জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) না থাকায় দেশের বিভিন্ন প্রান্তিক ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর অনেক মানুষ সরকারি বিভিন্ন সেবা এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। আর জন্মনিবন্ধন না থাকা, ঠিকানা ও পরিচয়সংক্রান্ত জটিলতাসহ নানা কারণে তাঁদের এনআইডি পেতে সমস্যা হচ্ছে।
গতকাল বুধবার রাজধানীতে এসডিজি- বিষয়ক তিন দিনের সম্মেলনের শেষ দিনের অধিবেশনে বিভিন্ন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি এ সমস্যার কথা তুলে ধরেন।
রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন, সংস্কার ও উন্নয়নের জন্য পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত কাঠামো এবং এসডিজি’ শীর্ষক অধিবেশনটি অনুষ্ঠিত হয়। এটি ছিল শেষ দিনের প্রথম অধিবেশন। অধিবেশনে প্রধান অতিথি ছিলেন সমাজকল্যাণমন্ত্রী আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন।
সরকারের পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি) ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের গভর্ন্যান্স ইনোভেশন ইউনিট (জিআইইউ) যৌথভাবে এসডিজি-বিষয়ক সম্মেলনটির আয়োজন করেছে। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ‘এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম, বাংলাদেশ’।
সিপিডির অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান অধিবেশনে পেশ করা মূল প্রবন্ধে বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতি এবং সরকারের বিভিন্ন সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংস্কার উদ্যোগ বাস্তবায়নের অগ্রগতি নজরদারিতে নতুন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ‘ম্যানিফেস্টো ওয়াচ’ চালু করা হয়েছে। বাংলাদেশ রিফর্ম ট্র্যাকার’-এর আওতায় চালু হওয়া এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অগ্রগতি নাগরিকেরা সরাসরি পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন।
সম্মেলনের আয়োজকেরা জানান, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও রাজনৈতিক পক্ষপাত বন্ধে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী প্রদেয় সুযোগ-সুবিধাগুলো প্রকাশ্যে বিলবোর্ডে প্রদর্শনের বিষয়টিও মনিটর করবে এই ট্র্যাকার। ম্যানিফেস্টো ওয়াচ-এ দুর্নীতিবিরোধী সংস্কার, নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার, শ্রম অধিকার নিশ্চিতকরণসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ইস্যু বেছে নিয়ে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অগ্রগতি দেখা যাবে। ‘সার্চ’ অপশনে নির্দিষ্ট কী-ওয়ার্ড ব্যবহার করে জাতীয় উন্নয়ন বা রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অগ্রগতির তথ্যও পাওয়া যাবে।
এরপর উন্মুক্ত আলোচনায় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রান্তিক মানুষের প্রতিনিধি নিজেদের সমস্যা ও দাবির কথা তুলে ধরেন। রাজধানীর মিরপুর মাজার রোড এলাকার ভ্যানচালক মো.ওয়াসিম বলেন, তার এলাকায় অনেক ছিন্নমূল মানুষের এনআইডি নেই। ফলে তাঁরা বিভিন্ন সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি রামিসা চৌধুরী বলেন, তাদের এনআইডি করতে নানা ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। তরুণ সমাজের প্রতিনিধি সোহানুর রহমান বলেন, নৌকায় ভাসমানভাবে বাস করা বরিশালের মান্তা সম্প্রদায়ের অনেক মানুষ এখনো এনআইডি পাননি।
এসব বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ও নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘এনআইডি হলো অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের প্রথম পদক্ষেপ। এনআইডি না থাকলে মানুষ রাষ্ট্রের বিভিন্ন সেবা ও সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়েন।’
এর আগে অনুষ্ঠানের শুরুতে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, শুধু প্রবৃদ্ধির হার কত হচ্ছে, তা দেখলে হবে না। উন্নয়নের কাঠামো ও গুণগত মানও দেখতে হবে। দেশে দারিদ্র্য বিমোচনের গতি সম্প্রতি কমেছে এবং বৈষম্য বেড়েছে। বাস্তবতা হলো, প্রতি তিনজন শিক্ষিত ব্যক্তির মধ্যে একজন বেকার।
এ অবস্থায় সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করে নীতি প্রণয়নের ওপর জোর দেন এ জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ।
‘দ্রুতগতিতে এগোতে হবে’ অধিবেশনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সমাজকল্যাণমন্ত্রী আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘এসডিজি বাস্তবায়নে বাংলাদেশের অবস্থান এখন ১১০ তম। লক্ষ্য অর্জনের জন্য হাতে পাঁচ বছরেরও কম সময় রয়েছে। তাই এখন দ্রুতগতিতে এগোতে হবে। সরকার সবার জন্য বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় কাজ করছে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন বলেন, আর্থিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে। ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড বাস্তবায়িত হচ্ছে। সরকার সবাইকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করতে চায়।
সংসদ সদস্য সেলিমা রহমান বলেন, মূলত জন্মনিবন্ধন না থাকায় অনেকের এনআইডি করতে জটিলতা হচ্ছে। এ সমস্যা সমাধানে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি আশ্বাস দেন।
অধিবেশন সঞ্চালনা করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন।