হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

বাংলাদেশে বইমেলার অর্থনীতি

বইমেলার অর্থনীতিই শেষ কথা নয়। তার তো একটা বৈষম্যের মাত্রিকতাও আছে। যেমন চুক্তি সম্পাদনের সময়ে নামীদামি লেখকের যে সম্মানী ধরা হয়, অন্যান্য লেখকের ভাগ্যে তা জোটে না। হয়তো তাঁদের সঙ্গে কোনো চুক্তিপত্রই সম্পাদিত হয় না। তেমনি সম্মানীর নিশ্চয়ই উল্লেখযোগ্য তারতম্য আছে প্রচ্ছদশিল্পীদের মধ্যেও।

সেলিম জাহান 

বইমেলার চাকাকে সচল রাখতে একটি বহুমাত্রিক অর্থনীতি আছে। ছবি: আজকের পত্রিকা

প্রতিবছরই বছরের শুরুতে সারা দেশে বইমেলা বসে। ফেব্রুয়ারি মাসে রাজধানী ঢাকা শহরে তো মাসব্যাপী মেলা হয়ই, এ ছাড়া জেলা-উপজেলা শহরগুলোতেও এ সময় বইমেলার হিড়িক পড়ে যায়। এ বছরও ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে ঢাকায় বইমেলা বসবে। বইমেলা উপলক্ষে মেলা প্রাঙ্গণ অপূর্ব সাজে সেজে ওঠে, প্রকাশকেরা তাঁদের স্টল সাজান। দলে দলে মানুষেরা আসে বন্ধুবান্ধব, পরিবার-পরিজনসহ, আসেন কবি-সাহিত্যিক-লেখকেরা। আসেন সাংবাদিক, রেডিও-টেলিভিশনের সংবাদ প্রতিনিধিরা সংবাদ সংগ্রহ এবং সংবাদ প্রচার ও সম্প্রচারের জন্য। বই দেখা হয় নেড়েচেড়ে, ওলটানো হয় বইয়ের পাতা, বই কেনা আর বই বিক্রির সাড়া পড়ে যায়। বইমেলাকে কেন্দ্র করে অন্যান্য ব্যবসা-বাণিজ্যেরও খোলতাই হয়। এই যেমন খাবারের দোকান, নানান শিল্প-সামগ্রীর বিপণি। চারদিকে একটা উৎসব, একটা আনন্দের আবহ।

বইমেলা এলেই আমার মনে হয় এ মেলা বহুমাত্রিক। প্রথমত, এ মেলা একটা মিলনমেলা, বই একটা উপলক্ষ। আসলে এ মেলা একটা সুযোগ হয়ে দাঁড়ায়, একটা আধার হয়ে দাঁড়ায় মিলিত হওয়ার, দেখা-সাক্ষাতের, আড্ডার আর আলাপচারিতার। ব্যস্ততার এই শহরে যাপিত নাগরিক জীবনের নানান টানাপোড়েনে আমাদের সময়ই হয় না প্রিয়জনদের দেখার, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়ার। বইমেলা দুদণ্ড সময় করে একটি ক্ষেত্র তৈরি করে দেয় সেই সব প্রশ্ন শুধাবার—‘এত দিন কোথায় ছিলেন’ কিংবা ‘বন্ধু, আছো তো ভালো?’

দ্বিতীয়ত, বইমেলা একটা সংযোগ তৈরি করে দেয় লেখকে-পাঠকে, লেখকে-লেখকে, পাঠকে-পাঠকে, প্রকাশকে-লেখকে, প্রকাশক-প্রশাসকে। সেই প্রক্রিয়ায় ঋদ্ধ হন পাঠক, উদ্বুদ্ধ হন লেখক, নতুন ধ্যান-ধারণা পেয়ে যান প্রকাশক। ফলে বুদ্ধি এবং মননের নানান দিগন্ত খুলে যায়।

কিন্তু এই সব ব্যক্তিগত এবং সামাজিক বলয় ছাড়িয়ে বইমেলাগুলোর একটা অর্থনৈতিক মাত্রিকতাও তো আছে। ২০২৪ সালের বইমেলায় ৬০ কোটি টাকার বই বিক্রি হয়েছিল, আগের বছর অর্থাৎ ২০২৩ সালে বিক্রি হয়েছিল ৪৭ কোটি টাকার। কিন্তু বইমেলার অর্থনীতি তো শুধু বই বিক্রির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, সে অর্থনীতির নানান দিক আছে। মেলার আগে নানান ধাপ আছে, সেই সব ধাপের পরতে পরতে জড়িয়ে আছে নানান অর্থনৈতিক কারবার।

