হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

সংসদীয় স্থায়ী কমিটি নিয়ে নতুন সরকার কী ভাবছে

নতুন সংসদের সংসদীয় কমিটিগুলো কতটা কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারবে এবং সেসবের মান কেমন হবে, তা নিয়েও সচেতন মহলের মধ্যে যথেষ্ট আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠন নিয়ে রাজনৈতিক দল, গণমাধ্যম, শিক্ষায়তনিক মহল কিংবা নাগরিক সমাজের মধ্যেও এখন পর্যন্ত তেমন কোনো আলোচনা লক্ষ করা যাচ্ছে না।

আবু তাহের খান

নতুন সংসদ রাষ্ট্রের বৃহত্তর জনগণকে হতাশ করবে না বলেই প্রত্যাশা। ছবি: আজকের পত্রিকা আর্কাইভ

বাংলাদেশ রাষ্ট্রের যাত্রা একটি ওয়েস্টমিনস্টার ধাঁচের সংসদীয় সরকারব্যবস্থার প্রত্যাশা ও তদানুগ একটি সংবিধান দিয়ে শুরু হলেও এর বিগত ৫৫ বছরের বয়সকালের মধ্যে অন্তত ২৫ বছরই কেটেছে সংসদবহির্ভূত ব্যবস্থার অধীনে। আর কাগজ-কলমে যে ৩০ বছর সংসদীয় ব্যবস্থার অধীনে ছিল, তার মধ্যেও অন্তত ১০ বছর সংসদে কোনো কার্যকর বিরোধী দল ছিল না। আর যে ২০ বছর বিরোধী দলসংবলিত পূর্ণাঙ্গ সংসদ ছিল, তখনো সংসদের ভূমিকা ছিল মূলত কিছুটা বুঝে ওঠা, কিছুটা স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধির মতো আচরণ করা ও বাকিটা নিজেদের সুযোগ-সুবিধা বাগিয়ে নেওয়ার মতো কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ। বস্তুত একটি আদর্শ সংসদের ভূমিকা বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ প্রায় কখনোই পালন করতে পারেনি। ফলে ওয়েস্টমিনস্টার ধাঁচের সংসদের আওতায় দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোর দাপুটে-গতিশীল পদচারণ, সৌন্দর্যময় নান্দনিক আচরণ ও নিরন্তর প্রতিপত্তিময় ভূমিকা—এসব দেখার সুযোগ এ দেশের জনগণের প্রায় কখনোই হয়নি। অথচ মানসম্মত সংসদীয় ব্যবস্থার আওতায় সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোই হচ্ছে সংসদের প্রাণ এবং কার্যত এ কমিটিগুলোই নিজ নিজ কার্যক্ষেত্রে সংসদের প্রতিনিধিত্ব করে থাকে।

অন্যদিকে মন্ত্রণালয়ের কাজের ক্ষেত্রে সংসদীয় কমিটিগুলোর ভূমিকা অনেকটা ওয়াচডগের মতো। কমিটিগুলো যত বেশি সচল ও সক্রিয় থাকবে, অর্থাৎ মন্ত্রণালয়ের কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে তারা যত বেশি সজাগ ও নিবিড় দৃষ্টিপাত বজায় রাখবে, তাদের (মন্ত্রণালয়ের) কর্মকাণ্ডে গতিশীলতা আসার সম্ভাবনাও ততই বাড়বে। তদুপরি সংসদীয় কমিটির উল্লিখিত ভূমিকার কারণে আদর্শ পরিস্থিতিতে মন্ত্রণালয়গুলোর কাজের ক্ষেত্রে বহুলাংশে বর্ধিত দায়িত্বশীলতা ও জবাবদিহির বোধও সৃষ্টি হয়। আর মন্ত্রণালয়গুলো যদি সংসদীয় কমিটির সঙ্গে পরামর্শক্রমে কাজ করে, তাহলে কাজের গতি ও মান দুটোই ব্যাপক পরিসরে বৃদ্ধি পাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, যে ২০ বছরজুড়ে এ দেশে নির্বাচিত সংসদ ছিল, সে সময়েও সংসদীয় কমিটিগুলোর তেমন কোনো কার্যকারিতা ছিল না, যার প্রমাণ গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যে যথেষ্টই রয়েছে এবং সাধারণ জনগণও এ বিষয়ে যথেষ্টই অবহিত আছে। আর পেশাগত দায়িত্ব পালনের সুবাদে ওই সময়কার সংসদীয় কমিটির কার্যক্রম খুব কাছ থেকে দেখার খানিকটা সুযোগ অত্র লেখকেরও হয়েছিল। আর সেই অভিজ্ঞতার সুবাদে বলব, সে ধরনের দায়িত্ব পালনের ওই দুর্বল ধারা যদি সামনের দিনগুলোতেও অব্যাহত থাকে, তাহলে ওয়েস্টমিনস্টার ধাঁচের সংসদ গড়ে তোলার প্রত্যাশা এ দেশে কখনোই পূরণ হবে না।

