র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) বিলুপ্ত করে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) নামে নতুন বিশেষায়িত পুলিশ ইউনিট গঠনের উদ্যোগ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির দাবি, প্রস্তাবিত আইনে ব্যাপক ও অস্পষ্ট ক্ষমতা দেওয়ার মাধ্যমে নতুন নামে আরও ক্ষমতাধর ও কার্যত জবাবদিহিহীন একটি বাহিনীর আইনি ভিত্তি তৈরি করা হচ্ছে।
আজ রোববার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে টিআইবি বলেছে, র্যাবের বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম ও নির্যাতনের গুরুতর অভিযোগ ও প্রমাণ রয়েছে। ফলে, শুধু বাহিনীর নাম পরিবর্তন করে নতুন ইউনিট গঠন করলে অতীতের একই ধরনের ক্ষমতা ও সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা থেকেই যায়।
বিবৃতিতে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, র্যাব বিলুপ্তির নীতিগত সিদ্ধান্ত ইতিবাচক হলেও একটি বাহিনীর নাম পরিবর্তন করলেই প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার হয় না। নতুন বাহিনীর কাঠামো, জনবল, ক্ষমতা, বলপ্রয়োগের বিধান ও জবাবদিহির ব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন আনতে হবে। র্যাবের বদলে ‘এসআরবি’ নামে একই ধরনের ক্ষমতা ও সংস্কৃতির বাহিনী গড়ে উঠলে সেটি হবে পুরোনো প্রতিষ্ঠানের শুধু খোলস বদলানোর শামিল। কেবল ‘কসমেটিক মেকওভার’ দিয়ে নাগরিক বা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বিভ্রান্ত করা যাবে না।
প্রস্তাবিত আইনে পুলিশ বাহিনীর বাইরে সশস্ত্র বা প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যদের প্রেষণে এসআরবিতে অন্তর্ভুক্তির সুযোগ রাখার বিষয়েও আপত্তি জানিয়েছে টিআইবি। এ বিধান স্থায়ীভাবে বাতিলের দাবি জানিয়েছে সংস্থাটি।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, অভ্যন্তরীণ পুলিশিংয়ে সামরিক যুদ্ধকৌশল ব্যবহারের ঝুঁকি এ বিধানের মাধ্যমে বহাল থাকবে। একই সঙ্গে র্যাবের জনবল কোনো ধরনের যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়াই নতুন বাহিনীতে স্থানান্তরের সুযোগ রাখা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছে টিআইবি।
সংস্থাটির দাবি, অতীতে র্যাবে দায়িত্ব পালনের সময় বিচারবহির্ভূত হত্যা, নির্যাতন বা গুমের মতো অপরাধে অভিযুক্ত কিংবা জড়িত সদস্যদের নতুন বাহিনীতে অন্তর্ভুক্তি ঠেকাতে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ ‘ভেটিং’ প্রক্রিয়া বাধ্যতামূলক করতে হবে।
প্রস্তাবিত এসআরবি আইনে গোয়েন্দা নজরদারি, অভিযান, তল্লাশি ও সাধারণ তদন্তসহ বিভিন্ন ধরনের ক্ষমতা দেওয়ার বিষয়টিও তুলে ধরেছে টিআইবি। সংস্থাটির মতে, ‘অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষা’ ও ‘সরকার কর্তৃক নির্দেশিত অন্যান্য দায়িত্ব’-এর মতো অস্পষ্ট শব্দবন্ধ বাহিনীটির ক্ষমতার অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
টিআইবির ভাষ্য, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ভিন্নমত দমন বা অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের সুযোগ তৈরি হলে অতীতের মতো বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঝুঁকিও থেকে যাবে। এ ছাড়া সন্দেহের ভিত্তিতে পরোয়ানা ছাড়া তল্লাশি ও গ্রেপ্তার এবং এসআরবির নিজস্ব হাজতখানা ও জিজ্ঞাসাবাদকক্ষ রাখার সুযোগ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে সংস্থাটি।
প্রস্তাবিত আইনের ২২ ধারায় অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য যে ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, সেটিকেও স্বার্থের দ্বন্দ্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছে টিআইবি। সংস্থাটির দাবি, এসআরবির অতিরিক্ত মহাপরিচালক ও অন্য পুলিশ কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠিত ‘অভিযোগ প্রতিকার কমিটি’ কোনোভাবেই স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে পারবে না।
এর পরিবর্তে পুলিশ ও নির্বাহী বিভাগের প্রভাবমুক্ত মানবাধিকার ও আইন বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে স্বাধীন তদারকি কর্তৃপক্ষ গঠনের দাবি জানিয়েছে টিআইবি। একই সঙ্গে তদন্ত প্রতিবেদন জনসমক্ষে প্রকাশ এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের আইনি অধিকার নিশ্চিত করার বিধান রাখার সুপারিশ করেছে সংস্থাটি।
টিআইবি বলেছে, র্যাব বিলুপ্তির মধ্য দিয়ে সরকারের সামনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাঠামোগত সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি হয়েছে। নতুন বাহিনীর ক্ষমতার সুস্পষ্ট সীমারেখা, স্বাধীন তদারকি, সদস্যদের স্বচ্ছ যাচাই, বিচারিক সুরক্ষা ও কার্যকর প্রতিকার নিশ্চিত না হলে র্যাব বিলুপ্তির মূল উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হবে।
র্যাব বিলুপ্তি যেন শুধু নাম ও খোলস পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং মানবাধিকার লঙ্ঘন ও দায়মুক্তির সংস্কৃতির অবসান ঘটিয়ে আইনের শাসন, নাগরিক অধিকার ও জবাবদিহিভিত্তিক নতুন আইন প্রয়োগকারী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সূচনা হয়—এমন প্রত্যাশা জানিয়েছে টিআইবি।
‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) বিল, ২০২৬’-এর ধারাওয়ারি বিশ্লেষণ ও সুপারিশসংবলিত একটি পলিসি ব্রিফ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ও সংসদীয় কমিটির কাছে পাঠিয়েছে টিআইবি। বিলটি চূড়ান্ত করার আগে এসব সুপারিশ বিবেচনা এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও অংশীজনদের সম্পৃক্ত করার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।