একটি পরিপত্রেই বহু ক্ষেত্রে এই অন্যায়ের অবসান সম্ভব। খরচ প্রায় শূন্য, সুফল অপরিসীম। যে নীতিনির্ধারকেরা মেধাভিত্তিক নিয়োগ, সুশাসন ও ডিজিটাল বাংলাদেশের কথা বলেন, তাঁদের কাছে প্রশ্ন এই যে রাষ্ট্রের ফরমে একজন নাগরিকের পরিচয় কি তাঁর জমির দলিলে, নাকি তাঁর নাগরিকত্বে? ঠিকানা থাকে মানুষের কাছে, কাগজের ভিটায় নয়।
খুলনার সোনাডাঙ্গার ভাড়া বাসায় ২০২১ সালের ডিসেম্বরে এক তরুণীর স্বপ্ন থমকে গিয়েছিল। মিম আক্তার নামের সেই তরুণী প্রায় ১২০০ প্রার্থীর মধ্যে মেধাক্রমে প্রথম হয়েছিলেন খুলনা জেলা পুলিশের কনস্টেবল নিয়োগ পরীক্ষায়। অনেক উত্তীর্ণকে ফোন করে জানানো হলো; কিন্তু ফোন এল না কেবল মিমের কাছে। খোঁজ নিতে গিয়ে তিনি শুনলেন, পুলিশ ভেরিফিকেশনে তাঁর ‘স্থায়ী ঠিকানা’ নিয়ে সমস্যা আছে। বাবা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী; ৩২-৩৩ বছর আগে বাগেরহাট ছেড়ে খুলনায় এসেছেন, কোথাও এক শতক জমিও নেই। তাই আবেদনের সঙ্গে জমা দিয়েছিলেন ভূমিহীন সনদ।
পুলিশ সুপারের ভাষ্যমতে, ঠিকানা গোপন করা হয়েছে এবং চোখের সমস্যার কারণেও প্রার্থিতা টেকেনি; পরিবার এ দাবি অস্বীকার করেছে। ঘটনার সত্যাসত্য তদন্তের বিষয়। কিন্তু হাইকোর্ট সেদিন যে প্রশ্ন তুলেছিলেন, তা আজও উত্তরহীন: সব প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও কেউ স্থায়ী ঠিকানা না থাকার কারণে চাকরি পাবেন না, এটা হতে পারে না। আদালত মনে করিয়ে দিয়েছিলেন, নদীভাঙনে প্রতিবছর শত শত পরিবার ভিটা ও আবাদি জমি হারিয়ে ‘ঠিকানাবিহীন’ হয়ে পড়ে। প্রশ্ন হলো, আদালতের সেই উষ্মার পরও ব্যবস্থাটি কেন বদলাল না? পাসপোর্ট করা থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় অনেক সেবা স্থায়ী ঠিকানা না থাকলে মেলে না। এমন ঘটনা অহরহ ঘটছে। দুই-একটি সামনে এলেও বহু ঘটনা দৃষ্টির আড়ালে থেকে যাচ্ছে।
ঠিকানা মানে মানুষ কোথায় বাস করেন, কোথায় তাঁকে পাওয়া যায়। মালিকানা মানে সম্পত্তির ওপর আইনি অধিকার। দুটি ধারণা সম্পূর্ণ আলাদা। অথচ আমাদের প্রশাসনিক চর্চায় ‘স্থায়ী ঠিকানা’ ক্রমে হয়ে উঠেছে ‘নিজের বা বাবার নামে বসতভিটা’র প্রতিশব্দ। চাকরির আবেদন, পুলিশ ভেরিফিকেশন, পাসপোর্ট, নাগরিক সনদ—সর্বত্র প্রশ্ন ঘুরেফিরে এক যে, গ্রামের বাড়ি কোথায়, জমি কার নামে? উত্তর ‘নেই’ হলে শুরু হয় সনদের জন্য ঘোরাঘুরি, অতিরিক্ত জবাবদিহি; কখনো শেষ হয় প্রত্যাখ্যানে।
এখানে একটি সূক্ষ্ম কথা স্বীকার করা দরকার। সাধারণ সরকারি চাকরিতে নিজস্ব জমি থাকতেই হবে, এমন সুস্পষ্ট বিধান আছে কি না, তা নিয়ে ব্যাখ্যা ভিন্ন ভিন্ন; বাহিনীর নিয়োগে শর্ত আরও কড়া বলে অভিযোগ আছে। বহু ক্ষেত্রে সমস্যাটি লিখিত আইনের চেয়ে ফরম, পরিপত্র আর মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তার অলিখিত চর্চার ফল। ঠিক এ কারণেই সমস্যাটি আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠে এ কারণে যে কোথাও স্পষ্ট লেখা নেই বলে একে চ্যালেঞ্জ করা কঠিন, আবার এড়িয়ে যাওয়াও কঠিন।