এবার অতীত থেকে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির কার্যক্রমের কিছু নমুনা তুলে ধরার চেষ্টা করা যাক। প্রথমেই উল্লেখ করা যেতে পারে, ওই সময়ে সংসদীয় কমিটির সভাপতি কখনো সরকারি দলের এবং কখনো বিরোধী দলের মধ্য থেকে করা হলেও অসহযোগিতা ও অনান্তরিকতার সমস্যা কোনোকালেই কমেনি। যদিও সাধারণভাবে মনে হতে পারে, মন্ত্রী ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি উভয়ে একই দলের অর্থাৎ সরকারি দলের সদস্য হলে সে ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতাপূর্ণ পরিস্থিতি বজায় থাকারই কথা। কিন্তু বাস্তবে সে সময়েও অত্যন্ত হতাশার সঙ্গে দেখতে হয়েছে যে, সংসদীয় কমিটির সভায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী (যিনি পদাধিকারবলে সংশ্লিষ্ট সংসদীয় কমিটিরও সদস্য) নানা অজুহাতে প্রায়ই অনুপস্থিত থেকেছেন এবং এ নিয়ে কমিটি সভাপতিকে প্রকাশ্যে ক্ষোভ ও হতাশাও প্রকাশ করতে দেখা গেছে, যেটি ছিল খুবই ন্যায্য। কারণ সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় সংসদীয় স্থায়ী কমিটি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কাজকে পাহারা দেবে এবং মন্ত্রণালয়ও এটিকে স্বীকৃত ব্যবস্থার অংশ হিসেবে স্বতঃস্ফূর্তভাবে গ্রহণ করবে, এটিই ছিল স্বাভাবিক।

কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশের মন্ত্রীরা বিষয়টিকে কখনো সহজভাবে নেননি। তাঁদের চিন্তায় জগদ্দল পাথরের মতো স্থির হয়ে থেকেছে এ ধারণা যে, সংসদ বা প্রধানমন্ত্রী ছাড়া আর কারও কাছে মন্ত্রী বা মন্ত্রণালয় জবাবদিহি করতে বাধ্য নয়। কিন্তু তাঁরা বুঝতে চাননি বা তাঁদের উপলব্ধিতে এটি একেবারেই কাজ করেনি যে, সংসদীয় স্থায়ী কমিটি আসলে সংসদকেই প্রতিনিধিত্ব করছে, অর্থাৎ সংসদের হয়েই তাঁরা মন্ত্রণালয়ের কর্মকাণ্ডকে পাহারা ও পরামর্শ দিয়ে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত। বস্তুত সংসদীয় সরকারব্যবস্থার আওতাধীন হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশের মন্ত্রীদের মধ্যে সব সময়ই একধরনের সামন্ততান্ত্রিক চিন্তাভাবনা কাজ করে, যেখানে তাঁরা নিজেদের সার্বক্ষণিকভাবে মন্ত্রণালয়ের সার্বভৌম কর্তৃত্বের অধিকারপ্রাপ্ত ব্যক্তি ছাড়া আর কিছুই ভাবতে পারেন না। আর তাঁদের এ ধরনের মানসিকতার কারণেই বিগত কোনো সরকারের আমলেই সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলো কাঙ্ক্ষিত মানে ও পর্যায়ে কার্যকর হয়ে উঠতে পারেনি।

