কোথাও কোনো প্রকল্পের কাজ শুরু হলেই যেন ঘুষ খাওয়ার হিড়িক পড়ে যায়! অবশ্য কাজ শুরু হওয়ার আগে থেকে শরিকেরা নির্ধারণ করে নেন কে কী পরিমাণ ঘুষ খাবেন। এই অতি সাধারণ দৃশ্য সম্পর্কে দেশের মানুষ কমবেশি সবাই জানে। বিশেষ করে যেসব খবর প্রকাশ্যে আসে। যেমনটা এসেছে ৩ মার্চের আজকের পত্রিকার শেষ পাতায়—ঘুষসংক্রান্ত একটি সংবাদ।
রাজশাহী নগরের সিলিন্দা এলাকায় প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকায় রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (রামেবি) ক্যাম্পাস গড়ে তোলা হচ্ছে। সম্প্রতি ছয়টি প্যাকেজের নির্মাণকাজের দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। খবরে বলা হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন প্রকল্পের কাজ পাইয়ে দিতে প্রতিষ্ঠানটির উপাচার্য ডা. জাওয়াদুল হক ঘুষ চেয়েছেন ৯ শতাংশ। এমন অভিযোগ করেছে জেনিট করপোরেশন নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
‘৯ শতাংশ ঘুষ—এ আর এমন কী’ যাঁরা ভাবছেন, তাঁরা জেনে রাখুন, প্রকল্পটি ৭৭৭ কোটি টাকার! এই ৭৭৭ কোটি টাকা থেকে কেউ মাত্র ৯ শতাংশ ঘুষ নিলে তা আসলে কত হয়? স্কুলপড়ুয়া কোনো শিক্ষার্থীও একটু অঙ্ক কষলে বলে দিতে পারে, তা ৬৯ কোটি ৯৩ লাখ টাকা! অঙ্কটা কি খুব ছোট মনে হয়? মোটেই না। তবে ছোট হোক কিংবা বড়—ঘুষ খাওয়া তো আর স্বাভাবিক কোনো বিষয় নয়, শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
উপাচার্য নাকি কাজ পাইয়ে দিতে শর্তও দেন। যেমন, যে টাকা তিনি নেবেন তার অর্ধেক আগাম পরিশোধ করতে হবে। বাকি টাকা দেওয়ার জন্য সিকিউরিটি হিসেবে চেক দিয়ে রাখতে হবে। এমনকি টাকা পরিশোধের ব্যাপারে একটি সম্মতিপত্রেও ঠিকাদারকে স্বাক্ষর দিতে হবে। এসব শর্তে সম্মতি দিলে ঠিকাদারদের যোগ্যতার ক্ষেত্রে এমন শর্ত দেওয়া হবে, যা কেবল নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানই পূরণ করে। ফলে কোনো প্রতিযোগিতা ছাড়াই ওই প্রতিষ্ঠান কাজ পেয়ে যাবে। উপাচার্যের বিরুদ্ধে আনা এই অভিযোগ যদি সত্যি হয়ে থাকে, তাহলে বলতে হয়—তিনি ঘুষটা আসলে সততার সঙ্গেই নেন!
এই অভিযোগ ওঠার আগে, গত ২২ ফেব্রুয়ারি রাজশাহীর মেসার্স তাবাসসুম এন্টারপ্রাইজ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্রধানমন্ত্রী, স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীর কাছে লিখিত অভিযোগ করেছে রামেবি নির্মাণকাজের দরপত্র প্রক্রিয়ায় নানা অসংগতি ও অনিয়ম তুলে ধরে।
এদিকে উপাচার্য দাবি করছেন, এগুলো সব বানোয়াট, মিথ্যা খবর। আমরা ধরে নিলাম তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো সত্য নয়। কিন্তু অভিযোগ যেহেতু উঠেছে, সেহেতু এর যথাযথ তদন্ত ও বিচার হওয়া দরকার। ইতিমধ্যেই প্রথম ধাপে প্রায় ২ হাজার ২০০ কোটি টাকা নিয়ে কাজ শুরু করেছেন জাওয়াদুল হক। তিনি এই প্রকল্পের পরিচালকও। যদি ঘুষ লেনদেনের ব্যাপারটি সত্য হয়ে থাকে, তাহলে প্রথম ধাপেও ঘাপলা হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। আশা করব, নিজেকে নির্দোষ দাবি করা উপাচার্য মহোদয় এ ব্যাপারে সহায়তা করবেন; যেন অবাক হয়ে কেউ মন্তব্য করতে না পারে—শিক্ষক হয়েও ঘুষ খান!