক্রম দেখে অডিট ২২ ধরনের অনিয়মের আপত্তি তুলেছে। সম্প্রতি একটি প্রতিবেদনে সেগুলো প্রকাশ পেয়েছে। তিন প্রতিষ্ঠানের যৌথ উদ্যোগে নেতৃত্বে আছে সহজ ডটকম। একটি কথা এখানেই পরিষ্কার থাকা দরকার। জবাব ও যাচাইয়ের প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত কাউকে দোষী বলা যায় না। তবে আপত্তিগুলো এত গুরুতর যে ছুটির আগে চুপ করে থাকাও চলে না।

অডিটের বিবরণ বলছে, ড্যাশবোর্ড ব্যবহার করে সাধারণ ছাড়ের এক থেকে পাঁচ দিন আগেই, অর্থাৎ যাত্রার ১১ থেকে ১৫ দিন আগে, টিকিট আটকে রাখার সুযোগ আছে। স্টেশনে ভেন্ডরের প্রতিনিধি আর রেলের বুকিং সহকারীর যোগসাজশে যেকোনো রুটের টিকিট কালোবাজারে চলে যাওয়ার ফাঁকও আছে। শতাধিক স্টেশনের অ্যাডমিন অ্যাকাউন্ট চলছে ভেন্ডরের কর্মীদের হাতে। অথচ চুক্তি অনুযায়ী তাঁদের কাজ কেবল যন্ত্র আর নেটওয়ার্কের রক্ষণাবেক্ষণ। টিকিট বিক্রি, কোটা সমন্বয় বা আসন আটকানোর কাজ রেলের নিজস্ব কর্মীর। ফলে ভোগান্তি কোনো একটি রুটের নয়। রাজশাহী, খুলনা, সিলেট, চট্টগ্রাম—সব পথের যাত্রীই একই ব্যবস্থার ভেতর দিয়ে টিকিট কাটেন।

সমস্যা যে নতুন নয়, তার প্রমাণ ২০২২ সালেই মিলেছিল। টিকিটের টাকা কেটে নেওয়ার পরও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মহিউদ্দিন রনি আসন না পেয়ে শিকল পরে কমলাপুরে অবস্থান নিয়েছিলেন। জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর অভিযোগের সত্যতা পেয়ে সহজ ডটকমকে ২ লাখ টাকা জরিমানা করে, যদিও হাইকোর্ট পরে তা স্থগিত করেন। অনলাইনে কোটায় টিকিট ব্লক করা বা বুক করা বন্ধ করা এবং অফলাইন-অনলাইনে টিকিট কেনার ক্ষেত্রে সর্বসাধারণের সমান সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা—সেদিন যে দাবি উঠেছিল, চার বছর পর অডিটের ভাষায় সেই দুর্বলতাই ফিরে এসেছে। অর্থাৎ আশ্বাস ছিল, কিন্তু মাপার মতো কোনো সূচক বা সময়সীমা ছিল না।

প্রণোদনার দিকটাও ভাবার মতো। অডিটের বরাতে সেবাদাতা প্রতি টিকিটে পান মাত্র ২০ পয়সা। সহজের নিজের দাবি অনুযায়ী তারা দিনে ৮০ হাজার থেকে ১ লাখের বেশি টিকিট বিক্রি করে। চার মাসে ১ কোটি টিকিট ধরলে বৈধ আয় দাঁড়ায় প্রায় ২০ লাখ টাকা। এটি আমার অনুমান, তবু বলা যায়, এত সামান্য আয়ের পাশে যদি আসন আটকে রাখার ক্ষমতা থাকে, তাহলে কড়া নজরদারি ছাড়া ঝুঁকি বাড়ে। চুক্তিতে প্রতিটি লঙ্ঘনে ৫ হাজার টাকা জরিমানার বিধান আছে। অডিট বলছে, একটি জরিমানাও আরোপ হয়নি। যে ধারা প্রয়োগ হয় না, সে ধারা রেখে লাভ কী? কোনো লাভ নেই। অডিট আরও দেখিয়েছে, ভ্যাটের ঘাটতি ৩০ লাখ ২৭ হাজার ৯০২ টাকা আর রাজস্ব ক্ষতি ৮ কোটি ৫ লাখ টাকার বেশি। অনলাইন লেনদেনের হিসাব প্রতিদিন নিজে থেকে মিলে যাওয়ার কথা। না মিললে বুঝতে হয়, মিলিয়ে দেখার ব্যবস্থাটাই দুর্বল।

