হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

জাপানে বাংলা ভাষার অগ্রযাত্রা

প্রবীর বিকাশ সরকার

১৯৬৬ সালে জাপানে গঠিত হয় বাংলা ভাষা পাঠচক্র। ছবি সৌজন্য: লেখক

জাপানের সঙ্গে অবিভক্ত বাংলা অঞ্চলের সম্পর্ক শতবর্ষাধিক। ১৮৭৮ সালে জাপানের মিকাদো তথা মেইজি সম্রাট মুৎসুহিতো এবং কলকাতার পাথুরিয়াঘাটার ঠাকুর পরিবারের স্বনামধন্য ব্যক্তিত্ব সংগীতজ্ঞ, সংগীতের ইতিহাসবিদ রাজা শৌরীন্দ্রমোহন ঠাকুরের মধ্যে দুই দেশের ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র বিনিময়ের ঘটনাই জাপান-বাংলার সাংস্কৃতিক সম্পর্কের প্রকৃত সূচনা। এই ঘটনার ২০ বছর পর ১৯০২ সালে ব্রিটিশ-ভারতের রাজধানী কলকাতায় পদার্পণ করেন নমস্য জাপানি মনীষী আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন কালজয়ী লেখক গবেষক শিল্পাচার্য ওকাকুরা তেনশিন। সেই সময়কার সদ্য বিশ্বখ্যাত সনাতন ধর্মের সংস্কারক সন্ন্যাসী জাতীয়তাবাদী বিপ্লবী স্বামী বিবেকানন্দ এবং উদীয়মান কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে সাক্ষাতের ভিত্তিতে বাঁধা পড়েন তিনজন গভীর বন্ধুত্বে। ভারতীয় বৌদ্ধধর্ম, দর্শন এবং সংস্কৃতির প্রতি গভীরভাবে আকৃষ্ট ওকাকুরা এবং সদ্য শান্তিনিকেতনে আশ্রমিক শিক্ষাগুরু হিসেবে আবির্ভূত রবীন্দ্রনাথের যৌথ আগ্রহ ও পৌরোহিত্য প্রত্যক্ষভাবে জাপান-বাংলা শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক ভাববিনিময়ের সূত্রপাত ঘটে।

রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতনের ব্রহ্মবিদ্যা আশ্রমের প্রথম বিদেশি ছাত্র ছিলেন এক তরুণ বৌদ্ধ ভিক্ষু হোরি শিতোকু, যিনি ওকাকুরার ভারত ভ্রমণসঙ্গী ছিলেন সেই সময়। ওকাকুরা এবং হোরি শিতোকু বাংলা ভাষার সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলেন। তাঁরাই কি প্রথম বাংলা ভাষার সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলেন? তাঁদের আগে কোনো জাপানি নাগরিক বাংলা অঞ্চলে গিয়েছেন বলে সুস্পষ্টভাবে জানা যায় না।

ধারাবাহিকভাবে ১৯০৩ থেকে ১৯৩৫ পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরের অনেক বিখ্যাত জাপানি নাগরিক কলকাতা, শান্তিনিকেতন, ঢাকা ও চট্টগ্রামে গিয়েছেন নানা উপলক্ষে। ঊনবিংশ শতকের শেষ দিক থেকে বিংশ শতকের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত জাপানের সঙ্গে ভারতের গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসা-বাণিজ্য গড়ে উঠেছিল। জাপানের বৃহৎ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান শিপিং ও পরিবহন কোম্পানি ‘নিপ্পন য়ুসেন কাইশা’ ও ‘ওসাকা শোজেন কাইশা’; ট্রেডিং কোম্পানি ‘মিৎসুই’, ‘মিৎসুবিশি’, ‘সুমিতোমো’, ‘মিৎসুই বুস্সান’ প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ হুগলির খিদিরপুর বন্দরসংলগ্ন এলাকায় বহু জাপানি কর্মরত ছিলেন। যুদ্ধপূর্ব সময় পর্যন্ত ১০ হাজার জাপানি নাগরিক পশ্চিমবঙ্গে ছিলেন বলে জানা যায়। সন্দেহ নেই যে তাঁদের অনেকেই বাংলা ভাষা শিখেছিলেন, দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহারও করেছেন। কিন্তু তাঁদের সম্পর্কে তেমন কিছুই জানা যায় না।

