হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

ভেনেজুয়েলায় মাগা বিসর্জন দিলেন ট্রাম্প, পরের ‘বলিযোগ্য’ কী

হুসাইন আহমদ

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: সংগৃহীত

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবার প্রমাণ করলেন, তাঁর রাজনীতি স্লোগানে সীমাবদ্ধ থাকে না, অর্থাৎ মুখে যা বলেন, করেন তার বিপরীত। ‘আমেরিকা ফার্স্ট’, ‘বিদেশি যুদ্ধে জড়াব না’, ‘মাগা মানেই যুদ্ধবিরোধী অবস্থান’— এত দিনের এসব গালভরা প্রতিশ্রুতি আর শান্তির স্লোগান এক মুহূর্তে ছুড়ে ফেলে দিয়েছেন তিনি। ভেনেজুয়েলায় সামরিক হস্তক্ষেপ, প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে আটক ও দেশটি শাসন করার ঘোষণা শুধু লাতিন আমেরিকাই নয়, গোটা বিশ্বরাজনীতিতে এক গভীর প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। এই পদক্ষেপ শুধু ভেনেজুয়েলা বা লাতিন আমেরিকায় সীমাবদ্ধ থাকলেও বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যে এর মারাত্মক প্রভাব পড়তে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

মাগা বনাম বাস্তব ট্রাম্প

ট্রাম্পের রাজনৈতিক ব্র্যান্ড মাগা (Make America Great Again) মূলত দুটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল— দেশের ভেতরের অর্থনীতি ও বিদেশে সামরিক জটিলতা এড়িয়ে চলা। দ্বিতীয় মেয়াদে অভিষেকের সময়ও তিনি বলেছিলেন, তাঁর সাফল্য মাপা হবে ‘যেসব যুদ্ধে আমরা জড়াইনি’ তার মাধ্যমে। অথচ ভেনেজুয়েলায় রাতারাতি সামরিক অভিযান, রাজধানী কারাকাসে বোমা হামলা ও একজন ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টকে গভীর রাতে বিছানা থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া সেই অবস্থানকে কার্যত উল্টে দিয়েছে।

এর আগে সিরিয়া, ইরান, ইয়েমেন বা সোমালিয়ায় মার্কিন হামলা ছিল সীমিত ও প্রতীকী। ভেনেজুয়েলার ঘটনাটি ভিন্ন, এটি সরাসরি শাসন পরিবর্তনের অভিযান। ট্রাম্প নিজেই বলেছেন, ‘নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল রূপান্তর’ সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রই ভেনেজুয়েলা চালাবে। এটি ১৯৮৯ সালে পানামায় ম্যানুয়েল নরিয়েগার উৎখাতের পর সবচেয়ে বড় দৃষ্টান্ত।

ট্রাম্প যুক্তি দিচ্ছেন, এই হস্তক্ষেপ ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতিরই অংশ। কারণ, ভেনেজুয়েলার বিশাল তেলসম্পদ দিয়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করবেন, প্রতিবেশী অঞ্চলে স্থিতিশীলতা নিয়ে আসবেন। কিন্তু বাস্তবে এটি তেলের বিষয় নয়, শক্তির প্রদর্শন। যুক্তরাষ্ট্র চাইলেই ক্ষমতাসীন যেকোনো সরকারও তুলে নিতে পারে—এই হস্তক্ষেপে সেই বার্তা স্পষ্ট। এই বার্তা কেবল লাতিন আমেরিকার জন্য নয়; বেইজিং, মস্কো ও তেহরানও তা বুঝছে।

তবে ভেনেজুয়েলায় ট্রাম্পের এই সামরিক আগ্রাসন ঘরোয়া রাজনীতিতে মারাত্মক ঝুঁকির পাশাপাশি বৈশ্বিক ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্রের নীতিকে বিশাল চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে। কারণ, গভীর রাতে ভেনেজুয়েলায় ডেল্টা ফোর্স পাঠিয়ে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টকে সস্ত্রীক তুলে নেওয়ার মাধ্যমে শান্তির মুখোশ একেবারে খসে পড়ে ট্রাম্পের হিংস্র চেহারা প্রকাশ পেয়েছে। ইউক্রেনে রাশিয়ার হস্তক্ষেপ বন্ধে এবং তাইওয়ানে চীনের প্রভাব ঠেকানোর মার্কিন নীতিতেন এর মারাত্মক প্রভাব পড়তে পারে।

ঘরোয়া রাজনীতিতে ঝুঁকি

ভেনেজুয়েলায় ট্রাম্পের আগ্রাসনের সিদ্ধান্তে তাঁর নিজ দল রিপাবলিকান শিবিরই বিভক্ত। মাগাপন্থী ট্রাম্পের সাবেক কট্টর অনুসারী রিপাবলিকান মার্জরি টেইলর গ্রিন প্রকাশ্যে বলেছেন, এটাই সেই বিদেশি হস্তক্ষেপ, যেটা বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোট নেওয়া হয়েছিল। কংগ্রেসে ট্রাম্পের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ক্ষীণ; সামনে মধ্যবর্তী নির্বাচন। ডেমোক্র্যাটরা ইতিমধ্যে প্রশ্ন তুলেছেন—কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া যুদ্ধ কতটা সাংবিধানিক?

জনমতও ট্রাম্পের পক্ষে নয়। জরিপ বলছে, ভেনেজুয়েলায় সামরিক হস্তক্ষেপ সমর্থন করে পাঁচজন মার্কিনের একজনেরও কম। অর্থাৎ, এই অভিযান রাজনৈতিকভাবে ট্রাম্পের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বাজি।

তাইওয়ান ও ইউক্রেনের হিসাব

ভেনেজুয়েলায় ট্রাম্পের এই ‘দুঃসাহসিক’ পদক্ষেপ চীনের জন্য একধরনের সুযোগ তৈরি করেছে। বেইজিং ইতিমধ্যে একে ‘নগ্ন সাম্রাজ্যবাদ’ বলে আখ্যা দিয়েছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র এখন আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলতে গেলে চীন সহজেই ভেনেজুয়েলার দৃষ্টান্ত তুলে ধরতে পারবে।

তবে তার মানে এই নয় যে, চীন এখনই তাইওয়ানে হামলা চালাবে। বেশির ভাগ বিশ্লেষকের মতে, তাইওয়ান প্রশ্নে চীনের সিদ্ধান্ত নির্ভর করে তার নিজস্ব সামরিক সক্ষমতা ও অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির ওপর। কিন্তু ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ ভবিষ্যতে বেইজিংয়ের বয়ানে যুক্ত হবে—‘যুক্তরাষ্ট্রও তো তা-ই করে।’

উল্টো দিকে তাইওয়ানের ওপর চাপ বাড়তে পারে। ট্রাম্প যদি প্রমাণ করেন যে, তিনি বিদেশে শক্তি প্রয়োগে দ্বিধা করেন না, তাইপে হয়তো আরও বেশি করে ওয়াশিংটনের সমর্থন কিনতে চাইবে—অস্ত্র, কূটনৈতিক আনুগত্য বা অর্থনৈতিক ছাড়ের বিনিময়ে।

কোনো দেশের নেতৃত্বকে অপহরণ করে সেখানে ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি করা গ্যাংস্টার রাষ্ট্রের আচরণ। তবে এটি একই সঙ্গে ট্রাম্পের অধীনে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলের দিকটিও স্পষ্ট করে, যেখানে বৈশ্বিক আধিপত্য ধরে রাখার বদলে ‘প্রভাববলয়’ মেনে নেওয়ার প্রবণতা দৃশ্যমান।

এ কারণে ইউক্রেন ইস্যুতে রাশিয়ার দাবির প্রতি ট্রাম্প এতটা সহানুভূতিশীল। ১৮২৩ সালের মনরো ডকট্রিনে পুরো মহাদেশকে ওয়াশিংটনের ‘পেছনের উঠান’ হিসেবে দেখা হতো। লাতিন আমেরিকার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের একই রকম ভূমিকা চান ট্রাম্প।