এই ধারণার প্রথম শিকার ভূমিহীন কৃষক ও তাঁদের সন্তানরা। তারপর আছেন ঢাকা, চট্টগ্রাম, রংপুর, রাজশাহী বা খুলনার ভাড়াটিয়া পরিবার, যাঁরা দুই-তিন প্রজন্ম ধরে শহরে বাস করছেন অথচ গ্রামের ভিটা অন্যের দখলে বা বণ্টনের অপেক্ষায়। আছেন নদীভাঙনে সর্বস্ব হারানো মানুষ, চরবাসী, বস্তিবাসী, অনাথ শিশু। আছেন বিবাহবিচ্ছিন্ন নারী, যাঁর বাবার বাড়ি ও শ্বশুরবাড়ি কোথাও ‘স্থায়ী’ হওয়ার দাবি টেকে না। আছেন পরিবার-পরিত্যক্ত তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ।
জলবায়ু পরিবর্তন সমস্যাটিকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। বিশ্বব্যাংকের গ্রাউন্ডসওয়েল প্রতিবেদনের প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশেই প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ থেকে ২ কোটির কাছাকাছি মানুষ জলবায়ুজনিত কারণে দেশের ভেতরে স্থান বদলাতে বাধ্য হতে পারে। যে দেশে এত মানুষকে ভিটা বদলাতে হয়, সেখানে ‘পৈতৃক ভিটা’কে নাগরিক যোগ্যতার মাপকাঠি করলে একটি ক্রমবর্ধমান অংশ নিজ দেশেই ‘অযোগ্য’ হয়ে পড়বে।
ক্ষতিটি কেবল একটি চাকরি হারানোর নয়। একজন তরুণ বছরের পর বছর পড়াশোনা আর পরীক্ষার ধকল পেরিয়ে শেষ ধাপে এসে যখন জানেন, তাঁর অপরাধ ‘জমি না থাকা’, তখন তিনি শিখে ফেলেন যে রাষ্ট্র মেধার চেয়ে মালিকানাকে বেশি মূল্য দেয়। ভূমিহীন সনদ জমা দেওয়াটাই যেন নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য—এই অপমান পরিবারের স্মৃতিতে থেকে যায়। পাসপোর্টের ক্ষেত্রে একই বিড়ম্বনা প্রবাসগামী শ্রমিকদের, যাঁদের পাঠানো অর্থে দেশের অর্থনীতি চলে, প্রাপ্য সেবাকে বিলম্বিত করে এবং দালালনির্ভরতা বাড়ায় বলে অভিযোগ আছে।
সংবিধানের ২৯(১) অনুচ্ছেদ প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ লাভে সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা নিশ্চিত করে; ২৯(২) অনুযায়ী কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারীপুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে কেউ অযোগ্য বিবেচিত হবেন না। ২৭ অনুচ্ছেদে সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান; ২৮(১)-এ রাষ্ট্র কেবল এসব কারণে বৈষম্য করতে পারে না।
‘জমি আছে কি না’ প্রশ্নটি আপাতদৃষ্টিতে নিরপেক্ষ। কিন্তু কার্যত এটি জন্মস্থান ও পারিবারিক সম্পদের প্রক্সি। যাঁর পরিবার ভিটা ধরে রাখতে পেরেছে, সুবিধা তাঁর; যাঁর পরিবার দরিদ্র, নদীভাঙন বা অভিবাসনে ভিটা হারিয়েছে, তিনি বঞ্চিত। আদালতের পরিচিত ‘যুক্তিসংগত শ্রেণিবিন্যাস’ পরীক্ষায় প্রশ্ন উঠবে—এই বিভাজনের সঙ্গে পদের যোগ্যতা বা রাষ্ট্রের নিরাপত্তার কি যুক্তিসংগত সম্পর্ক? জমির মালিকানা কোনো কনস্টেবলের সততা, কোনো শিক্ষকের দক্ষতা বা কোনো পাসপোর্টধারীর নাগরিকত্ব প্রমাণ করে না। উদ্দেশ্যের সঙ্গে যোগসূত্র না থাকায় এ ধরনের বিভাজন সাংবিধানিক পরীক্ষায় টিকবে না বলেই আশা করা যায়।