অন্যদিকে যে সময়ে বিরোধী দল থেকে সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন করা হয়েছে, সে সময়ে ওই কমিটিকে মন্ত্রণালয় কর্তৃক সহজভাবে গ্রহণ করতে না পারার পুরোনো সমস্যা তো ছিলই। তার সঙ্গে নতুন করে যোগ হয় অন্ধ দলীয় বিরোধিতা। সংসদীয় স্থায়ী কমিটির একাধিক সভায় দেখা গেছে, কমিটি-সভাপতির বা বিরোধীদলীয় সদস্যের অনেক যৌক্তিক প্রস্তাবও সরকারদলীয় সদস্যরা নিছক বিরোধিতা করার মানসিকতা থেকে নাকচ করে দিয়েছেন। অথচ সংসদীয় কমিটিতে এগুলো বিল পাসের মতো কোনো বিষয় ছিল না, যেটি সমর্থন করলে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন ঘটত; কিংবা এতে তাঁর সদস্যপদ চলে যেত। আসলে এগুলোর সবই ছিল অন্ধ দলীয় বিরোধিতা। উল্লেখ্য, সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে সরকারি দলের প্রস্তাবেও বিরোধীদলীয় সদস্যদের একই আচরণ করতে দেখা গেছে। চোখের সামনে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে দেখতে হয়েছে, কোনো যুক্তি ছাড়াই কমিটির বিরোধীদলীয় সদস্যরা হঠাৎ করে সভা বর্জন করে চলে গেছেন। নতুন সংসদে যদি এমনটিই ঘটতে থাকে, তাহলে সেখানে সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোর কার্যকারিতা কতটুকু থাকবে, তা একটি গুরুতর প্রশ্ন বৈকি!

উল্লিখিত দুই অযৌক্তিক হীন আচরণ এবং উক্ত অন্ধ বিরোধিতা ছাড়াও বিগত সব সংসদের আওতাধীন প্রায় সব সংসদীয় কমিটিতেই একটি বিষয় অত্যন্ত ধারাবাহিকভাবে ঘটতে দেখা গেছে এবং তা হচ্ছে, রাষ্ট্রীয় অর্থে বিদেশ সফর ও এ-জাতীয় অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করার প্রস্তাব উত্থাপন (অন্যান্য বিষয়ে ব্যাপক মতদ্বৈথতা থাকলেও এ বিষয়ে সরকারি ও বিরোধী উভয় পক্ষকেই ঐকমত্য পোষণ করতে দেখা গেছে)। সে ক্ষেত্রে এমনও দেখা গেছে, প্রস্তাবিত বিদেশ সফরের জন্য বাজেটে পর্যাপ্ত অর্থের সংস্থান না থাকায় উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় বরাদ্দ সমন্বয় করে এটি করা হয়েছে; কিংবা কোনো দেশি-বিদেশি ঠিকাদারকে তা করতে বলা হয়েছে। এমনকি কখনো কখনো কোনো প্রকল্পের আওতায় বিদেশ সফরের জন্য নতুন কাজ হিসেবে তা যুক্ত করে ডিপিপি সংশোধনের ঘটনাও ঘটেছে। আর দেশের ভেতরে কক্সবাজার বা অনুরূপ কোনো পর্যটনকেন্দ্রে কমিটির সভা আয়োজনের ঘটনা তো ছিলই। আর ওই সব সভায় যোগদান উপলক্ষে থাকা-খাওয়া, যাতায়াত ও উপহারসামগ্রী ক্রয়ের ব্যয়ও রাষ্ট্রকেই বহন করতে হয়েছে।

