ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পুলিশ বাহিনীতে নিয়োগ পাওয়া অন্তত ৫০ হাজার কনস্টেবলের বড় একটি অংশের পরিবারের সঙ্গে দলটির রাজনীতির সম্পৃক্ততা রয়েছে। এ ছাড়া অনেকের নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাব, ভুয়া স্থায়ী ঠিকানা ব্যবহার ও জেলা কোটা অপব্যবহার হয়েছে। তদন্তে এসব তথ্য উঠে এসেছে। তবে এই বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থার ধরন নিয়ে সরকার দোটানায় পড়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তর ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র এসব তথ্য জানিয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কনস্টেবলদের নিয়োগ-সংক্রান্ত মাঠপর্যায়ের তদন্ত শেষ হয়েছে। তদন্তে বড় একটি অংশের নিয়োগপ্রক্রিয়ায় অনিয়ম ধরা পড়েছে। তবে তাঁদের বিরুদ্ধে একযোগে কঠোর ব্যবস্থা নিলে পুলিশ বাহিনীতে কনস্টেবল পর্যায়ে বড় ধরনের জনবলসংকট তৈরি হবে। তাই যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলনামূলক কম গুরুতর, তাঁদের আপাতত অগুরুত্বপূর্ণ ইউনিটে পদায়নের বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। তদন্তে অর্থের বিনিময়ে চাকরি পাওয়ার অভিযোগের পক্ষে জোরালো তথ্য পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বিগত সরকারের আমলে পুলিশের নিয়োগে বিভিন্ন পর্যায়ে অনিয়ম হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তর বিষয়গুলো তদন্ত করেছে। তদন্ত শেষ পর্যায়ে রয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১৪-২০২৪ সাল পর্যন্ত পুলিশ বাহিনীতে অন্তত ৫০ হাজার ট্রেইনি রিক্রুট কনস্টেবল (টিআরসি) নিয়োগ দেওয়া হয়। এসব নিয়োগে এক জেলার প্রার্থীকে অন্য জেলার কোটায় নিয়োগ, রাজনৈতিক সুপারিশের তালিকা ব্যবহার, লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রার্থীদের বাদ দিয়ে দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ এবং আলাদা কক্ষে পরীক্ষা নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। সবচেয়ে বড় অভিযোগ ছিল, নিয়োগপ্রাপ্তদের বড় একটি অংশের পরিবারের সদস্যদের আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততা ও অনেকের একসময় ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত থাকা। এ ছাড়া বিশেষ কয়েকটি জেলার প্রার্থীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার অভিযোগও ওঠে। বিএনপির সরকার ক্ষমতায় আসার পর এসব অভিযোগ তদন্তের জন্য পুলিশ সদর দপ্তরকে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্দেশ দেওয়া হয়।
নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিটি জেলায় পুলিশ সুপারকে (এসপি) প্রধান করে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন), ডিআইও-১ ও রিজার্ভ অফিস ইন্সপেক্টরকে কমিটির সদস্য করা হয়। তদন্ত প্রতিবেদন গত এপ্রিলের মধ্যে পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। পুরো কার্যক্রম তদারকি করছে সদর দপ্তরের রিক্রুটমেন্ট অ্যান্ড ক্যারিয়ার প্ল্যানিং শাখা।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জেলা পর্যায়ে তদন্তে পুলিশের গোয়েন্দারা আওয়ামী লীগ আমলে নিয়োগপ্রাপ্ত কনস্টেবলদের বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে চারটি বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করেন। এর মধ্যে ছিল ভুয়া স্থায়ী ঠিকানা ব্যবহার, অন্য জেলার প্রার্থীকে স্থানীয় বাসিন্দা হিসেবে দেখানো, অর্থের বিনিময়ে বিশেষ সুবিধা গ্রহণ এবং রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে অগ্রাধিকার বা বৈষম্যের অভিযোগ।
