নেত্রকোনার দুর্গাপুর ও কলমাকান্দা উপজেলার মানুষের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন ছিল সোমেশ্বরী নদীর ওপর একটি টেকসই সেতু নির্মাণ। সেই স্বপ্ন পূরণে ২৭ কোটি ৩১ লাখ টাকা ব্যয়ে আব্বাসনগর এলাকায় গার্ডার সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল ২০২২ সালে। প্রকল্পের নির্ধারিত মেয়াদ ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে শেষ হলেও এখন পর্যন্ত কাজ হয়েছে কেবল খুঁটি পর্যন্ত। এই সেতুর কাজটি শেষ না হওয়ায় দুর্ভোগে পড়েছেন দুই উপজেলার লক্ষাধিক মানুষ। তবে প্রশ্ন, এমন একটি জনগুরুত্বপূর্ণ কাজ কীভাবে এমনভাবে অবহেলায় পড়ে থাকে?
এটি কেবল একটি অবকাঠামো নয়, এটি দুর্গাপুর ও কলমাকান্দা উপজেলার মানুষের কাছে নিত্যনৈমিত্তিক কাজের অতিপ্রয়োজনীয় সেতু। কারণ কৃষকের উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত করা, শিক্ষার্থীদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়া এবং মুমূর্ষু রোগীকে হাসপাতালে নেওয়ার ক্ষেত্রে সেতুটির ভূমিকা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। এলাকাবাসী সেতুর জন্য নিজেদের পৈতৃক জমি, দোকানপাট ও বসতবাড়ি পর্যন্ত ছেড়ে দিয়েছেন। অথচ বিনিময়ে তাঁরা পেয়েছেন কেবল সীমাহীন ভোগান্তি আর অনিশ্চয়তা।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বজ্ঞানহীনতা এখানে স্পষ্ট। কাজ ফেলে রেখে মালিকের ফোন বন্ধ রাখা কিংবা দায়সারা অজুহাত দেওয়া এখনকার উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর এক সাধারণ রোগে পরিণত হয়েছে যেন। এলজিইডি কর্তৃপক্ষ বলছে, জটিলতার কারণে দেরি হয়েছে এবং মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন করা হয়েছে। প্রশ্ন হলো, প্রকল্প শুরুর আগে কেন ভূমি অধিগ্রহণ, কারিগরি জটিলতা ও ত্রুটিগুলো নিরসন করা হয়নি? কাজ শুরুর আগে আশ্বস্ত করা হলেও দুই বছরেও কেন জমির মালিকেরা তাঁদের ক্ষতিপূরণ পেলেন না? এই দায়ভার কে নেবে?
ভূমি অধিগ্রহণের নামে কৃষকদের বিপাকে ফেলা আর সেতুর কাজ অর্ধসমাপ্ত রাখা—দুটিই অন্যায়। মানুষ বাধ্য হয়ে আজ নৌকায় বা নড়বড়ে বাঁশের সাঁকোতে ঝুঁকি নিয়ে নদী পার হচ্ছে। যখন কোনো প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়, তখন ব্যয়ও বাড়ে। সাধারণ মানুষের করের টাকা এভাবে অব্যবস্থাপনায় নষ্ট হতে পারে না।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত আর সময়ক্ষেপণ না করে এই প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত মেসার্স মোমিনুল হক ও শেখ হেমায়েত আলী (জেভি) নামক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দ্রুত জবাবদিহির আওতায় আনা হোক। যদি তারা কাজ করতে অপারগ হয়, তবে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে সেতু নির্মাণের কাজ শুরু করা দরকার। একই সঙ্গে ভুক্তভোগী জমির মালিকদের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
সোমেশ্বরীর বুক চিরে দাঁড়িয়ে থাকা ওই নিঃসঙ্গ পিলারগুলো যেন কেবল অবহেলার স্মৃতিস্তম্ভ হয়ে না থাকে, সেটা স্থানীয় এলজিইডি কর্তৃপক্ষকেই বিবেচনায় নিতে হবে। তাদের অবহেলায় যে ঘটনাটি ঘটেছে, সে জন্য তাদের কৈফিয়ত দেওয়ার পাশাপাশি বিভাগীয় তদন্তে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। আমরা চাই, দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই সেতুর কাজ শেষ করে স্থানীয় মানুষের যাতায়াতের দুর্ভোগের অবসান ঘটানো হোক। উন্নয়নের সুফল যেন শুধু কাগজ-কলমে নয়, মানুষের যাপিত জীবনে প্রতিফলিত হয়। অর্ধনির্মিত সেতু দিয়ে তো আর সেই সুফল আসবে না।