হোম > জাতীয়

কারা অধিদপ্তরের সংবাদ সম্মেলন: বিদেশি বন্দীর মরদেহ ফেরত নিতেও অনাগ্রহ

‎নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা‎

প্রতীকী ছবি

দেশের কারাগারে থাকা বিদেশি বন্দীদের সাজা শেষ হলেও ফেরত নেয় না তাদের দেশ। এমনকি মারা গেলেও অনেকের মরদেহ নিতে আগ্রহ দেখায় না। গত দুই বছরে বিভিন্ন কারাগারে ১৭ জন বিদেশি বন্দীর মৃত্যু হলেও কেবল ভারত দুজনের মরদেহ ফেরত নিয়েছে। ফেরত না নেওয়া মরদেহ তিন মাস অপেক্ষা করে যার যার ধর্ম অনুযায়ী দাফন/সৎকার করা হয়। তিনটি মরদেহ এখনো মর্গে রয়েছে।

এসব তথ্য জানিয়েছেন কারা মহাপরিদর্শক (আইজি প্রিজন) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন। তিনি বলেছেন, দেশের কারাগারগুলোতে ধারণক্ষমতার দ্বিগুণের বেশি বন্দী রয়েছে। ২০২৪ সালে দেশের বিভিন্ন কারাগার ভেঙে পালিয়ে যাওয়া ৯ জন জঙ্গিসহ ২ হাজার ২৪৭ বন্দীর মধ্যে তিন জঙ্গিসহ ৬৯০ জন পলাতক রয়েছে। নরসিংদী কারাগার থেকে পালানো বন্দীদের মধ্যে ১৬৬ জনের তথ্য খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

রাজধানীর বকশীবাজারে কারা অধিদপ্তরে গতকাল মঙ্গলবার সংবাদ সম্মেলনে কারা মহাপরিদর্শক এসব তথ্য জানান। তিনি জানান, বর্তমানে দেশের বিভিন্ন কারাগারে ৩৭৯ জন বিদেশি বন্দী রয়েছে। তাদের মধ্যে ১৭০ জনের সাজা শেষ হলেও দেশে ফেরার প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়ায় তারা কারাগারে আছে। তাদের নিজ দেশে পাঠাতে সংশ্লিষ্ট দূতাবাস ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে যোগাযোগ চলছে। তিনি বলেন, বিদেশি বন্দী মারা গেলে বিধি অনুযায়ী মরদেহ তিন মাস পর্যন্ত সংরক্ষণ করা হয়। পরিবার বা সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধি মরদেহ নিতে না এলে ডিএনএ নমুনা সংরক্ষণ করে নিয়ম অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হয়। যেসব বিদেশি বন্দীর মরদেহ নেওয়া হয়নি, তাদের বেশির ভাগই আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের নাগরিক।

বন্দীরা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পায় না, চিকিৎসার অভাবে অনেকে মারা যায়—এমন অভিযোগের বিষয়ে আইজি প্রিজন বলেন, ২০২৫ সালে দেশের কারাগারগুলোতে ১৮৭ জন এবং ২০২৬ সালে ১২২ বন্দীর মৃত্যু হয়েছে। গত সাত মাসে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ৫৬ হাজার বন্দী চিকিৎসা নিয়েছে। বর্তমানে ১২২ বন্দী কারাগারের বাইরে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে। তাঁরা উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। বন্দীদের মৃত্যুর ঘটনায় স্বজনদের পক্ষ থেকে নির্যাতনের অভিযোগের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, কারা কর্তৃপক্ষের কোনো গাফিলতি নেই। তবে কারাগারগুলোতে চিকিৎসকের ঘাটতি রয়েছে।

ধারণক্ষমতার দ্বিগুণের বেশি বন্দী

কারা মহাপরিদর্শক জানান, ৭৫টি কারাগারে ধারণক্ষমতার দ্বিগুণের বেশি বন্দী রয়েছে। কারাগারগুলোর ধারণক্ষমতা ৪৫ হাজার, তবে গতকাল ৯৮ হাজার বন্দী ছিল। তারপরও বন্দীদের ব্যবস্থাপনা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, উগ্রবাদে জড়িত অনেক বন্দীকে আলাদা রাখা দরকার। তবে অতিরিক্ত বন্দীর চাপের কারণে আবাসন বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অতিরিক্ত বন্দীর চাপ কমাতে ইতিমধ্যে দুটি কেন্দ্রীয় কারাগার ও আটটি জেলা কারাগার চালু করা হয়েছে।