৩৬ অনুচ্ছেদে আরও সরাসরি বলা হয়েছে, প্রত্যেক নাগরিকের দেশের সর্বত্র অবাধ চলাফেরা এবং যেকোনো স্থানে বসবাস ও বসতিস্থাপনের অধিকার আছে। কাজের খোঁজে গ্রাম ছেড়ে শহরে বসতি গড়া নাগরিককে গ্রামের ভিটার প্রমাণ দিতে বাধ্য করার অর্থ সাংবিধানিক অধিকার প্রয়োগের জন্য শাস্তি দেওয়া। ৪০ অনুচ্ছেদে পেশার স্বাধীনতা, ১১ অনুচ্ছেদে মানবসত্তার মর্যাদা, ১৯ অনুচ্ছেদে সুযোগের সমতা—সবই একই দিকে ইঙ্গিত করে। আর ৭(২) অনুচ্ছেদ বলছে, সংবিধানের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ কোনো আইন ততখানি বাতিল হবে। পরিপত্র ও ফরম তো আইনেরও নিচের স্তরের; সেগুলো আরও সহজে প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।
সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, ভুক্তভোগীর হাতে কার্যকর প্রতিকারের পথ নেই। ভেরিফিকেশন-প্রতিবেদন সাধারণত গোপন থাকে; প্রার্থী জানতেই পারেন না ঠিক কোন কারণে তিনি বাদ পড়লেন। লিখিত কারণ না থাকলে আপিল করাও অসম্ভব। রিট মামলার খরচ, সময় আর আইনজীবী খোঁজার সামর্থ্য এমন পরিবারের থাকে না, যাঁদের ইতিমধ্যে জমি-ঠিকানা কিছুই নেই।
ফলে প্রতিকার মেলে প্রধানত তখনই, যখন ঘটনাটি সংবাদমাধ্যমে আসে এবং আদালত স্বতঃপ্রণোদিত হন। অর্থাৎ ন্যায়বিচার নির্ভর করছে সৌভাগ্য ও প্রচারের ওপর, নিয়মের ওপর নয়। একজন মিমের ঘটনা আলোচিত হয়; কিন্তু তাঁর পেছনে এমন আরও কত তরুণ নীরবে ঝরে পড়েন, তার কোনো হিসাব কোথাও নেই। যে ব্যবস্থায় প্রত্যাখ্যানের কারণ নথিভুক্ত হয় না, সেখানে বৈষম্যের মাত্রাও মাপা যায় না, আর যা মাপা যায় না, তা সংশোধনও করা যায় না।
অন্যান্য দেশ ঠিকানাকে মালিকানা থেকে আলাদা করেছে। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ১৯৮৫ সালে ওলগা টেলিস বনাম বোম্বে মিউনিসিপ্যাল করপোরেশন মামলায় বলেছিল, জীবনের অধিকারের মধ্যে জীবিকার অধিকারও অন্তর্ভুক্ত; ফুটপাতবাসীকেও উচ্ছেদের আগে ন্যায্য প্রক্রিয়া ও শুনানির সুযোগ দিতে হবে। এই রায় ঠিকানাহীন মানুষকে ‘অদৃশ্য’ নয়, অধিকারধারী নাগরিক হিসেবে দেখার ভিত্তি গড়ে দিয়েছে।
যুক্তরাজ্যে ১৯৮৩ সালের জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের ‘স্থানীয় সংযোগের ঘোষণা’র মাধ্যমে নির্দিষ্ট ঠিকানাহীন মানুষও ভোটার হতে পারেন—এমনকি পার্কের বেঞ্চ বা আশ্রয়কেন্দ্রের বিবরণ দিয়েও। ব্রাজিলে ১৯৮৩ সালের এক আইনের অধীনে নাগরিকের নিজের স্বাক্ষরিত আবাসের ঘোষণা সরকারি কাজে সত্য বলে গণ্য হয়; মিথ্যা প্রমাণিত হলে শাস্তির বিধান থাকে। শিক্ষা একটাই—ঠিকানা যাচাইয়ের উদ্দেশ্য ব্যক্তিকে শনাক্ত করা ও তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের পথ রাখা, তাঁর সম্পত্তির হিসাব নেওয়া নয়। এসব ব্যবস্থায় আস্থা রাখা হয় নাগরিকের সত্য ঘোষণার ওপর, আর মিথ্যার জন্য রাখা হয় কঠোর দায়।