সব মিলিয়ে বলব, মন্ত্রণালয়গুলোর অসহযোগিতা, সরকারি দলের স্বেচ্ছাচারিতামূলক দৃষ্টিভঙ্গি ও সংসদ সদস্যদের ব্যক্তিগত পেশাদারি সামর্থ্য তথা বিষয়গত জ্ঞানের অপর্যাপ্ততার কারণে বিগত সংসদগুলোর আওতাধীন সংসদীয় কমিটিগুলোর কার্যক্রম প্রায় কখনোই কাঙ্ক্ষিত মান ও পর্যায়ের হয়ে উঠতে পারেনি। এমনকি সেসব কার্যক্রমের ক্ষেত্রে কখনো কখনো স্বচ্ছতারও ঘাটতি ছিল। আর সংশ্লিষ্টদের প্রতি পূর্ণ সম্মান রেখে বলি, আইনপ্রণেতা হিসেবে রাষ্ট্র ও সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে সংসদ সদস্যদের মধ্যে যে মানের চিন্তাভাবনা, জনগণের প্রতি তাঁদের যে পরিসরের মমত্ববোধ এবং অর্পিত দায়িত্ব পালনে তাঁদের মধ্যে যে স্তরের গতি ও দৃঢ়তা থাকা প্রয়োজন ছিল, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাঁদের মধ্যে তা ছিল বলে তাঁরা প্রমাণ দিতে পারেননি। এমন পরিস্থিতিতে নতুন সংসদের সংসদীয় কমিটিগুলো কতটা কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারবে এবং সেসবের মান কেমন হবে, তা নিয়েও সচেতন মহলের মধ্যে যথেষ্ট আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠন নিয়ে রাজনৈতিক দল, গণমাধ্যম, শিক্ষায়তনিক মহল কিংবা নাগরিক সমাজের মধ্যেও এখন পর্যন্ত তেমন কোনো আলোচনা লক্ষ করা যাচ্ছে না এবং এ নিয়ে কারও মধ্যে কোনো উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার ছাপও প্রকাশ পাচ্ছে না।

তাহলে কি ভাবব, বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার আওতায় ওয়েস্টমিনস্টার ধাঁচের উচ্চতর সংসদীয় রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার যে প্রত্যয় নিয়ে এ দেশ যাত্রা শুরু করেছিল এবং মাঝপথে খেই হারিয়ে ফেলার পর ১৯৯১-তে তিন জোটের রূপরেখার মাধ্যমে যেটিকে আবার পুনরুজ্জীবিতকরণেরও চেষ্টা হয়েছে, সেটি কি এখন কিছুটা হলেও ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে? জাতীয় সংসদ, সংসদীয় স্থায়ী কমিটি, সংসদ ও মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে স্থায়ী কমিটির সম্পর্ক ইত্যাদি বিষয় নিয়ে নতুন সরকারের শীর্ষস্থানীয় নেতারা গুরুত্বের সঙ্গে ভাববেন বলে আশা করি। নবগঠিত সংসদ যদি মানুষের সামনে আশাব্যঞ্জক সংসদীয় কার্যক্রম উপহার দিতে না পারে, তাহলে সামগ্রিক রাজনীতির ব্যাপারেই মানুষের হতাশা আরও বেড়ে যাওয়ার সমূহ আশঙ্কা রয়েছে। আশা করব, নতুন সংসদ রাষ্ট্রের বৃহত্তর জনগণকে হতাশ করবে না।

লেখক: সাবেক পরিচালক বিসিক

নতুন নীতি প্রণয়নের চেয়ে দরকার নীতির সঠিক বাস্তবায়ন

৯ শতাংশ

ইরানে হামলা

সরকারের দুই চেহারা—কোনটি আসল, কোনটি নকল

ইরান: প্রশ্নগুলো সহজ, উত্তর এখনো অজানা

ইতিহাসের সোনালি মুহূর্তটা নষ্ট হয়ে গেছে: আলতাফ পারভেজ

এই নির্মমতার শেষ কোথায়

আইজিপি ও মব সংস্কৃতি

নতুন পর্বের সূচনা এবং সরকারের চ্যালেঞ্জ

আত্মহত্যা প্রতিরোধে জরুরি রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