জাপানিদের মধ্যে কে প্রথম বাংলা ভাষা শিখেছিলেন সঠিকভাবে জানা নেই। তবে ধারণা করা হয়, ১৯০৩ সালে কলকাতায় ভাগ্যবদলের আশায় গিয়েছিলেন একজন তরুণ প্রযুক্তিবিদ তাকেদা উয়েমোন। কিন্তু কলকাতায় সুবিধা করতে না পেরে ঢাকায় আসেন এবং খিলগাঁওয়ের এক সাবান প্রস্তুতকারী ‘বুলবুল সোপ’ ফ্যাক্টরিতে প্রধান টেকনিশিয়ান নিযুক্ত হন। এবং অল্প সময়ের মধ্যে নিজেও ‘ইন্দো-জাপানিজ সোপ ফ্যাক্টরি’ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯০৭ সালে স্থানীয় এক ব্রাহ্ম পরিবার শশিভূষণ মল্লিকের জ্যেষ্ঠ কন্যা হরিপ্রভা মল্লিককে বিয়ে করেন। কিছুদিন পর তাঁর অনুজ তাকেদা সোয়েমোন ঢাকায় আসেন এবং রানী নামে একজন নারীর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। উয়েমোন-হরিপ্রভা দম্পতি ছিলেন নিঃসন্তান, কিন্তু সোয়েমোনের তিন কন্যা সিজু, হানা ও মিতু। ভারতভাগের পর দুই ভাইয়ের পরিবারই কলকাতায় স্থায়ী হয়। বিশিষ্ট কবি, সাহিত্যিক, গবেষক ও প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও হরিপ্রভার ভাগনে প্রয়াত সুরজিৎ দাশগুপ্তের ভাষ্য থেকে জানা যায়, দুই ভাই-ই বাংলা শিখেছিলেন।

এরপর ১৯০৫ সালে জুদোও ক্রীড়াবিদ সানো জিননোসু শান্তিনিকেতনে আসেন এবং রবীন্দ্রনাথের কাছে বাংলা ভাষা শেখেন। ১৯২৪ সালে তিনি মূল বাংলা থেকে রবীন্দ্রনাথের বৃহৎ উপন্যাস ‘গোরা’ জাপানি ভাষায় অনুবাদ ছাড়াও ভারত বিষয়ে আরও একাধিক গ্রন্থ রচনা করে নমস্য হয়ে আছেন।

১৯০৭ সালে পালি ভাষা শেখার জন্য চট্টগ্রামে আসেন বিশিষ্ট বৌদ্ধপণ্ডিত ও ভিক্ষু কিমুরা নিক্কি। তিন বছর তিনি একটি প্রাচীন মহাস্থবির মন্দিরে পালি ভাষা শিখে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের আমন্ত্রণে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং উচ্চতর পালি ভাষা শিখে পালি বিভাগের অধ্যাপকের পদ অলংকৃত করেন। তিনি রবীন্দ্রনাথের সাহচর্যে থেকে বাংলা ভাষায়ও পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। ১৯১৬ এবং ১৯৪৩ সালে তিনি জাপানে যথাক্রমে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর দোভাষীর কাজে নিযুক্ত হন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পূর্বে আর কোনো জাপানি নাগরিকের নাম জানা যায় না, যিনি বাংলা ভাষা জানতেন।

১৯১৩ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এশিয়া মহাদেশে প্রথম নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হলে জাপান, চীন ও কোরিয়ায় কবির জনপ্রিয়তা পর্বতসমান উচ্চতায় পৌঁছেছিল। ১৯১৫ সালে প্রথম জাপানি ভাষায় ইংরেজি ‘গীতাঞ্জলি’ অনুবাদ করেন তরুণ সাহিত্যিক সমালোচক মাশিনো সাবুরোও। অচিরেই রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য, কর্মকাণ্ড ও তাঁর জীবন নিয়ে একটার পর একটা ইংরেজি রচনা অনুবাদের হিড়িক পড়ে যায়। রবীন্দ্রনাথকে আরও গভীরভাবে অনুধাবনের জন্য তাঁর মাতৃভাষা বাংলার প্রতি কেউ কেউ আকৃষ্ট হলেও শিক্ষালাভের সুযোগ ছিল না। কিন্তু ১৯১৬ থেকে ১৯২৯ পর্যন্ত কবির পাঁচবার জাপান ভ্রমণে তাঁর প্রদত্ত বাংলা বক্তৃতা, স্বরচিত কবিতা আবৃত্তি আবালবৃদ্ধবনিতা অনেককেই অভিভূত করেছিল। যেমন, রবীন্দ্রভক্ত বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, বৌদ্ধধর্ম গবেষক, বহুভাষী অনুবাদক, অধ্যাপক ড. ওয়াতানাবে শোওকোও বাংলা ভাষা জানতেন। তিনি মূল বাংলা থেকে ইংরেজি ‘গীতাঞ্জলি’ জাপানি ভাষায় অনুবাদ করেন। বাংলা ভাষাপ্রেমী বহুভাষী পণ্ডিত অধ্যাপক কাজুও আজুমা এবং মাদাম কেইকো আজুমা উভয়েই ড. ওয়াতানাবের কাছে বাংলা শিখেছিলেন। দীর্ঘ ৪০ বছরের বেশি সময় বাংলা ভাষা, সাহিত্য এবং রবীন্দ্র রচনা অনুবাদ ইত্যাদি বিষয়ে বিস্তর কাজ সম্পাদন করেছেন অনর্গল বাংলা বলা এই দম্পতি।