বন্দী বেড়ে যাওয়ার বিষয়ে আইজি প্রিজন বলেন, গত জুন থেকে এ পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন এলাকায় ভ্রাম্যমাণ আদালতে (মোবাইল কোর্ট) ২৬ হাজার জনকে সাজা দেওয়া হয়েছে। তাদের কম সময়ের জন্য শাস্তি দেওয়া হয়। কিন্তু তাতে কারাগারে চাপ পড়ে। বিষয়গুলো সরকারকে জানানো হয়েছে।

এখনো পলাতক ৬৯০ বন্দী

২০২৪ সালে গণ-অভ্যুত্থানের সময় দেশের বিভিন্ন কারাগার ভেঙে ২ হাজার ২৪৭ জন বন্দী পালিয়ে গিয়েছিল জানিয়ে আইজি প্রিজন বলেন, তাদের মধ্যে এখনো ৬৯০ জন পলাতক রয়েছে। নরসিংদী কারাগার থেকে ৮২৬ জন বন্দী পালিয়েছিল। তাদের মধ্যে ১৬৬ জনের তথ্য এখনো খুঁজে পাচ্ছে না কারা কর্তৃপক্ষ। এ ছাড়া কারাগার থেকে পালানো ৯ জঙ্গি বন্দীর মধ্যে ছয়জন গ্রেপ্তার হলেও তিনজন পলাতক।

ভিডিও কলে বন্দীদের কথা বলার সুযোগ দেওয়া হবে

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, বিদেশের বিভিন্ন কারাগারের মতো বন্দীদের স্বজনদের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলার সুযোগ দেওয়া হবে। কারাগারে বন্দীদের মোবাইল ফোন ব্যবহারের অভিযোগ প্রসঙ্গে আইজি প্রিজন বলেন, গত এক বছরে প্রায় ৩ হাজার মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়েছে। বর্তমানে মোবাইল ব্যবহারের প্রবণতা কমে এসেছে। অনেক বন্দীকে জ্যামার থাকা বিশেষ জোনে রাখা হয়েছে। ফলে কারাগারে মোবাইল নিলেও জ্যামারের কারণে ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না।

কারাগারে থাকা কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী ও সাবেক এমপিদের মোবাইল ফোন ব্যবহারের অভিযোগ প্রসঙ্গে আইজি প্রিজন বলেন, তাঁরা মোবাইলে কথা বলছেন না—এ বিষয়ে শতভাগ নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে এর সঙ্গে জড়িতদের ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। আওয়ামী লীগ আমলের মন্ত্রী ও এমপিদের কারাগারে কোনো বিশেষ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে না।

কারা মহাপরিদর্শক জানান, কারা বিভাগে দীর্ঘদিনের জনবলসংকট কাটাতে ১ হাজার ৮৯৯টি নতুন পদ অনুমোদন করা হয়েছে। আরও ১ হাজার ৫০০টি পদের চাহিদা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে।

আইজি প্রিজন জানান, গত ২৪ জুন থেকে মুন্সিগঞ্জ জেলা কারাগারে ‘ক্যাসলেস’ পদ্ধতিতে কার্যক্রম পরিচালনা হচ্ছে। এতে কারাগারের কার্যক্রমে আরও বেশি স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তিনি জানান, কারাগারে তৃতীয় লিঙ্গের (হিজড়া) বন্দীদের রাখাও চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠেছে। আলাদা রাখার চেষ্টা করা হলেও বর্তমানে তাদের জন্য পৃথক কোনো কারাগার বা বিশেষ ব্যবস্থা নেই।

যেসব কারারক্ষী ও কর্মকর্তা মাদক, অবৈধ লেনদেনসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়েছেন, তাঁদের বিরুদ্ধেও গত দুই বছরে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানান আইজি প্রিজন। তিনি বলেন, বিভিন্ন অপরাধে ২১ জনকে বাধ্যতামূলক অবসর, ৮২ জনকে চাকরিচ্যুত, ৩০৩ জনের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং ৫৭০ জনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।