এসব আসলে গভীর অবক্ষয়ের মধ্য দিয়ে যাওয়া আধিপত্যবাদী শক্তির রোগের লক্ষণ, কোনো যুক্তিবাদী বৈশ্বিক পরাশক্তির কাজ নয়। গ্লোবাল অর্ডার বা বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য অনেক আগেই ধ্বংস হয়ে গেছে। ২০০৩ সালে ইরাকে অবৈধ আগ্রাসন ছিল তার অন্যতম বড় কারণ। সেটিই আগ্রাসী কর্মকাণ্ডকে স্বাভাবিক করে তোলে, যার ধারাবাহিকতায় পুতিনের ইউক্রেন আক্রমণও সম্ভব হয়। একইভাবে পশ্চিমা অস্ত্রে সজ্জিত ইসরায়েলের গাজায় চালানো গণহত্যাও এই ভাঙনের আরেকটি ভয়াবহ উদাহরণ।

ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে এই আগ্রাসন নিশ্চয়ই অবশিষ্ট যা কিছু ছিল, সেটুকুও শেষ করে দিল। এখন অন্য শক্তিগুলো যে নিজেদের সুবিধামতো যেকোনো অজুহাত দাঁড় করিয়ে একই কাজ করবে না, এর নিশ্চয়তা কোথায়?

পাঁকে পড়ার শঙ্কা

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—ভেনেজুয়েলায় এখন কী হবে? মাদুরোকে সরানো এক জিনিস, দেশ চালানো আরেক জিনিস। সেনাবাহিনী, আমলাতন্ত্র, চাভিস্তা ঘরানা—সব মিলিয়ে ভেনেজুয়েলার ক্ষমতার কাঠামো জটিল। সাবেক মার্কিন কর্মকর্তারাও বলছেন, ‘ভেনেজুয়েলা চালানো মানে কী, এর উত্তর কেউ জানে না। যদি যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদি রূপান্তরে জড়িয়ে পড়ে, তবে এটি ট্রাম্পের নিজের ঘোষিত যুদ্ধবিরোধী অবস্থানের সঙ্গেই সাংঘর্ষিক হবে। আর সেখানেই মাগা দর্শনের সবচেয়ে বড় বিপর্যয়।

ভেনেজুয়েলায় ট্রাম্পের বাজি শুধু একটি দেশের ভবিষ্যৎ নয়, এটি যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক ভূমিকাকেই নতুন করে সংজ্ঞায়িত করছে। প্রশ্ন উঠছে, মাগার নামে ট্রাম্প কি আসলে পুরোনো আমেরিকান হস্তক্ষেপের নীতিকেই নতুন ভাষায় ফিরিয়ে আনছেন? আর সেই পথে হাঁটতে গিয়ে ইউক্রেনের মতো তাইওয়ান কিংবা অন্য কোনো সংকট কি পরের ‘বলিযোগ্য’ হয়ে উঠবে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনো পরিষ্কার নয়। তবে একটা বিষয় স্পষ্ট, ভেনেজুয়েলায় রাতারাতি অভিযান বিশ্বরাজনীতিকে এমন এক অনিশ্চিত মোড়ে এনে দাঁড় করিয়েছে, যেখানে ট্রাম্পের পরবর্তী চাল শুধু যুক্তরাষ্ট্রের নয়, বহু দেশের ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারে।

লেখক: সহকারী বার্তা সম্পাদক, আজকের পত্রিকা

গণতন্ত্র, ভোট ও মৌলিক অধিকার

মেগা প্রকল্প পরিত্যাগ নয়, প্রয়োজন দুর্নীতিমুক্তকরণ

নিজের হাতে আইন

খেলিছ এ বিশ্ব লয়ে...

নির্বাচনে সাইবার নিরাপত্তা

খেজুরের গুড়ের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ুক

এলপিজির দামে নৈরাজ্য

রাজনীতিবিদদের রহস্যময় হলফনামা

গ্যাসের দামে পুড়ছে সাধারণের জীবন

অর্থনীতিতে সমস্যা উত্তরণের পথ