কোথাও কেউ অন্যায় বা অপরাধ করলে পুলিশ এসে তাকে পাকড়াও করে। আইন অনুযায়ী অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিচারক তাঁর শাস্তি নির্ধারণ করেন। রাস্তায় ছিনতাই হোক বা দুর্ঘটনা, পুলিশকে এসেই তো তাৎক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি সামলানোর কথা।
কিন্তু কখনো কি শুনেছেন, পুলিশকেই জনগণ ধরে শাস্তি দিচ্ছে? রাজশাহীর পুঠিয়ায় কিন্তু এমন একটি কাণ্ডই ঘটিয়েছে সেখানকার উত্তেজিত জনতা।
২৫ জানুয়ারি বিকেলে পুঠিয়ার পল্লাপুকুর এলাকায় রাজশাহী-নাটোর মহাসড়কে বাস-অটোরিকশা সংঘর্ষে ঘটনাস্থলে নিহত হন বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী এবং আহত হন ছয়-সাতজন। হাসপাতালে নেওয়া হলে আহতদের মধ্যে এক নারী ও এক পুরুষ মারা যান। দুর্ঘটনার পরপর নিহত শিক্ষার্থীর সহপাঠীরা ও এলাকাবাসী মহাসড়ক অবরোধ করে। পরিস্থিতি সামলাতে বেলপুকুর থানার পুলিশ সেখানে গেলে উল্টো তারাই বিপাকে পড়ে যায়!
বাসচালককে পালাতে সহযোগিতা করার অভিযোগ তুলে উত্তেজিত জনগণ এক এসআইকে কান ধরে দাঁড় করিয়ে রাখে এবং ওসিকে অবরুদ্ধ করে রাখে। এদিকে পুলিশের দাবি, তারা পৌঁছানোর আগেই চালক পালিয়ে যান। গুজব ছড়িয়ে পুলিশকে হেনস্তা করা হয়েছে বলে তারা জানায়।
পুলিশকে কান ধরে দাঁড় করিয়ে রাখার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। কান ধরানোর আরও একটি ভিডিও সম্প্রতি দেখা গেছে ভাইরাল হতে। ডাকসুর কার্যনির্বাহী সদস্য সর্বমিত্র চাকমা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বহিরাগতদের ডান্ডা দেখিয়ে ‘শাস্তি’ দিয়েছেন কান ধরে ওঠবস করিয়ে!
কান ধরানোর মিল ছাড়া দুটি ঘটনার মধ্যে কোনো যোগসূত্র নেই। তবে এটুকু পরিষ্কার যে, বর্তমানে এ দেশে যে যা খুশি করে বেড়াতে পারে, আইনকানুনের থোড়াই কারও ‘কেয়ার’ আছে। তাইতো পুলিশকেও জনগণ ‘শাস্তি’ দিতে পারে। কিন্তু শাস্তি হিসেবে যেকোনো জায়গায় কান ধরে দাঁড় বা ওঠবস করানোর যে ঐতিহ্য তৈরি হচ্ছে, সেটা কারও জন্য মঙ্গল বয়ে আনবে না।
যারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজে নিয়োজিত, সেই পুলিশকে এভাবে অবজ্ঞা করলে এবং পুলিশের বিরুদ্ধে এমন অপ্রত্যাশিত কাণ্ড ঘটালে পুলিশের আত্মবিশ্বাস শূন্যের কোঠায় এসে পৌঁছাবে। এ রকম আত্মবিশ্বাসহীন পুলিশ বাহিনী দিয়ে কি আসন্ন নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা সম্ভব? এখন এই প্রশ্ন তুলে কেউ যদি বলেন, নির্বাচন পেছাতে হবে, সেটাও কোনো কাজের কথা নয়। নির্বাচনের আগেই তাদের আত্মবিশ্বাস দৃঢ় হতে হবে।
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের সময়টায় পুলিশের আত্মবিশ্বাস যেভাবে কমেছে, প্রায় দেড় বছরেও সেই ধাক্কা যদি এই বাহিনী সামলে উঠতে না পারে, তাহলে জনগণকে হতাশ হতে হয়। আবার এই জনগণই যদি পুলিশকে অবজ্ঞা করে তাহলে তা পুলিশের হতাশা বাড়িয়ে দেয়।
এই মুহূর্তে এমন এক হ্যামিলিনের বাঁশিওয়ালাকে প্রয়োজন, যিনি পুলিশকে সঠিক দিকনির্দেশনা দিয়ে ঐক্যবদ্ধ এবং আত্মবিশ্বাসী করে গড়ে তুলতে পারবেন। তাকে যে পুলিশের কোনো উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হতে হবে তা নয়, তিনি হতে পারেন দেশের শাসকগোষ্ঠী কিংবা জনগণের কেউ। কিন্তু ‘উত্তেজিত জনতা’ কি এই গুরু দায়িত্ব কাঁধে নেবে?