আট জেলায় টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে হওয়া বন্যার পানি নেমে গেলেও নিচু কিছু এলাকা এখনো জলাবদ্ধ। সেসব এলাকায় বন্যা-পরবর্তী জনস্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়েছে। ইতিমধ্যে গত বুধবার পর্যন্ত পাঁচ দিনে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়েছে ২ হাজার ৬৩০ জন। এর মধ্যে ডায়রিয়ায় আক্রান্তের হারই বেশি।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বন্যার পানি নামার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় দ্বিতীয় দুর্যোগ। দূষিত পানি, ভেঙে পড়া স্যানিটেশন ব্যবস্থা, নিরাপদ পানির সংকটের মধ্যে বন্যার্ত মানুষ ঘরে ফেরে। তখন ডায়রিয়া, আমাশয়, হেপাটাইটিস-এ, চর্মরোগ, চোখ ও শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ, টাইফয়েড এবং সাপের দংশনের ঘটনা বাড়তে থাকে। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে শিশু, গর্ভবতী নারী, বয়স্ক এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, সাম্প্রতিক বন্যায় প্রাণ হারানো ব্যক্তিদের মধ্যে ১৭ জন বজ্রপাতে এবং পাঁচজন সাপের দংশনে মারা গেছে। ১০ থেকে ১৫ জুলাই দুপুর পর্যন্ত ডায়রিয়া, শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ, সাপের দংশন, পানিতে ডোবা, চর্মরোগ, চোখের প্রদাহ ও আঘাতসহ বিভিন্ন কারণে ২ হাজার ৬৩০ জন অসুস্থ হয়েছে। এর মধ্যে শুধু ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে ১ হাজার ৩০৪ জন। ১৫ জুলাই পর্যন্ত মাঠপর্যায়ে ৩ হাজার ১১৭টি মেডিকেল টিম বন্যাদুর্গতদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে কাজ করছে। এসব টিম আশ্রয়কেন্দ্র ও দুর্গত এলাকায় চিকিৎসা, জরুরি ওষুধ সরবরাহ এবং রোগের পরিস্থিতির ওপর নজরদারি করছে।
চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন মো. জাহাঙ্গীর আলম ১৩ জুলাই জানান, জেলার বন্যাদুর্গত বাঁশখালী ও সাতকানিয়া উপজেলায় বিভিন্ন মেডিকেল টিম কাজ করছে এবং জরুরি ওষুধপত্র সরবরাহ করা হচ্ছে।
এ ছাড়া চন্দনাইশ উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রশ্মি চাকমা জানান, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নতুন করে অর্ধশতাধিক রোগী ভর্তি হয়েছে। ভর্তি হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে সর্বোচ্চ ১১ জনই সাপে কাটা রোগী। বাকিরা সর্দি-কাশি, তীব্র শ্বাসকষ্ট, পেটের ব্যথা ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে এসেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বন্যা-পরবর্তী সবচেয়ে বড় জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ হলো নিরাপদ পানির সংকট, ভেঙে পড়া স্যানিটেশন ব্যবস্থা ও স্বাস্থ্যবিধির ব্যাঘাত। বন্যার পানি নামার পরের দুই থেকে তিন সপ্তাহ রোগ সংক্রমণের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সময়।
অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে এবারও বন্যা-পরবর্তী রোগ মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া আছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান। তিনি বলেন, স্থানীয় স্বাস্থ্য প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।
বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর নিরাপদ পানি, শুকনো খাবার, দ্রুত রোগ নজরদারি এবং গর্ভবতী নারী ও ছোট শিশুদের স্বাস্থ্যসেবায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন। আজকের পত্রিকাকে তিনি বলেন, বন্যার শুরুতে সাপের দংশন, আঘাত ও পানিতে ডুবে যাওয়ার ঘটনা বেশি দেখা যায়। পরে খাদ্য ও পানিবাহিত রোগের প্রকোপ বাড়ে। পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা ভেঙে পড়া ও নিরাপদ পানির সংকট এ ঝুঁকি আরও বাড়ায়।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. সেখ ফজলে রাব্বি আজকের পত্রিকাকে বলেন, বন্যা-পরবর্তী রোগ মোকাবিলায় পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট বিতরণ করা হয়েছে। পাশাপাশি খাওয়ার স্যালাইন, কলেরার স্যালাইন, আমাশয়ের ওষুধসহ প্রয়োজনীয় ওষুধ হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত আছে। স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ডায়রিয়া, চর্মরোগ, চোখের প্রদাহ ও শিশুদের নিউমোনিয়ার লক্ষণ পর্যবেক্ষণ করছেন। গর্ভবতী নারীদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা নিশ্চিত করতে ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রের নিবন্ধন তথ্য ব্যবহার করে তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে।