হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

সুন্দর সূচনায় সামান্য গোচোনা না দিলেই নয়

অলি আহাদ ঢাকা কলেজে পড়াশোনা শেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলেন। কিন্তু ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণের কারণে ১৯৪৮ সালে তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। যদিও দীর্ঘ ৫৮ বছর পর ২০০৬ সালে সেই বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হয়।

আজাদুর রহমান চন্দন

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার আগেই বিজয়ী দলের নেতা ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান সংসদের বিরোধীদলীয় নেতাসহ সংসদে প্রতিনিধিত্বশীল অন্যান্য দলের নেতাদের বাসায় গিয়ে তাঁদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন। বহু বছর এ দেশের বিজয়ী ও পরাজিত দলগুলোর নেতাদের বলতে গেলে মুখ দেখাদেখি বন্ধ থাকার পর এ সৌজন্য সাক্ষাতের ঘটনা সব স্তরের মানুষের প্রশংসা কুড়িয়েছে। বঙ্গভবনের দরবার হলের পরিবর্তে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় উন্মুক্ত স্থানে সরকারের শপথ নেওয়ার মাধ্যমেও তারেক রহমান চমক দেখিয়েছেন। সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ট্রাফিক সিগন্যাল মেনে রাস্তা পেরিয়ে নিজ দপ্তরে যাচ্ছেন তারেক রহমান। যে দেশে ভিভিআইপি তথা রাষ্ট্রীয় অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের চলাচলের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা সড়কে অন্য সব যান চলাচল বন্ধ রাখার চল, সে দেশের নতুন সরকারের জন্য এর চেয়ে শুভ-সুন্দর সূচনা আর কী হতে পারে! শুধু এই একটি পদক্ষেপের জন্যই সরকারপ্রধানের প্রশংসা প্রাপ্য। জনগণ অকুণ্ঠ প্রশংসাও করছে।

সাময়িকভাবে বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপভোগ্য মনে হলেও ঘনবসতিপূর্ণ বাংলাদেশ ও এর অতি ব্যস্ত রাজধানীতে প্রধানমন্ত্রী নিজ বাসভবন থেকে নিয়মিত ট্রাফিক সিগন্যাল মেনে ৪০-৫০ মিনিটে সচিবালয়ে গিয়ে অফিস করবেন, এমনটি খুব বেশি দিন চালিয়ে যাওয়া কতটা সম্ভব হবে, সেটাও ভেবে দেখা দরকার। সরকার কিংবা রাষ্ট্রপ্রধানের মুভমেন্ট বা চলাচলের জন্য প্রতিবার আধা ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টা রাস্তায় আটকে থাকার অভিজ্ঞতা আছে নাগরিকদের। সেই বাস্তবতায় পুরো রাস্তা ফাঁকা না করেও সরকারপ্রধানের গাড়িবহরকে যাতে ট্রাফিক সিগন্যালে আটকে থাকতে না হয়, তেমন একটি ব্যবস্থা চালু করতে পারলেই মানুষ অনেকটা স্বস্তি পাবে। কারণ এ দেশের জনগণ এতটাও অবিবেচক নয়।

এমন সুন্দর সূচনা-মুহূর্তেও কিছু ঘটনা নতুন সরকার ও সরকারি দলকে অনেকটাই সমালোচনার মুখে দাঁড় করিয়েছে। প্রথমেই সমালোচনার জন্ম দিয়েছেন সড়ক পরিবহন, রেলপথ ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রী বলেছেন, পরিবহন খাতে মালিক-শ্রমিক সংগঠনের নামে তোলা টাকাকে তিনি চাঁদাবাজি বলে মনে করেন না। এই অবস্থানের পক্ষে যুক্তি দিয়ে তিনি বলেন, তারা এই টাকাটা সমঝোতার ভিত্তিতে তুলছে। জোর করে আদায় করছে না। এ জন্য চাঁদা বলা যাচ্ছে না। পরিবহন খাতের চাঁদাবাজি প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে শেখ রবিউল আলম বলেন, ‘সড়কে পরিবহনের চাঁদা যেটা বলা হয়, সেভাবে আমি চাঁদা দেখি না। মালিক সমিতি, শ্রমিক সমিতি আছে, তারা তাদের কল্যাণে এটা ব্যয় করে। এটা অলিখিত বিধির মতো। চাঁদা আমি সেটাকে বলতে চাই, যেটা কেউ দিতে চায় না বা বাধ্য করা হয়। মালিক সমিতি নির্দিষ্ট হারে টাকা তুলে মালিকদের কল্যাণে ব্যবহার করতে চায়। কতটুকু ব্যবহার হয়, সেটা নিয়ে হয়তো বিতর্ক আছে। কিন্তু তারা সমঝোতার ভিত্তিতে এ কাজটা করে।’

বাস্তবতা হলো, পরিবহন খাতে এই অর্থ দেওয়াটা অনেক ক্ষেত্রেই স্বেচ্ছামূলক নয়; বরং কাঠামোগত চাপ, সংগঠনগত আধিপত্য এবং ক্ষমতাসংশ্লিষ্ট প্রভাবের ফল। মন্ত্রী নিজেও স্বীকার করেছেন, ক্ষমতায় থাকা দলের শ্রমিক সংগঠনের আধিপত্য থাকে এবং কতটা অর্থ কল্যাণে ব্যবহৃত হয়, তা নিয়েও বিতর্ক আছে। এই স্বীকারোক্তি থেকেই বোঝা যায়, এটি একটি প্রতিযোগিতামূলক ও স্বচ্ছ কল্যাণ তহবিল নয়; বরং রাজনৈতিক ও সংগঠনগত শক্তির প্রতিফলন।

এটা ঠিক, পরিবহন খাতে মালিককল্যাণ সমিতি, শ্রমিককল্যাণ সমিতির মতো বৈধ বিভিন্ন সংগঠন আছে। কাজেই তারা সমিতির সদস্যদের কাছ থেকে চাঁদা নিতেই পারে। সেই চাঁদা সমিতির সদস্যদের কাছ থেকে যদি রসিদ কেটে কিংবা বিকাশের মাধ্যমে আদায় করা হয় এবং সমিতির ব্যাংক হিসাবে তা জমা রেখে বছর বছর নিয়মমাফিক আয়-ব্যয়ের নিরীক্ষণ করানো হয়, তাহলে সেটি নিয়ে কারও কিছু বলার থাকবে না। কিন্তু লাঠি হাতে পান্ডারা রাস্তায় গাড়ি থামিয়ে যেটা আদায় করে, সেটাকে আর যা-ই হোক সমঝোতা বলা যায় না কোনোভাবেই। সংগত কারণেই ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) বলেছে, সড়কে চাঁদাবাজিকে ‘সমঝোতার ভিত্তিতে লেনদেন’ উল্লেখ করে একটি গুরুতর অপরাধকে সড়ক পরিবহন, রেলপথ ও নৌপরিবহনমন্ত্রী বৈধতা দেওয়ার অজুহাত খুঁজছেন।

একটি বক্তব্য নিয়ে এত কথা বলার কারণ—অযাচিত দু-একটি শব্দ কিংবা মুখ ফসকে বলে ফেলা একটি বাক্যও মুহূর্তেই বিপুল জনপ্রিয় কোনো ব্যক্তিকেও এতটাই প্রশ্নের মুখে, এমনকি হুমকির মুখে ঠেলে দিতে পারে, যেখান থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ নাও মিলতে পারে। আপাতদৃষ্টিতে নির্দোষ কোনো মন্তব্যও অনেক সময় অনেক উঁচু মাপের ব্যক্তিকেও সারা জীবনের মতো হাস্যকর বানিয়ে ফেলে। অতি ক্ষমতাধর ব্যক্তিও রাতারাতি কীভাবে দেখতে পান যে, তাঁর ক্ষমতার বিশাল বেলুন সামান্য এক খোঁচায় চুপসে যায়! তার নজির তো আমাদের হাতের কাছেই রয়েছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলের একটি ঘটনা ক্ষমতাসীন দলকে ব্যাপক সমালোচনার মুখে ফেলেছে। ভাষাসৈনিক ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক অলি আহাদের মেয়ে এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের বাধার মুখে পড়েছেন। রুমিন ফারহানা কিছুদিন আগেও বিএনপিতে ছিলেন। কঠিন সময়ে তিনি দলের জন্য অত্যন্ত সাহসের সঙ্গে লড়াই করেছেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়ে বিজয়ী হন। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে প্রার্থী হওয়ায় রুমিন বিএনপির আন্তর্জাতিকবিষয়ক সহসম্পাদকের পদ হারান। তাঁকে দল থেকে বহিষ্কারও করা হয়। মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের প্রথম প্রহরের কিছু আগে কয়েক শ সমর্থক নিয়ে সরাইল কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে পৌঁছান রুমিন ফারহানা। শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য অপেক্ষা করার সময় উপজেলা বিএনপির কিছু নেতা-কর্মী সেখানে উপস্থিত হয়ে ‘ভুয়া ভুয়া’ স্লোগান দিতে শুরু করেন। একপর্যায়ে দুই পক্ষের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি শুরু হলে শহীদ মিনারের বেদির ওপর বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। রুমিন ফারহানার নেওয়া পুষ্পস্তবকটিও ছিঁড়ে ফেলা হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন না করেই এলাকা ছেড়ে চলে যান রুমিন। শহীদ মিনারে তাঁকে বাধা দেওয়ার ঘটনা কর্তৃত্ববাদী শাসনামলে ক্ষমতাসীনদের পেশিশক্তির মাধ্যমে প্রতিপক্ষ দমনের কথাই মনে করিয়ে দেয়।

এখানে রুমিন ফারহানার বাবা অলি আহাদ সম্পর্কে কিছু বলা দরকার। অলি আহাদ ঢাকা কলেজে পড়াশোনা শেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলেন। কিন্তু ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণের কারণে ১৯৪৮ সালে তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। যদিও দীর্ঘ ৫৮ বছর পর ২০০৬ সালে সেই বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হয়। ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি গঠিত পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন অলি আহাদ। সে বছরের মার্চ থেকে শুরু হওয়া ভাষা আন্দোলনে তিনি সামনের সারিতে ছিলেন। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির ঐতিহাসিক আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করার অভিযোগে তাঁকে গ্রেপ্তার করে দীর্ঘদিন কারাগারে রাখা হয়েছিল। ১৯৫৭ সালে কাগমারী সম্মেলনে মওলানা ভাসানীর সঙ্গে যুক্ত হয়ে তিনি সাম্রাজ্যবাদবিরোধী রাজনীতিতে জড়ান। পরবর্তী সময়ে তিনি ডেমোক্রেটিক লীগ প্রতিষ্ঠা করেন, যে দলটি ছিল আশির দশকে বিএনপির নেতৃত্বাধীন সাতদলীয় জোটের অন্যতম শরিক। যে শহীদ মিনার ও এর ইতিহাস নির্মাণে অলি আহাদের ভূমিকা ছিল অনন্য, সেই মিনারে শ্রদ্ধা জানাতে তাঁর মেয়েকে বাধা দেওয়ায় স্বভাবতই মানুষ আহত হয়েছেন।

সরাইলের এ ঘটনা এবং এর আগে রাজধানীতে এক মন্ত্রীর বিতর্কিত মন্তব্য যেন নতুন সরকারের সুন্দর সূচনায় সামান্য গোচোনার মতো। আশা থাকবে, সরকার ও ক্ষমতাসীন দল এমন দু-একটি ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে দ্রুত নিজেদের শুধরে নেবে। তাহলেই কেবল অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু ঘটনাকে মনে হবে, ‘মাঝে মাঝে বটে ছিঁড়েছিল তার, তাই নিয়ে কেবা করে হাহাকার—সুর তবু লেগেছিল বারে-বার মনে পড়ে তাই আজি।’

লেখক: সাংবাদিক ও গবেষক

জাপানে বাংলা ভাষার অগ্রযাত্রা

উন্নয়ন যখন ভোগান্তির নাম

যেকোনো চুক্তি করার এখতিয়ার অন্তর্বর্তী সরকারের ছিল না: ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া

রমজানে বইমেলা, আয়ের আশা নাকি নিশ্চিত ক্ষতি

জুলুম

জাপানে বাংলা ভাষার অগ্রযাত্রা

মহান শহীদ দিবস

আমাদের ভাষার সংগ্রাম ও বর্তমান সময়

বিএনপির প্রতিশ্রুতি, প্রত্যাশা ও বাস্তবতা

বিদ্যুতে লুটপাটের দায় কার