হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

নির্বাচন বড় মজার জিনিস

বিমল সরকার

প্রবাদপ্রতিম বাঙালি রাজনীতিক শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক ঢাকার এক জনসভায় (১১ জুলাই ১৯৫৮) বলেছিলেন, ‘ইলেকশন বড় মজার জিনিস। এ সময় যে যা-ই বলেন তা-ই সত্য।’ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দেশে আজ এমনই পরিস্থিতি বিরাজ করছে বলে মনে হচ্ছে। ভাঙা-গড়া, গ্রহণ-বর্জন, পুরস্কার-তিরস্কার, ভর্ৎসনা-প্রশংসা—এমন আরও কত কিছু। তলে তলে আরও কী ঘটছে বা ঘটে চলেছে, সব খবর কি আর সাধারণের গোচরে আসে?

সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে এখন রাজনীতির ভরা মৌসুম। সারা বছর কিংবা অন্য সময় যেমনই হোক, সংসদ নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে এলে রাজনীতিকদের তৎপরতা অনেকগুণ বেড়ে যায়। আর রাজনৈতিক অস্থিরতা বা উত্তপ্ত পরিস্থিতি বিরাজ করলে তো কোনো কথাই নেই, শুরু হয় একেকজনের দৌড়ঝাঁপ। গণনায় কর্মী সংখ্যা একেবারে নগণ্য হলেও দলীয় নেতাদের সে কী উৎসাহ আর উদ্যম! দলের নামকরণ, অফিসঘর ভাড়া নেওয়া, সদস্য সংগ্রহ করা, নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধন—এমন আরও কত কাজ, কত দায়িত্ব। একদিকে দলকে দাঁড় করানো, অন্যদিকে নির্বাচনী তৎপরতা চালিয়ে যাওয়া।

ঘুম-বিশ্রামেরও সময় নেই। নির্বাচনের আগমুহূর্তে বিশেষ করে খুচরো বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের এখন এমনই অবস্থা।

আজ থেকে অন্তত ৪০ বছর আগে, আশির দশকের প্রথম দিকে ‘রাজনীতির জুতা আবিষ্কার’ শিরোনামে একটি বই পড়েছিলাম। যতদূর মনে পড়ে, বইটির লেখক বাংলাদেশ বেতারের সাবেক অনুষ্ঠান ঘোষক আবুল হাসান। জেনারেল এরশাদ তখন রাষ্ট্রক্ষমতায়। সামরিক অধ্যাদেশবলে দেশে সভা-সমাবেশ ও মিছিলসহ সব ধরনের রাজনৈতিক কর্মতৎপরতা নিষিদ্ধ। বইটি লেখার সময় এমনকি ‘ঘরোয়া রাজনীতির’ দরজাটাও বোধ করি খোলা হয়নি। ১৯৮৬ সালের সংসদ নির্বাচন ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচন, এমনকি ১৯৮৫ সালের হ্যাঁ-না ভোটের তারিখও অনেক দূরে।

এমন পরিস্থিতিতে উল্লিখিত শিরোনামের বইখানা আমার এক বন্ধুর কাছ থেকে হাতে পেয়ে এর কভারপৃষ্ঠা দুটি বেশ কৌতূহলভরে অনেকক্ষণ ধরে দেখি। কভারপৃষ্ঠার দুই পাশের লেখাগুলো পড়ে বইটি পড়ার আগ্রহ আমার আরও বেড়ে যায়—এর ভেতরে তাহলে কী লেখা আছে? নিউজপ্রিন্টে ছাপানো অনধিক ১০০ পৃষ্ঠার বইটির অবয়ব ও ছাপার মান সাধারণ পাঠককে তেমন আকর্ষণ করার মতো না হলেও এর দুই পাশে এলোমেলো অক্ষর ও আঁকাবাঁকা (অনেকটা আশি ও নব্বইয়ের দশকে সুপরিচিত ‘উন্মাদ’ নামের সাপ্তাহিক ম্যাগাজিনটির আদলে) শব্দ দিয়ে লেখা কল্পিত কিছু রাজনৈতিক দলের নাম সচেতন যেকোনো ব্যক্তিকে ভিন্ন এক ভাবনার জগতে নিয়ে যাবে বলে আমার বিশ্বাস।

উল্লিখিত কয়েকটি কল্পিত রাজনৈতিক দলের নাম অনেকটা এমন (বহু বছর আগের ঘটনা স্মৃতির ওপর ভর করে লেখায় নামগুলো অবিকল নাও মিলতে পারে): ‘উত্তরপাড়া মহাদুর্ভিক্ষ দল’, ‘গাঁয়ে মানে না আপনি মোড়ল পার্টি’, ‘ওয়ান ম্যান ওয়ান পার্টি’, ‘চাচা আপন প্রাণ বাঁচা পার্টি’, ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি দল’, ‘লেজেগোবরে লীগ’, ‘খাই খাই পার্টি’, ‘আপনি বাঁচলে বাপের নাম পার্টি’, ‘চাচা ভাতিজা মামা ভাগিনা দল’ প্রভৃতি। বইটিতে লেখক কিছু ঘটনা ও কল্পিত চরিত্রের মাধ্যমে গল্প এবং আড্ডার ছলে দেশে বিরাজমান আর্থসামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে পাঠক সাধারণকে জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন বলে আমার মনে হয়েছে। সংঘটিত দু-চারটি বিদেশি ঘটনা ও দৃষ্টান্তেরও অবতারণা করা হয় এতে।

এর আগে সত্তরের দশকে নানা নামের বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দলের আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল, এই ধারা দেশে এখনো চলমান। এগুলোর মধ্যে বাহারি নামেরও ছিল দু-একটি। ১৯৮০ সালে দেশে ঠিক এমনই ‘বাংলাদেশ ইসলামী আওয়ামী লীগ’ নামে নতুন একটি রানৈতিক দলের আত্মপ্রকাশ ঘটে। আলহাজ গোলাম মোর্শেদ নামের এক ব্যক্তি ছিলেন দলটির আহ্বায়ক। নবগঠিত ইসলামী আওয়ামী লীগের স্লোগান নির্বাচন করা হয় ‘জয় আল্লাহ’ এবং ‘জয় বাংলা’। (দৈনিক ইত্তেফাক: ১৪ জানুয়ারি ১৯৮০, পৃষ্ঠা ৩)

কেবল জেলা নয়, একদম উপজেলা স্তরে ‘প্রধান কার্যালয়’ বানিয়ে নতুন দল গঠন করে চালিয়ে যেতেও দেখা যায়। দলের মধ্যে ‘প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান’ বা ‘আজীবন সভাপতি’ এমন পদ সৃষ্টি করে নিজের ইচ্ছানুযায়ী কর্তৃত্ব-নেতৃত্ব চালিয়ে যাচ্ছেন একেকজন। ৩০০ আসনের মধ্যে প্রার্থী হিসেবে একটি বা দুটিতে দাঁড়ানো কিংবা দাঁড় করানো। নিজ দলের অনুকূলে বরাদ্দ করা প্রতীকে সবসুদ্ধ দেড়-দুই শ ভোট পাওয়া—তা সত্ত্বেও নির্বাচনী তৎপরতায় উৎসাহে কোনো ভাটা নেই তাদের।

কেবল কি দল? না, নির্বাচনী মৌসুমে সুযোগ বুঝে তাঁরা নতুন জোট বা মোর্চা গঠন কিংবা তৈরি জোট বা মোর্চায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার জন্যও বিশেষভাবে তৎপর ও উৎসাহী হয়ে ওঠেন।

নিজ এলাকায় থাকেন না, বলতে গেলে অপরিচিত মুখ। দুর্যোগ-দুর্বিপাকে নেই, দেখা যায় না কোনো সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে। অথচ জনপ্রতিনিধি হয়ে মানুষের সেবা করার কী অদম্য বাসনা! হায় রাজনীতি! হায় গণতন্ত্র!

‘জুতা আবিষ্কার’ নামে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি বিখ্যাত ব্যঙ্গ কবিতা রয়েছে। ‘রাজনীতির জুতা আবিষ্কার’ বইটির নামকরণ কালজয়ী ওই কবিতাটিকে স্মরণ করিয়ে দেয়। পরিশেষে শেরেবাংলাকে শ্রদ্ধাভরে আবারও স্মরণ করি। ইলেকশন বা নির্বাচন আসলেই বড় মজার জিনিস। ইলেকশন এলেই কেবল রাজনীতির গতি-প্রকৃতি এবং রাজনীতিকদের মতি-গতি এমন সবকিছু সম্পর্কে সঠিক ধারণা পাওয়া যায়।

বিমল সরকার, অবসরপ্রাপ্ত কলেজশিক্ষক ও কলাম লেখক

রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় দেশের জ্বালানি খাতকে ধ্বংস করা হয়েছে

অর্ধনির্মিত সেতু

জাতীয় নির্বাচন নিয়ে কি অস্বস্তিগুলো কাটল

প্রশ্নপত্র ফাঁস ও মেধাবীদের দীর্ঘশ্বাস

সংসদ নির্বাচন ও গণভোট নিয়ে কিছু কথা

পোস্টাল ব্যালট-কাণ্ড

বিপন্ন ৩২ পরিবার

পথের শেষ কোথায়, খেয়াল নেই

জাতীয় নির্বাচন এবং দুটি কথা

নিরাপত্তা