হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

পদের বিপরীতে যোগ্য লোক

আব্দুর রাজ্জাক 

নির্দিষ্ট কাজের জন্য পারদর্শী যোগ্য লোকের দরকার। কথাটি মনে পড়ে গেল এই কারণে যে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে স্বাক্ষরিত ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা চুক্তি নতুন করে রিভিউ হবে ২০২৬ সালের মধ্যে। সেখানে এক্সপার্টিস দরকার হবে। জানি না আমাদের পক্ষ থেকে কীভাবে ব্যাপারটি তুলে ধরা হবে। তবে ভারত আটঘাট বেঁধে সব তথ্য নিয়েই এগোবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ভারতের এ ব্যাপারে অভিজ্ঞ জনবল আছে।

পররাষ্ট্রনীতির ব্যাপারে পররাষ্ট্রবিষয়ক কাজ সুচারুভাবে পালনের জন্য একটি বিশেষজ্ঞ গ্রুপ থাকা অত্যাবশ্যক। এই বিশেষজ্ঞ গ্রুপ যে শুধু সরকারের মধ্যে থাকবে এমনও নয়—কোনো আলাদা ইনস্টিটিউট থাকতে পারে, সেখানে নির্দিষ্ট এলাকা ভাগ করে নির্দিষ্ট ব্যাপারে নীতি তৈরি ও দৈনন্দিন যোগাযোগ অথবা কোনো চুক্তির ক্ষেত্রে কোন বিষয়ে প্রাধান্য দেবে, সে ব্যাপারেও সঠিক ধারণার যোগ্য ব্যক্তি দরকার হয়। একই রকমভাবে কাস্টমসের ক্ষেত্রেও বিশেষজ্ঞ গ্রুপ তৈরি করা দরকার। শুধু জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কাস্টমস ক্যাডারের লোকজনই যে এই ব্যাপারে সব নীতিনির্ধারণ করবেন, এমনও নয়। হতে পারে কোনো বিশেষ ইনস্টিটিউটের প্রতিনিধি অথবা জাতীয় রাজস্ব বোর্ড নিয়ে গবেষণা করা কোনো প্রতিষ্ঠান কিংবা কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞ গবেষক জাতীয় রাজস্ব সংরক্ষণের স্বার্থে এ ব্যাপারে মতামত যেন দিতে পারেন—এই রকম যোগ্য ব্যক্তি প্রয়োজন। যোগ্য ব্যক্তি যেন তৈরি হয়, যেকোনো সময় তাঁদের ডাকলে মতামতের জন্য বা পরামর্শের জন্য যেন পাওয়া যায়, সেই রকম ব্যক্তিদের তদারকিতে যেন নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়—এ ব্যাপারে অনেক আগে থেকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে গবেষণাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা উচিত ছিল।

বাণিজ্যনীতি প্রণয়ন কিংবা আন্তর্মহাদেশীয় কিংবা বিপক্ষীয় বাণিজ্যনীতির ক্ষেত্রে বিশেষ প্রয়োজন এই রকম বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত যোগ্য ব্যক্তি। নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও শুধু নিরাপত্তা বাহিনী যে সবকিছু করবে, বিশেষ করে নীতি প্রণয়ন করবে, তা নয়।

নীতি প্রণয়ন নীতির বাস্তবায়ন, এই সম্পর্কে যথোপযুক্ত একটি করে ইনস্টিটিউট অথবা কাউন্সিল থাকা দরকার। তাঁরা যে সশস্ত্র বাহিনীর বা নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য হবেন, এমন কোনো কথা নেই, হতে পারেন গবেষক, অধ্যাপক বা নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রাজ্ঞ গুণী ব্যক্তি। আপৎকালীন দুর্বিপাকে সরকার এসব প্রতিষ্ঠান কিংবা বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিদের পরামর্শ নিয়ে প্রতিরক্ষার ব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে পারে।

আমেরিকার বিভিন্ন গুণী ব্যক্তি, গবেষক বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে অথবা বাংলাদেশের রাজনীতি সম্পর্কে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কলাম লিখেছেন এবং এখনো লিখে যাচ্ছেন। তাঁদের লেখা প্রকাশ করার আগে বলা হয়, এই ব্যক্তি উপমহাদেশ অথবা বাংলাদেশ সম্পর্কে ‘এত’ বছর ধরে গবেষণা করে যাচ্ছেন, তাঁর ‘এতটি’ বই আছে, ‘এতটি’ আর্টিকেল আছে। এই রকম ডজন ডজন ব্যক্তির মতামত আমরা বিভিন্ন পত্রিকায় দেখতে পাই। যদিও আমাদের আর্থসামাজিক অবস্থা সেই রকম নয়, তবু ছোট করে হলেও বিভিন্ন বিষয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত কোনো ব্যাপারে সিদ্ধান্তের জন্য কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কি গড়ে উঠেছে এখনো? বিশেষায়িত দু-চারটি এ রকম প্রতিষ্ঠান আছে, কিন্তু তাদের কাছ থেকে উল্লেখযোগ্য তেমন কোনো গবেষণালব্ধ উপদেশ আমরা পাই কি না, সে ব্যাপারে কিন্তু ভেবে দেখা দরকার। আমার মনে হয় উল্লেখযোগ্য তেমন কোনো প্রতিষ্ঠান বা সামাজিক সংস্থা কিংবা যোগ্য লোক নিজ উদ্যোগে হোক অথবা রাষ্ট্রীয় সাহায্য নিয়ে হোক, কোনো গ্রুপ বা গবেষণা প্রতিষ্ঠান তেমন গড়ে ওঠেনি।

ওপরের কথাগুলো বললাম বৃহৎ আকারে। সচরাচর দৈনন্দিন জীবনে আমাদের রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রেও যোগ্য পদের জন্য যোগ্য লোকের দরকার আছে। প্রতিটি রাজনৈতিক দলের মধ্যে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত একটি গ্রুপ থাকা দরকার। সেই রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় আসুক অথবা বিরোধী দলে থাকুক, তাদের মধ্যে যেন বিভিন্ন মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট এক্সপার্টাইজ থাকে। ওই সব গ্রুপ থেকে যেন ওই মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী বানানো হয়। আবার বিরোধী দলে থাকলে ওই সব নির্দিষ্ট মন্ত্রণালয় সম্পর্কে যেন বিভিন্ন মতামত দিতে পারে, সরকারের ভুল-ত্রুটি ধরিয়ে দিতে পারে, সেই রকম যোগ্য ব্যক্তি গড়ে তোলা দরকার।

আপনারা একটু লক্ষ করলে দেখবেন, আমাদের মন্ত্রণালয়ের সচিব থেকে সহকারী সচিব পর্যন্ত অনেক কর্মকর্তা আছেন—হয়তো তিনি পণ্ডিত ব্যক্তি, হয়তো তিনি অনেক দক্ষ; কিন্তু তিনি যে পদে বসে আছেন, যে পদের জন্য দৈনন্দিন কাজ করে যাচ্ছেন, সেই পদের জন্য তিনি বিশেষভাবে দক্ষ কি না, সেভাবে তাঁর মানসিকতা, যোগ্যতা গড়ে উঠেছে কি না, এটা কিন্তু দেখার দরকার যেন তিনি সঠিক তথ্য-উপাত্ত ও অভিজ্ঞতা নিয়েই কোনো প্রস্তাব দিতে পারেন বা নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রাখতে পারেন।

মন্ত্রণালয়ের অনেক আমলা আছেন, যাঁদের লেখাপড়া, অভিজ্ঞতা, যোগ্যতা হয়তো নির্দিষ্ট পদের জন্য যথাযথ নয়; তবু তাঁদের ওই সব মন্ত্রণালয়ে পদায়ন করা হচ্ছে। প্রথম এক-দুই মাস তাঁরা কোনো কিছু বুঝেই উঠতে পারছেন না। তারপরে চাকরি রক্ষার্থে কোনো রকমে দুই থেকে তিন বছর কাটিয়ে দেন। দেখা যাবে এই যোগ্য ব্যক্তিরা অন্য কোনো মন্ত্রণালয়ের কিংবা অন্য কোনো পদের বিপরীতে তাঁদের মেধার যথেষ্ট সাক্ষ্য রাখতে পারতেন। কিন্তু আমাদের আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সেটা হয়ে ওঠে না।

রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষেত্রেও বিভিন্ন ব্যক্তি আন্দোলন-সংগ্রাম ও অভিজ্ঞতা দিয়ে তাঁদের জীবনকে গড়ে তুলেছেন। সবাই যে মন্ত্রী-এমপি হবেন, এমন কোনো কথা নেই। মন্ত্রী-এমপি না হয়েও দলের অভ্যন্তরে থেকে দলকে সঠিক বুদ্ধি দিতে পারেন তাঁদের লেখাপড়া, যোগ্যতা ও পাণ্ডিত্যের মাধ্যমে। এভাবেই প্রস্তুতি নিয়ে দল গঠন করা উচিত, দলের মধ্যে বিভিন্ন ইন্টেলেকচুয়াল গ্রুপ তৈরি রাখা উচিত, দলের আপৎকালে যেন এসব যোগ্য ব্যক্তি সঠিক পরামর্শ দিতে পারেন। দলের মধ্যে এ রকম নীতির চর্চা করা উচিত। একক নেতার ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল না হয়ে পরে দলের মধ্যে থেকেই যেন যোগ্য পণ্ডিত, গুণী, জ্ঞানী ব্যক্তিরা ক্রাইসিস মোমেন্ট মোকাবিলা করতে পারে, সেইভাবেই প্রস্তুত থাকা উচিত।

এত কিছু বললাম এই কারণে যে বর্তমান সময়ে আমরা যে অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, সেটার একটা বড় কারণ—বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে আপৎকাল মোকাবিলার জন্য তেমন কোনো গ্রুপ দেখছি না, বিশেষ করে ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টের অনেক ঘাটতি আছে। ইউরোপ, আমেরিকাসহ পশ্চিমা বিশ্বে বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রকে উপদেশ দেওয়ার জন্য, আপৎকাল মোকাবিলা করার জন্য প্রতিষ্ঠান আছে, যথেষ্ট জ্ঞানী ও গুণী ব্যক্তিরা প্রস্তুত আছেন। আমরাও যেন সেই রকম গুণী ব্যক্তি প্রস্তুত রাখি। আর এটি হতে পারে যোগ্য লোককে যোগ্য পদে পদায়ন করার মধ্য দিয়ে।

লেখক: প্রকৌশলী

গ্যাস নিয়ে অন্তরালের সখ্য ও বিপর্যস্ত জ্বালানি খাত

স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রামের অবিনাশী নাম

এখনো চলছে

জাতিসংঘ কি জেগে আছে

এলপিজির কারসাজিতে অসহায় জনগণ

আধুনিক নগরসভ্যতার অভিশাপ বায়ুদূষণ

প্রযুক্তির সুনিপুণ ব্যবহার

রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় দেশের জ্বালানি খাতকে ধ্বংস করা হয়েছে

নির্বাচন বড় মজার জিনিস

অর্ধনির্মিত সেতু