মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থিরতার মূলে রয়েছে কয়েক দশক ধরে চলে আসা ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংকট। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই সংকটের মাত্রা আগের চেয়ে অনেক বেশি ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। গাজা উপত্যকায় চলমান দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত কেবল স্থানীয় গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি এখন লেবানন, সিরিয়া, ইয়েমেন এবং সরাসরি ইরান পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। একদিকে যেমন ইসরায়েলের নিরাপত্তা ও অস্তিত্বের প্রশ্ন, অন্যদিকে ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার এবং আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের লড়াই। এই দুইয়ের চাপে পিষ্ট হচ্ছে সাধারণ মানুষ এবং ধসে পড়ছে দশকের পর দশক ধরে গড়ে ওঠা কূটনীতির কাঠামো।
বর্তমান মধ্যপ্রাচ্যের সমীকরণে সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর হলো ইরান ও ইসরায়েলের সরাসরি সংঘাত। দীর্ঘদিনের ‘ছায়াযুদ্ধ’ এখন প্রকাশ্য আক্রমণে রূপ নিয়েছে। ইরানের ‘প্রতিরোধ অক্ষ’—যাতে হিজবুল্লাহ, হামাস এবং হুতি বিদ্রোহীরা অন্তর্ভুক্ত—ইসরায়েল তথা পশ্চিমা স্বার্থের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী দেয়াল তৈরি করেছে। অন্যদিকে, ইসরায়েল তার অত্যাধুনিক প্রযুক্তি এবং পশ্চিমা মিত্রদের সহায়তায় এই অক্ষকে গুঁড়িয়ে দিতে মরিয়া। এই দুই শক্তির সরাসরি সংঘর্ষ পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে এক সুতার ওপর ঝুলিয়ে দিয়েছে। ইরানের পরমাণু কর্মসূচি এবং ইসরায়েলের সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই এই অঞ্চলে এক নতুন স্নায়ুযুদ্ধের জন্ম দিয়েছে, যা যেকোনো মুহূর্তে বড় কোনো বিশ্বযুদ্ধে রূপ নিতে পারে।
একটা সময় ছিল যখন আরব বিশ্ব বলতে ফিলিস্তিন ইস্যুতে এককাট্টা এক জোটকে বোঝাত। কিন্তু এখন সেই চিত্র অনেকটা বদলে গেছে। ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ড’-এর মাধ্যমে সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইনের মতো দেশগুলো ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করেছে। সৌদি আরবও এই পথেই হাঁটছিল, তবে সাম্প্রতিক সংঘাত সেই প্রক্রিয়াকে কিছুটা ধীর করে দিয়েছে। বর্তমানে আরব দেশগুলো এক চরম দোটানায় রয়েছে। একদিকে তাদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য স্থিতিশীলতা ও পশ্চিমা বিনিয়োগ প্রয়োজন, অন্যদিকে দেশের ভেতরে এবং মুসলিম বিশ্বে জনমতের চাপে তারা ফিলিস্তিন ইস্যু এড়িয়ে যেতে পারছে না। ফলে আরব বিশ্বের এই দ্বিধাবিভক্ত অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যের সমীকরণকে আরও জটিল করে তুলেছে।
মধ্যপ্রাচ্য আর কেবল আমেরিকার একক প্রভাববলয় নয়। যদিও আমেরিকা এখনো এই অঞ্চলের প্রধান সামরিক ও রাজনৈতিক অংশীদার, কিন্তু চীনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক প্রভাব এবং রাশিয়ার কৌশলগত অবস্থান মার্কিন আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। চীন যখন ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনে মধ্যস্থতা করে, তখন বিশ্ববাসী এক নতুন নেতৃত্বের স্বাদ পায়। আবার সিরিয়া ইস্যুতে রাশিয়ার ভূমিকা প্রমাণ করে যে মস্কোর সমর্থন ছাড়া এই অঞ্চলে কোনো সমাধান সম্ভব নয়। ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে রাশিয়ার মনোযোগ অন্যদিকে থাকলেও মধ্যপ্রাচ্যে তাদের স্বার্থ বিন্দুমাত্র কমেনি। এই তিন পরাশক্তির পারস্পরিক প্রতিযোগিতা মধ্যপ্রাচ্যকে এক বিশাল দাবার বোর্ডে পরিণত করেছে।
মধ্যপ্রাচ্য মানেই তেলের রাজনীতি। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের ওপর এই অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ অনস্বীকার্য। বর্তমান অস্থিরতার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামের ওঠানামা বিশ্ব অর্থনীতিকে অস্থির করে তুলছে। বিশেষ করে লোহিতসাগরে হুতি বিদ্রোহীদের আক্রমণের ফলে বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইন ব্যাহত হচ্ছে। সুয়েজ খাল দিয়ে যাতায়াতকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপত্তা আজ হুমকির মুখে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এখন কেবল সীমান্তের লড়াই নয়, এটি এখন প্রতিটি দেশের মানুষের পকেটে এবং রান্নাঘরে প্রভাব ফেলছে।
এই দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতার সবচেয়ে করুণ চিত্রটি ফুটে ওঠে শরণার্থীশিবিরে। সিরিয়া, ইয়েমেন এবং গাজার লাখ লাখ মানুষ আজ বাস্তুচ্যুত। প্রজন্মের পর প্রজন্ম যুদ্ধের বিভীষিকা নিয়ে বড় হচ্ছে। শিক্ষার অভাব, খাদ্যসংকট এবং চিকিৎসার দুষ্প্রাপ্যতা এই অঞ্চলের ভবিষ্যৎকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
‘টু-স্টেট সলিউশন’ বা দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধান কাগজ-কলমে থাকলেও বাস্তবে তার বাস্তবায়ন এখন প্রায় অসম্ভব বলে মনে হয়। যতক্ষণ পর্যন্ত আঞ্চলিক শক্তিগুলো তাদের ক্ষুদ্র স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে আলোচনার টেবিলে না বসবে, ততক্ষণ পর্যন্ত শান্তি কেবল সুদূরপরাহত স্বপ্নই থেকে যাবে।
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সমীকরণটি কোনো একটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে স্থির নেই। এটি যেমন ধ্বংসাত্মক সংঘাতের হাতছানি দিচ্ছে, তেমনি দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতার এক চোরাবালিতে আটকে পড়েছে। আঞ্চলিক দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ সংস্কার, পরাশক্তিগুলোর স্বার্থত্যাগ এবং একটি ন্যায়সংগত রাজনৈতিক সমাধান ছাড়া এই অস্থিরতা থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়।