বই প্রকাশ দিয়েই শুরু করা যাক। লেখক বই লিখে প্রকাশককে দিলে পরেই প্রাথমিক একটা আর্থিক লেনদেন হয়। তারপর অবশ্য বইমেলা শেষে কিংবা বছরের শেষে লেখকের সম্মানী আসে ‘রয়্যালটি’ হিসেবে। পাণ্ডুলিপি প্রাপ্তির পরে আসে সম্পাদনার কাজ, প্রচ্ছদের কাজ, কম্পিউটারের কাজ—তিনটি কাজেই সম্মানীর ব্যাপার আছে। প্রচ্ছদের জন্য প্রতিষ্ঠিত প্রচ্ছদশিল্পীদের প্রতি লেখক-প্রকাশক উভয়েরই একধরনের ঝোঁক থাকে। এবং যত দামি শিল্পী নিয়োগ করা হবে, ততই বিষয়টি ব্যয়বহুল হবে।

একসময় শুরু হয়ে যায় প্রকাশনার দক্ষযজ্ঞ। ব্যস্ত হয়ে পড়ে ছাপাখানাগুলো। দিনরাত সেখানে কাজ চলে। সে প্রক্রিয়ায় খরচ আছে কাগজের, ছাপার, ছাপাখানার কর্মীদের মজুরির। এর ওপরে চাপের মুখে যখন প্রকাশনা-অঙ্গীকার রাখতে হয়, তখন ছাপাখানার কর্মীদের বাড়তি মজুরি দিতে হয়। সারা বছরে সেটাই হয়তো তাঁদের অতিরিক্ত একটি আয়।

গত কয়েক বছরে কাগজের মূল্যবৃদ্ধি পুস্তক প্রকাশনার অর্থনীতির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ হয়ে উঠেছে। সেই সঙ্গে বই বাঁধাইয়ের খরচও নিতান্ত ফেলনা নয়। বই যত সুশোভন হবে, ততই বাঁধাই খরচও বাড়বে। মেলার শুরুতে এবং তার পরেও মেলা প্রাঙ্গণে পুস্তক পরিবহনের একটি ব্যয় আছে। আবারও মেলা উপলক্ষে পরিবহন কর্মীদের কাছে সেটা সারা বছরের জন্য একটা বিশেষ আয়।

মেলা প্রাঙ্গণ সাজানো এবং বইয়ের স্টল তৈরি নিয়ে একটা বড় অর্থনীতি কাজ করে। স্টল বানানো ও সেটাকে সাজানোর ক্ষেত্রে শিল্পী, স্থপতি এবং মিস্ত্রিদের একটা ভূমিকা আছে। খরচ আছে নকশার, সাজসরঞ্জাম, মাল-মসলার এবং সম্মানী ও মজুরির। বহুক্ষেত্রেই শিল্পী এবং স্থপতিদের সম্মানী নির্ভর করে কাকে কাজে লাগানো হচ্ছে। বড় প্রকাশনা সংস্থা যেমন খ্যাতিমান শিল্পী এবং স্থপতিদের নিযুক্ত করতে পারে, ছোট ছোট সংস্থা সেটা করতে পারে না। মেলা প্রাঙ্গণে নানান অবকাঠামো সুবিধা এবং সেবার জন্যও মেলা উদ্যোক্তাদের অর্থব্যয় করতে হয়। এসব সুবিধার মধ্যে আছে চলাচলের জন্য অস্থায়ী পথ নির্মাণ, পানীয় জলের সুবিধা, মেলার নানান জায়গায় বসবার ব্যবস্থা এবং বর্জ্য ফেলার কাঠামো গড়ে তোলা।