তদন্ত প্রতিবেদনের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, তদন্ত প্রতিবেদনে ট্রেইনি রিক্রুট কনস্টেবল পদে নিয়োগপ্রাপ্তদের একটি বড় অংশের পরিবারের আওয়ামী লীগ (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) বা এর সহযোগী সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার তথ্য এসেছে। বেশ কিছু ক্ষেত্রে নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তির নিজেরও ছাত্রলীগের রাজনীতিতে সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। পাশাপাশি গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর, মাদারীপুর, শরীয়তপুর, কিশোরগঞ্জসহ কয়েকটি জেলার প্রার্থীদের তুলনামূলক বেশি নিয়োগ পাওয়ার বিষয়টিও তদন্তে উঠে এসেছে। কয়েকটি জেলায় অন্য জেলার প্রার্থীদের জমি কেনার ভিত্তিতে স্থানীয় বাসিন্দা দেখিয়ে জেলা কোটায় নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগেরও সত্যতা পাওয়া গেছে। তবে অর্থের বিনিময়ে চাকরি নেওয়ার অভিযোগের পক্ষে জোরালো কোনো তথ্য তদন্তে পাওয়া যায়নি।
তদন্তে অংশ নেওয়া পুলিশের রাজশাহী রেঞ্জের বগুড়ার একজন উপপরিদর্শক (এসআই) নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তাঁর থানা এলাকায় নিয়োগপ্রাপ্ত ১৩ জন কনস্টেবলের স্থায়ী ঠিকানা ও রাজনৈতিক পরিচয় যাচাই করা হয়েছে। রাজনৈতিক পরিচয় ও ঠিকানা যাচাই তুলনামূলক সহজ হলেও নিয়োগ পরীক্ষায় অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগের প্রমাণ সংগ্রহ করা কঠিন ছিল। কয়েক বছর আগের নিয়োগ হওয়ায় টাকার বিনিময়ে চাকরি নেওয়ার তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করাও সম্ভব হয়নি।
পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ পাওয়া অনেক সদস্যের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত থাকার তথ্য তদন্ত কমিটির কাছে এসেছে। তিনি বলেন, তদন্ত শেষ হয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো, এত বিপুলসংখ্যক সদস্যের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সেটি নিয়েই দোটানা চলছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের আরেক পদস্থ কর্মকর্তা বলেন, বর্তমানে বাহিনীতে কনস্টেবল পর্যায়ে জনবলের ঘাটতি রয়েছে। ফলে তদন্তাধীন সদস্যদের অনেকেই এখনো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে কর্মরত আছেন। চেইন অব কমান্ডের বিভিন্ন পর্যায়ে তাঁদের কেউ কেউ নীরবে বাধা সৃষ্টি করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু এত বিপুলসংখ্যক সদস্যের বিরুদ্ধে একসঙ্গে সিদ্ধান্ত নেওয়াও কঠিন। আপাতত তাঁদের শনাক্ত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, পুলিশের প্রায় দেড় লাখ কনস্টেবলের মধ্যে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই ৫০ হাজারের বেশি কনস্টেবল নিয়োগ দেওয়া হয়। ওই সরকারের ১৫ বছরে পুলিশে নিয়োগপ্রাপ্ত বাকিরা উপপরিদর্শক (এসআই)।
বিএনপি ও সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোর দীর্ঘদিনের অভিযোগ ছিল, আওয়ামী লীগ সরকার পুলিশ বাহিনীকে দলীয়করণ করেছে। বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের ধরপাকড়, গুম, নির্যাতন ও দমন-পীড়নে পুলিশকে ব্যবহার করতেই দলীয় বিবেচনায় লোকজনকে বাহিনীতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।
গণ-অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর পুলিশ বাহিনীতে ব্যাপক সংস্কারের দাবি জোরালো হয়। ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে পুলিশের একটি অংশের প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে বাহিনীর ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ প্রেক্ষাপটে বাহিনীর নিয়োগসহ বিভিন্ন অনিয়ম খতিয়ে দেখতে পুলিশ সদর দপ্তর ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে বিশেষ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মুহাম্মদ নুরুল হুদা বলেন, নিয়োগপ্রক্রিয়া যদি স্বচ্ছ ও মেধাভিত্তিক হয়, তাহলে ভবিষ্যতে এ ধরনের তদন্তের প্রয়োজন পড়বে না। সব সরকারেরই উচিত ছোট-বড় কোনো নিয়োগেই রাজনৈতিক পছন্দ-অপছন্দের প্রভাব না রাখা। নিয়োগপ্রক্রিয়া রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থাকলে পুলিশ বাহিনীর পেশাদারত্বও অক্ষুণ্ন থাকবে।