যাত্রীর তথ্যও ঝুঁকিতে। অডিটের ভাষ্য, প্রায় ২ কোটি ৮৯ লাখ সেবাগ্রহীতার তথ্য প্রশাসনিক অনুমোদন ছাড়াই বিদেশের একটি ক্লাউডে রাখা হয়েছে, নিজস্ব ডেটাসেন্টার বা দুর্যোগ পুনরুদ্ধার কেন্দ্রও নেই। ক্লাউড ব্যবহার নিজে অপরাধ নয়, অনুমোদন আর ঝুঁকি মূল্যায়ন ছাড়া করাটাই সমস্যা। তথ্য বিদেশে রাখা আর তথ্য পাচার হওয়া এক কথা নয়। দ্বিতীয়টি ঘটেছে কি না, তা স্বাধীন কারিগরি তদন্ত ছাড়া বলা যাবে না। ২০২৫ সালে নির্বাচন কমিশন নিজেই পাঁচ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এনআইডির তথ্য ফাঁসের প্রমাণ পাওয়ার কথা জানিয়েছিল। ঝুঁকিটা মূল সার্ভারের চেয়ে প্রান্তের সংযোগে বেশি।

এখন প্রশ্ন, এই ব্যবস্থায় সব রুটের যাত্রীরা কীভাবে ভোগে? মূল পথ চারটি—

প্রথমটি, টিকিট ছাড়ার আগেই আসন হারিয়ে যাওয়া। অডিটের বিবরণ অনুযায়ী আটকে রাখার সুযোগ ব্যবস্থার কেন্দ্রেই আছে, কোনো একটি রুটে সীমাবদ্ধ নয়। ফলে ছাড়ার মুহূর্তে সাধারণ যাত্রী যে সংখ্যার আসন পান, তা আসলে ঘোষিত সংখ্যার চেয়ে কম। যাত্রী তা জানেন না, কারণ ব্যবস্থাটি স্বচ্ছ নয়।

দ্বিতীয়টি, স্টেশনভিত্তিক যোগসাজশ। অডিট শতাধিক স্টেশনের অ্যাডমিন অ্যাকাউন্ট ভেন্ডরের কর্মীদের হাতে থাকার কথা বলেছে। চুক্তি অনুযায়ী টিকিট বিক্রি, কোটা সমন্বয় বা আসন সংরক্ষণের কোনো কাজ সহজের কর্মীদের করার কথা নয়। রেলের নিজস্ব কর্মী করবেন, ভেন্ডর শুধু যন্ত্র আর নেটওয়ার্ক সামলাবে। যেখানে এই সীমা মানা হয় না, সেখানে ছোট স্টেশনের যাত্রীও ঝুঁকিতে, বড় জংশনের যাত্রীও।

তৃতীয়টি, টাকা কাটা গেল অথচ আসন নেই। রনির নিজের অভিজ্ঞতা এ রকম ছিল। এর ক্ষতি দুই দিকে। যাত্রীর টাকা আটকে থাকে, আবার যে আসন বিক্রি হয়েছে বলে দেখানো হয়, তা অন্য কারও হাতে যাওয়ার সুযোগ পায় না।