প্রকাশনা সংস্থাগুলোর স্টলে নিযুক্ত কর্মীদের মজুরি ব্যয় বইমেলা-অর্থনীতির একটি অংশ। প্রতিটি স্টলে পর্যাপ্তসংখ্যক কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়। বহু ক্ষেত্রেই প্রকাশনা সংস্থার স্থায়ী কর্মীর পাশাপাশি অস্থায়ী কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয় অতিরিক্ত কাজের কারণে। তাঁদের প্রশিক্ষণ এবং মজুরির জন্য অর্থব্যয় করতে হয়। বইমেলা উপলক্ষে বইয়ের স্টলগুলোকে আলোক সজ্জিত করা হয়, দীর্ঘক্ষণ সেসব বাতিকে জ্বালিয়ে রাখতে হয়, ফলে বিদ্যুতের খরচও অনেক।

এরপরে আসছে বইমেলার অর্থনীতির সেই উল্লেখযোগ্য অংশটি—বই বিক্রি। নতুন প্রকাশিত বইও যেমন বিক্রি হয়, তেমনি বিক্রি হয় পূর্ব-প্রকাশিত বইও। ২০২৪ সালের বইমেলায় সাড়ে ৩ হাজারের বেশি নতুন প্রকাশিত বই এসেছিল, মেলায় দর্শনার্থী ছিল ৬০ লাখ। যেহেতু মেলায় মোট ৬০ কোটি টাকার বই বিক্রি হয়েছিল, সুতরাং বোঝা যাচ্ছে যে প্রত্যেক দর্শনার্থী গড়ে ১০০ টাকার বই কিনেছেন। মেলায় বই বিক্রি যদি আরও ব্যাপ্ত হয়, সে ক্ষেত্রে বই বিক্রি আরও বাড়তে পারে, যা মেলার অর্থনীতিকে আরও সংহত করবে।

মেলায় প্রকাশিত বইগুলোকে সংশ্লিষ্ট প্রকাশকেরা জেলা কিংবা উপজেলা শহরে চালান করেন, পাঠান নানান পাঠাগারে। কখনো কখনো ডাকযোগেও প্রকাশিত পুস্তক পাঠকদের কাছে পাঠাতে হয়, ক্ষেত্রবিশেষে দেশের বাইরেও প্রকাশিত বইয়েরা পাড়ি জমায়। একধরনের অর্থনীতি সেখানেও জন্ম লাভ করে।

এইসব ভাবতে ভাবতে মনে হলো, বইমেলার অর্থনীতিই শেষ কথা নয়। তার তো একটা বৈষম্যের মাত্রিকতাও আছে। যেমন চুক্তি সম্পাদনের সময়ে নামীদামি লেখকের যে সম্মানী ধরা হয়, অন্যান্য লেখকের ভাগ্যে তা জোটে না। হয়তো তাঁদের সঙ্গে কোনো চুক্তিপত্রই সম্পাদিত হয় না। তেমনি সম্মানীর নিশ্চয়ই উল্লেখযোগ্য তারতম্য আছে প্রচ্ছদশিল্পীদের মধ্যেও। সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই, কোনো কোনো প্রকাশনার পেছনে বেশ পয়সা খরচ করা হয়। হয়েছে। সেসব বইয়ের কাগজ অত্যন্ত দামি। বিখ্যাত মুদ্রকের কাছে বইটি ছাপা হয়েছে। মুদ্রণের পরিশীলন বইটির পাতায় পাতায়। ভুল তেমনটা চোখে পড়ে না। বাঁধাই অত্যন্ত শক্ত, খুলে যাওয়ার কোনো আশঙ্কাই নেই। এর বিপরীতে অন্যসব বইয়ের পেছনে যে অর্থের সীমাবদ্ধতা রয়েছে, তা পরিস্ফুট। বইয়ের কাগজ অত ভালো নয়, ছাপা ভালো মানের নয়, ছাপার ভুলও অনেক। মানে, নিখুঁত সম্পাদনার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ ব্যয় করা যায়নি। বাঁধাইও হয়েছে সস্তা জায়গায়। ফলে বাঁধাইয়ের অবস্থাও সঙিন। মনে হচ্ছে, বই এখনই খুলে খুলে আসবে।

দুটি ঘটনার কথা বলি। একদিন বইমেলায় গেছি। দুজন সুবেশ ভদ্রলোক আমার সামনে চলছেন। তাঁদের পেছনে অন্য আরেকজন লোক বিশাল দুটি বইয়ের ব্যাগ দুই হাতে বহন করছেন। ব্যাগের ভারে বহনকারী প্রায় নুয়ে পড়েছেন। কানে এল, প্রথম ব্যক্তিটি পরম পরিতৃপ্তির সঙ্গে দ্বিতীয় ব্যক্তিটিকে বলছেন, ‘প্রায় বিশ হাজার টাকার কিনলাম।’

