আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ভারতের বেসরকারি প্রতিষ্ঠান আদানি পাওয়ারের সঙ্গে অসম চুক্তির ব্যাপারটি নতুন ছিল না। সে সময়ও এটা নিয়ে প্রশ্ন ও সমালোচনা উঠেছিল। তারপরও সে সরকার দেশের স্বার্থ বিকিয়ে দিয়ে সে চুক্তি করেছিল। অন্তর্বর্তী সরকার আদানির সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী বকেয়া টাকা পরিশোধ করেছিল। এরপর তাদের শেষ সময়ের দিকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০-এর অধীনে সম্পাদিত চুক্তিগুলো পর্যালোচনার জন্য ২০২৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠন করে। এ কমিটি দেড় বছরের বেশি সময় ধরে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে।
সেই রিপোর্ট মতে, সরকার অন্যান্য উৎস থেকে যে বিদ্যুৎ কিনেছে চুক্তির সময় তার চেয়ে প্রতি ইউনিটে ৪-৫ সেন্ট বেশি দেওয়া হয়েছে। এমনকি ভারত থেকে আমদানি করা বিদ্যুতের সঙ্গে তুলনা করলেও এর দাম অনেক বেশি। আদানির সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছিল প্রতি ইউনিট ৮ দশমিক ৬১ সেন্টে। তবে শর্তের মারপ্যাঁচে ২০২৫ সালে পরিশোধ করতে হয়েছে ১৪ দশমিক ৮৭ সেন্ট ধরে। এতে বছরে ৪০০-৫০০ মিলিয়ন ডলার বেশি বিল দিতে হচ্ছে আদানিকে। চুক্তি অব্যাহত থাকলে ২৫ বছর ধরে তা দিয়ে যেতে হবে।
সবচেয়ে কষ্টদায়ক ব্যাপার হলো, এটি একটি ‘সার্বভৌম চুক্তি’ হওয়ায় চাইলেই বর্তমান সরকার এটি বাতিল করতে পারবে না। চুক্তির মধ্যে এমন কিছু রক্ষাকবচ রাখা হয়েছে, যা আদানি গোষ্ঠীকে একতরফা সুরক্ষা দিচ্ছে। যেমন বিদ্যুৎ না নিলেও ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে।
আদানির বিদ্যুৎ দেশের মোট চাহিদার ৯ থেকে ১৩ শতাংশ জোগান দিচ্ছে। ফলে হুট করে সরবরাহ বন্ধ হলে বড় ধরনের লোডশেডিংয়ের মুখে পড়বে দেশ। এই সুযোগটিই নিচ্ছে আদানি গোষ্ঠী। ইতিমধ্যেই তারা বকেয়া বিল নিয়ে সিঙ্গাপুরের আন্তর্জাতিক সালিসি কেন্দ্রে গিয়ে চাপ সৃষ্টির কৌশল নিয়েছে।
তবে আশার কথা হলো, সরকার আন্তর্জাতিক আইনি প্রতিষ্ঠান নিয়োগের মাধ্যমে এই লড়াই লড়তে চাইছে। বিদেশের মাটিতে আদানির বিভিন্ন প্রকল্পের দুর্নীতির রেকর্ড এবং বাংলাদেশি আমলাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে লেনদেনের যে প্রমাণ কমিটির হাতে এসেছে, তা আন্তর্জাতিক আদালতে বড় অস্ত্র হতে পারে।
বিদ্যুৎ খাতের এই ‘অসম’ চুক্তি পর্যালোচনা করার ক্ষেত্রে কেবল আবেগ নয়, বরং কঠোর তথ্য-প্রমাণ ও আইনি দক্ষতার প্রয়োজন। নির্বাচিত নতুন সরকারের জন্য পর্যালোচনা কমিটি যে সুপারিশগুলো রেখে গেছে, তা বাস্তবায়নে এখন থেকেই ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করতে হবে। আদানির দুর্নীতির তথ্যগুলো বিশ্ব দরবারে উন্মুক্ত করে আন্তর্জাতিক জনমত ও দাতা সংস্থাগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে হবে।
সবচেয়ে জরুরি হলো, আদানির ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে অভ্যন্তরীণ বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধির দিকে জোর দিতে হবে। দেশের সম্পদ লুণ্ঠন করে একটি বিশেষ গোষ্ঠীকে তুষ্ট করার যে সংস্কৃতি বিগত দেড় দশকে গড়ে উঠেছিল, সে সংকট থেকে উত্তরণে দীর্ঘমেয়াদি আইনি লড়াইয়ের কোনো বিকল্প নেই।