১৯৬৬ সালে জাপানে গঠিত হয় ‘বাংলা ভাষা পাঠচক্র’—বাংলাভাষী বহুভাষাবিদ অধ্যাপক ড. নারা ৎসুয়োশি, জাপানপ্রবাসী বাংলাদেশি সাংবাদিক ও শিক্ষক ইসকান্দার আহমেদ চৌধুরী ও কলকাতার বিশিষ্ট ভাষাবিদ ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কল্যাণ দাশগুপ্তের উদ্যোগে। একঝাঁক তরুণ-তরুণী ছিলেন এর শিক্ষার্থী, যাঁরা পরবর্তীকালে বিশিষ্ট বাংলাভাষী লেখক ও গবেষক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এখনো বাংলা সাহিত্য, রবীন্দ্রসাহিত্যের অনুবাদ, গবেষণা ও আলোচনা করে চলেছেন। অভূতপূর্ব প্রচুর কাজ তাঁরা সম্পাদন করেছেন, যদিও বা বৃহত্তর বাঙালি পাঠক সেসব জানেই না! হয়তো জানে না ঢাকার ‘বাংলা একাডেমি’ ও পশ্চিমবঙ্গের ‘বাংলা আকাদেমি’ কর্তৃপক্ষ।

যাঁরা স্বনামধন্য বাংলা ভাষাজ্ঞাত তাঁরা হলেন, অধ্যাপক ড. ওওনিশি মাসায়ুকি, অনুবাদিকা এবং বাংলাদেশভিত্তিক বার্ষিক ম্যাগাজিন ‘সোকা’ বা ‘উজানযাত্রী’ সম্পাদিকা সুজুকি কিকুকো, তামোৎসু নাগাই, নিশিওকা নাওকি, রবীন্দ্রসংগীত শিল্পীদ্বয় শ্রীমতী কাম্বে তোমোকো ও শ্রীমতী ওকুদা য়ুকা, অধ্যাপক গবেষক ড. তোগাওয়া মাসাহিকো উল্লেখযোগ্য। ‘বাংলা ভাষা পাঠচক্র’ দীর্ঘ বছর অনিয়মিত একটি মুখপত্র হিসেবে ‘কল্যাণী’ নামে ম্যাগাজিন প্রকাশ করেছে। মোট ১৮টি সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। এগুলোতে প্রকাশিত অধিকাংশ রচনাই ছিল রবীন্দ্ররচনা এবং বাংলা সাহিত্যের প্রথিতযশা লেখকদের রচিত মূল বাংলা রচনা থেকে জাপানি অনুবাদ। এটা যে অত্যন্ত প্রশংসনীয় এবং পরিশ্রমসাধ্য কাজ, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

জাপানে শতবর্ষী পুরোনো তোওকিয়োও গাইগোকুগো দাইগাকু তথা বিদেশবিদ্যা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ে পাঠদান চলে। বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়েও স্বল্পমেয়াদি পাঠক্রমে জাপানিরা যাচ্ছেন বাংলা ভাষা শেখার জন্য নানা উপলক্ষে। ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে এই পরিধি। ওকাকুরা তেনশিন এবং রবীন্দ্রনাথের কল্যাণে জাপানে বাংলা ভাষাশিক্ষা ও বিস্তারের ক্ষেত্রে একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ ঐতিহ্যগত রূপ ধারণ করতে চলেছে। ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে সন্দেহ নেই।

লেখক: শিশুসাহিত্যিক, কথাসাহিত্যিক ও গবেষক

সুন্দর সূচনায় সামান্য গোচোনা না দিলেই নয়

উন্নয়ন যখন ভোগান্তির নাম

যেকোনো চুক্তি করার এখতিয়ার অন্তর্বর্তী সরকারের ছিল না: ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া

রমজানে বইমেলা, আয়ের আশা নাকি নিশ্চিত ক্ষতি

জুলুম

জাপানে বাংলা ভাষার অগ্রযাত্রা

মহান শহীদ দিবস

আমাদের ভাষার সংগ্রাম ও বর্তমান সময়

বিএনপির প্রতিশ্রুতি, প্রত্যাশা ও বাস্তবতা

বিদ্যুতে লুটপাটের দায় কার