‘কী কী বই কিনলেন?’ দ্বিতীয় ব্যক্তির প্রশ্ন।

‘তা তো ঠিক বলতে পারব না। দোকানি যেগুলোকে ভালো বলেছে, সেগুলোই কিনে নিয়েছি।’ তাঁর কথা শুনে মনে হলো, তিনি যেন মাছ কিনতে বেরিয়েছিলেন। ‘সে কী! পড়ে দেখেননি?’ দ্বিতীয় ব্যক্তি আঁতকে ওঠেন।

‘পড়ার কি সময় আছে আমার? বসার ঘরে সাজিয়ে রাখব, দেখতে পাবে সবাই’, প্রথম ব্যক্তির জবাব। তাঁদের দুজনকে পাশ কাটিয়ে একটি শিশুতোষ প্রকাশনীর পাশ দিয়ে যখন আসছি, তখন আরেক দৃশ্য। বাচ্চাদের একটি বই নিয়ে বাবা-ছেলেতে টানাটানি। বুঝলাম, ছেলেটি বইটি চায়ই, কিন্তু বাবা তাঁকে নানাভাবে বোঝাচ্ছেন যে তাঁর পকেটে আর কোনো টাকাই নেই। ‘তোমাকে না তিনটা বই কিনে দিলাম, বাবা। আর তো কেনার মতো পয়সা নেই আমার কাছে।’

‘বইটার দাম বেশি না, বাবা। মাত্র ২০০ টাকা। দাও না কিনে!’ ‘না, বাবা। আজ হবে না। এর মধ্যেই ৭০০ টাকার বই কিনেছি। আর টাকা নেই আমার কাছে।’

বাবার কণ্ঠস্বরটি করুণ হয়ে ওঠে। ছেলের হাত থেকে বইটি নিয়ে বাবা ফেরত রেখে দেন, তারপর পা বাড়ান সামনের দিকে। ছেলেটি মুখ কালো করে বাবাকে অনুসরণ করে। একবার করুণ চোখে তাকায় পেছনের দিকে, ফেলে আসা বইটির দিকে।

বৈষম্যের চিহ্ন দেখা যায় বিপণির আকার, সাজানো, বাতি আর জৌলুশের মাঝেও। কোনো কোনো বিপণির আকার, সাজানো, বাতি আর জৌলুশ চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। অন্য বিপণিগুলো যেন লুকিয়ে রাখতে চাইছে নিজেকে। মনে মনে ভাবি, ওই বড় বিপণিগুলোতে না জানি কত খরচ হয়েছে—প্রখ্যাত স্থপতি, বিখ্যাত শিল্পী, দক্ষ মিস্ত্রি, দামি উপকরণ ও অনুষঙ্গ। জানি, ছোট বিপণিগুলোর সংগতি হয়নি এসব করার। কম পয়সায় কাজ সেরেছে তারা।

সব মিলিয়ে বইমেলার চাকাকে সচল রাখতে একটি বহুমাত্রিক অর্থনীতি আছে। কিছু তার দৃশ্যমান, কিছু ঘটে দৃষ্টির আড়ালে। কিছু তার সরব, কিছু নীরব। সেই সঙ্গে, বইমেলার একটা বৈষম্যও আছে। তবে সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, আমাদের দেশের বহু অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং নানান মানুষের জীবন ও জীবিকা বইমেলার ওপরে নির্ভর করে।

লেখক: অর্থনীতিবিদ

সৌরবিপ্লবের বিচ্যুতি একটি পরিকল্পিত বাধা

কানে ধরা

একটি পরিবার, রাষ্ট্র ও ভেঙে পড়া মানবতা

সরিষা ও মধু: গ্রামীণ অর্থনীতির নতুন স্বপ্ন

মার্ক টালি

বাগ্‌যুদ্ধে সব অভিযোগই কি সত্যের অপলাপ

ছাত্র সংসদ নির্বাচনের কতটুকু প্রভাব, কতটুকু বাস্তবতা

ইশতেহারে কি প্রবীণ ভোটারদের কণ্ঠস্বর থাকবে

‘আমরা যদি বড় হতাম...’

পরিবর্তনের জন-আকাঙ্ক্ষা এবং পূর্ববর্তী ঘটনার জের