কখনো আদালতের হস্তক্ষেপে, কখনো গণমাধ্যমের চাপে দু-একজন প্রতিকার পেয়েছেন। কিন্তু ব্যক্তিগত ত্রাণ কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। জনপ্রশাসন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যৌথ নির্দেশনায় স্পষ্ট করতে হবে, স্থায়ী ঠিকানা মানে জমি বা বাড়ির মালিকানা নয়; ভূমিহীনতা চাকরি, পাসপোর্ট বা অন্য রাষ্ট্রীয় সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে অযোগ্যতার কারণ হতে পারে না। চাকরি, পুলিশ ভেরিফিকেশন ও পাসপোর্টের ফরমে ‘বর্তমান ঠিকানা’ ও ‘আদি নিবাস’ আলাদা করতে হবে এবং জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মনিবন্ধন, ভোটার তথ্য, ভাড়ার চুক্তি, ইউটিলিটি বিল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা নিয়োগকর্তার প্রত্যয়নসহ একাধিক নথিকে ঠিকানা প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। যাচাই হবে পরিচয়, বসবাসের সত্যতা ও নিরাপত্তা নিয়ে—জমি, বংশ বা পৈতৃক ভিটা দিয়ে নয়। কোনো আবেদন বাতিল হলে লিখিত কারণ, দ্রুত আপিল এবং নির্ধারিত সময়ে সিদ্ধান্ত না হলে জবাবদিহির ব্যবস্থাও থাকতে হবে।
এই সংস্কারকে আইনি ভিত্তি দিতে বৈষম্যবিরোধী আইনে সম্পত্তি বা আবাসিক অবস্থার ভিত্তিতে বৈষম্য নিষিদ্ধ করা এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে এ ধরনের অভিযোগে কার্যকর ভূমিকা দেওয়া প্রয়োজন। প্রশাসন উদ্যোগ না নিলে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে জনস্বার্থে রিটের পথও খোলা থাকবে। একই সঙ্গে প্রতিবছর ঠিকানা-সংক্রান্ত যাচাইয়ে কতজন প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন, কী কারণে এবং আপিলে কতজন প্রতিকার পেয়েছেন—তার তথ্য প্রকাশ করা উচিত। কারণ, স্থায়ী সমাধান কোনো একজনের চাকরি ফিরিয়ে দেওয়া নয়; এমন ব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে নাগরিকের অধিকার তাঁর নিজের নামে কতটুকু জমি আছে তার ওপর নির্ভর করবে না।
একটি পরিপত্রেই বহু ক্ষেত্রে এই অন্যায়ের অবসান সম্ভব। খরচ প্রায় শূন্য, সুফল অপরিসীম। যে নীতিনির্ধারকেরা মেধাভিত্তিক নিয়োগ, সুশাসন ও ডিজিটাল বাংলাদেশের কথা বলেন, তাঁদের কাছে প্রশ্ন এই যে রাষ্ট্রের ফরমে একজন নাগরিকের পরিচয় কি তাঁর জমির দলিলে, নাকি তাঁর নাগরিকত্বে? ঠিকানা থাকে মানুষের কাছে, কাগজের ভিটায় নয়। মিমের মতো তরুণেরা ঠিকানা হারান না; হারিয়ে যায় তাঁদের প্রতি রাষ্ট্রের ফরম। সংসদ, প্রশাসন ও আদালত—এই তিন পক্ষই এ বিষয়ে ভূমিকা রাখতে পারে।
গবেষক ও সাংবাদিক