দেশে সারের কোনো সংকট নেই—এ বক্তব্য খোদ কৃষিমন্ত্রীর। গতকাল শনিবার দুপুরে ফরিদপুরে কৃষি মন্ত্রণালয় এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন। তবে মাঠের চিত্র ভিন্ন; কৃষকেরা বলছেন, তাঁরা চাহিদা অনুযায়ী সার পাচ্ছেন না। যা পাচ্ছেন, তারও দাম নেওয়া হচ্ছে ১৫০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত বেশি। সার নিয়ে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন কৃষক। তাঁরা দ্রুত এ সমস্যার সমাধান চান।
ময়মনসিংহের কৃষকের অভিযোগ, সরকার-নির্ধারিত দামে সার পাওয়ার কথা থাকলেও অনেক ডিলার ও খুচরা বিক্রেতা নানা অজুহাতে বাড়তি দাম নিচ্ছেন। বিশেষ করে ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও পটাশ সার কিনতে গিয়ে তাঁদের অতিরিক্ত টাকা গুনতে হচ্ছে। কোথাও কোথাও সার নেই বলে কৃষককে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে, আবার পরে বেশি দামে সেই সারই বিক্রি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
কৃষকেরা বলছেন, আমন মৌসুমে ধানের উৎপাদন খরচ এমনিতেই বেড়েছে। এর মধ্যে সারের দাম বাড়তি নেওয়ায় তাঁদের ওপর আর্থিক চাপ আরও বাড়ছে। উৎপাদন খরচ তুলতেই হিমশিম খেতে হবে। তাঁদের দাবি, বাজার ও ডিলার পর্যায়ে নিয়মিত মনিটরিং জোরদার করা হলে অতিরিক্ত দামে সার বিক্রির প্রবণতা বন্ধ করা সম্ভব।
সারের এমন চিত্র জেলার ১৩ উপজেলাতেই। হালুয়াঘাট উপজেলার ধুরাইল ইউনিয়নের স্কুলশিক্ষক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘সার অতিরিক্ত দামে বিক্রি হচ্ছে। আমি আমার ইউনিয়ন ডিলারের কাছে সার কিনতে গেলে তিনি বলেন সার নেই। অথচ খোলাবাজারে অতিরিক্ত দামে সার পাওয়া যাচ্ছে। ডিলারকে বস্তাপ্রতি কয়েক শ টাকা অতিরিক্ত দিলে মেলে।’
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. এনামুল হক বলেন, চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত সার মজুত ও সরবরাহ রয়েছে। ফলে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বাড়তি দামে সার বিক্রির কোনো সুযোগ নেই। এ ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বেশ কয়েকটি স্থানে অভিযান চালিয়ে সার জব্দের পাশাপাশি জরিমানা করা হয়েছে।
চলতি মৌসুমে যশোরে সারের সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে বলে দাবি করেছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। তবে কৃষকেরা বলছেন, তাঁরা চাহিদা অনুযায়ী সার পাচ্ছেন না। এ ছাড়া সরকার-নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে তাঁদের সার ক্রয় করতে হচ্ছে। এ নিয়ে কৃষকের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর তথ্যমতে, এবার আমন মৌসুমে জেলায় ১ লাখ ৩২ হাজার ৬৯২ হেক্টর জমিতে আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
আগস্ট মাসে এসব জমির জন্য ১০ হাজার ৭০৪ টন ইউরিয়া, ৩ হাজার ৮২ টন টিএসপি, ২ হাজার ৭৮২ টন ডিএপি ও ২ হাজার ৬৩১ টন এমওপি সার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত বরাদ্দের মধ্যে ৮ হাজার ৫৩৪ টন ইউরিয়া, ২ হাজার ৮১০ টন টিএসপি, ২ হাজার ১৪০ টন ডিএপি ও ২ হাজার ২৩১ টন এমওপি তোলা হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, কৃষকপর্যায়ে সরকার-নির্ধারিত প্রতি ৫০ কেজির বস্তা টিএসপি সারের খুচরা মূল্য ১ হাজার ৩৫০ টাকা। একই পরিমাণ এমওপি ১ হাজার টাকা, ডিএপি ১ হাজার ৫০ টাকা এবং ইউরিয়া ১ হাজার ৩৫০ টাকা দরে বিক্রির কথা।
চৌগাছা উপজেলার আন্দুলিয়া গ্রামের কৃষক শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘দুই বস্তা কিনতে চাইলে এক বস্তা পাওয়া যাচ্ছে। এরপরও সরকার-নির্ধারিত দামে সার পাওয়া যাচ্ছে না।’
ঝিকরগাছা উপজেলার নারাঙ্গালী গ্রামের কৃষক মো. আবদুল আলিম বলেন, ‘অনেক ঘুরে খোলাবাজার থেকে প্রতি কেজি ৫২ টাকা দরে ২০ কেজি টিএসপি কিনে জমিতে দিয়েছি। এ ছাড়া ১ হাজার ৫০০ টাকা দরে দুই বস্তা ইউরিয়া কিনেছি।’
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর যশোর কার্যালয়ের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা তরিকুল ইসলাম বলেন, জেলায় কোনো সার সংকট নেই। কিছু ডিলার কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করছেন।
মেহেরপুরের গাংনীতেও সার সংকটের খবর পাওয়া গেছে। সরকারি দাম ইউরিয়া ১ হাজার ৩৫০ টাকা, টিএসপি ১ হাজার ৩৫০ টাকা এবং ডিএপি ১ হাজার ৫০ টাকা নির্ধারণ হলেও বিক্রয় হচ্ছে ইউরিয়া ১ হাজার ৫৫০ টাকা, টিএসপি ১ হাজার ৯০০ টাকা এবং ডিএপি ১ হাজার ৭০০ টাকা করে।
ধানচাষি আলতাব হোসেন বলেন, ‘খুচরা দোকানে গিয়ে ইউরিয়া, ডিএপি ও টিএসপি সার পাচ্ছি। কিন্তু দাম দেখে মাথা ঘুরে যাচ্ছে। ডিলারদের কাছে সার নিতে গেলে আমরা পাই না। চাষির কান্নাও কেউ দেখে না।’
দেশে সারের কোনো সংকট নেই, ষড়যন্ত্র করে দাম বাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কৃষি এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ। একই সঙ্গে তিনি অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন। এ ছাড়া কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্যের জন্য সরকার কাজ করে যাচ্ছে এবং আগামী তিন বছরের মধ্যে কৃষিপণ্যে স্বয়ংসম্পন্ন হয়ে রপ্তানি করা হবে বলে তিনি জানিয়েছেন।
গতকাল দুপুরে ফরিদপুরে কৃষি এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মন্ত্রী এসব কথা বলেন। জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সম্মেলনকক্ষে এই সভা হয়।
কৃষিমন্ত্রী বলেন, ‘প্রতিবছর যে পরিমাণ সারের প্রয়োজন হয়, সরকার তার থেকে কমপক্ষে ১৬ লাখ টন সার অতিরিক্ত আমদানি করে থাকে। এবারও সারের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। কিন্তু কিছু দুষ্কৃতকারী ষড়যন্ত্র করে সারের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। কৃষক গেলে বলে সার নেই, যখন বলে এই কয় টাকা বেশি দেব, তখন বলে সার আছে। অতিলোভী কিছু ব্যবসায়ী ষড়যন্ত্র করার চেষ্টা করছে।’
[প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন ময়মনসিংহ, যশোর, ফরিদপুর ও গাংনী প্রতিনিধি]