চতুর্থটি, দালালের চড়া দাম। রেলের ভাড়া সরকার ঠিক করে, আসন নির্দিষ্ট, উৎসবের চাহিদা বহুগুণ। এই ফারাকটাই মধ্যস্বত্বভোগীর মুনাফা। যাঁর স্মার্টফোন নেই, যাঁর সময় নেই, যাঁর ব্যাংক হিসাব নেই, তাঁর কাছে একমাত্র পথ দালালের দ্বারস্থ হওয়া। ২০২৪ সালের অক্টোবরে রেলপথ উপদেষ্টাও প্রকাশ্যে স্বীকার করেছিলেন, অনেক সময় যাত্রীরা অনলাইনে নিজের গন্তব্যের টিকিট পান না এবং হতাশ হন। সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়েই সমস্যাটি স্বীকৃত ছিল।

এবার করণীয় বিষয়গুলোতে আসা যাক। আমার মতে, ছুটির আগে এমন কাজই করা উচিত, যাতে সেবা বন্ধ না হয়। কারণ এই সময়ে ব্যবস্থা অচল হলে ভোগান্তিতে পড়বেন যাত্রীরাই। লাইভ সার্ভারের নিয়ন্ত্রণ রেলের নিজস্ব কর্মীদের হাতে ফিরিয়ে দেওয়া যেতে পারে। ভেন্ডর শুধু রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করবে। কোনো টিকিট আটকে রাখতে হলে লিখিত কারণ ও দুই কর্মকর্তার অনুমোদন থাকতে হবে। নির্দিষ্ট সময় পর সেই আসন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সাধারণ বিক্রিতে চলে যাবে। প্রতিদিন কোন ট্রেনে কত আসন আটকে রাখা হলো, সেই তথ্যও প্রকাশ করতে হবে।

এক পরিচয়ে একই ট্রেনে চারটির বেশি টিকিট না দেওয়া, টিকিটে যাত্রীর নাম রাখা এবং ট্রেনে ওঠার সময় পরিচয় যাচাই করলে দালালদের দৌরাত্ম্য অনেকটাই কমবে। টাকা নিয়েও টিকিট বরাদ্দ না হলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে টাকা ফেরত দিতে হবে। আর কোন ট্রেনের টিকিট কত দ্রুত শেষ হলো, সেই তথ্য প্রকাশ করলে অস্বাভাবিক কিছু ঘটছে কি না, তা সহজেই বোঝা যাবে।

দীর্ঘ মেয়াদের কাজ আলাদা। তথ্য রাখতে হবে অনুমোদিত সরকারি ক্লাউডে বা দেশের ভেতরে একটি পূর্ণ কপিসহ, সঙ্গে থাকবে কার্যকর পুনরুদ্ধার কেন্দ্র। জরিমানা কাটার কাজ কর্মকর্তার বিবেচনায় না রেখে সফটওয়্যারে বেঁধে দেওয়া হোক, যৌথ উদ্যোগের সব অংশীদারের থাকুক সমান দায়। পাঁচ বছরের চুক্তির মেয়াদ ২০২৭ সালে ফুরোনোর আগেই নতুন দরপত্রের শর্ত ঠিক করা দরকার। যাত্রীর প্রতিনিধিদের নিয়ে স্থায়ী কমিটি থাকুক, যেখানে সভার সিদ্ধান্ত, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আর সময়সীমা প্রকাশ্যে থাকবে। সহজকে লিখিত জবাব দেওয়ার ন্যায্য সুযোগও দিতে হবে। প্রতিষ্ঠানটির বিপুল পরিমাণ টিকিট সামলানোর সক্ষমতা অস্বীকার করার নয়। জবাব সন্তোষজনক না হলে কঠোর ব্যবস্থা, সন্তোষজনক হলে ত্রুটি সারিয়ে নেওয়া। দুই পথেই লাভ যাত্রীর।

পূজার ছুটিতে বাড়ি ফেরা মানুষের জন্য টিকিট কোনো অনুগ্রহ নয়, অধিকার। সেই অধিকার ঘোষণায় নয়, নিয়ম মানা আর হিসাব খোলা রাখার ভেতর দিয়েই নিশ্চিত হয়।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও বিশ্লেষক