হোম > জাতীয়

৪৩ মাসে নিখোঁজ ৭২ হাজার শিশু

আমানুর রহমান রনি, ঢাকা 

প্রতীকী ছবি

কুমিল্লায় নিখোঁজের পরদিন গত শনিবার মরদেহ পাওয়া গেছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের ১৩ বছরের সন্তান ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের। একই দিন সুনামগঞ্জে অচেতন বাবার পাশ থেকে তিন ভাই-বোনের মরদেহ এবং মানিকগঞ্জে মা-বাবার মরদেহের পাশ থেকে দেড় বছরের আলিজা নূরের নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়েছে। ঘটনা পৃথক হলেও এই পাঁচ শিশুই হয়েছে নৃশংসতা ও হত্যার শিকার।

প্রায় প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও শিশুরা হত্যা, নৃশংসতার শিকার হচ্ছে। নিখোঁজ হচ্ছে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, গত তিন বছর সাত মাসে (৪৩ মাস) ৭২ হাজার ৪৮৯ শিশুর নিখোঁজের ঘটনায় থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হয়েছে। অবশ্য নিখোঁজ শিশুদের ৯০ শতাংশের বেশি উদ্ধার হয়েছে বলে দাবি পুলিশের। তবে তাদের কতজনকে জীবিত ও কতজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, সেই তথ্য আলাদাভাবে করা নেই পুলিশ সদর দপ্তরে।

বেসরকারি মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) বলেছে, চলতি বছরের প্রথম আট মাসে সারা দেশে ২৫৪ শিশু খুন হয়েছে। তাদের মধ্যে নিখোঁজের পর মরদেহ উদ্ধার হয়েছে ৩৬ শিশুর।

রাজধানীর খিলক্ষেত এলাকা থেকে গত বৃহস্পতিবার নিখোঁজ হয়েছে হাবিবুল্লাহ নাঈম নামে ১২ বছরের এক শিশু। এ ঘটনায় তার মা থানায় জিডি করেছেন। তবে গতকাল রোববার রাত পর্যন্ত তার সন্ধান পায়নি পরিবার। তাদের বাড়ি নাটোরের নলডাঙ্গার নাটোর গ্রামে। বাবা বাবুল ইসলাম ও শরীফা খাতুনের সঙ্গে খিলক্ষেতের কুর্মিটোলা স্কুল রোড এলাকায় থাকত।

নিখোঁজ নাঈমের চাচা গোলাম হুসাইন বলেন, নাঈমের কাছে থাকা মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া গেছে। ‎‎

খিলক্ষেত থানার ওসি মো. সোহরাব আল হোসাইন গতকাল বলেন, শিশুটিকে খুঁজে পেতে অভিযান চলছে।

৯ সেপ্টেম্বর সকালে গাজীপুরের টঙ্গী পূর্ব থানার গাজীপুরা কাজীপাড়ার সুমন মার্কেট এলাকা থেকে নিখোঁজ ৮ বছরের শিশু আলিফের খোঁজও পাওয়া যায়নি। নিখোঁজের ঘটনায় টঙ্গী পূর্ব থানায় জিডি হয়েছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সারা দেশে শূন্য থেকে নয় বছর বয়সী শিশু নিখোঁজের জিডি হয়েছে ৪৭৪টি। তাদের মধ্যে উদ্ধার হয়েছে ৪০৬ জন। ৬৮ জন উদ্ধার হয়নি। একই সময়ে ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশু নিখোঁজের জিডি হয়েছে ১৫ হাজার ২৪৩ জন। তাদের মধ্যে উদ্ধার হয়েছে ১৩ হাজার ২৭৩ জন। উদ্ধার হয়নি ১ হাজার ৯৭০ জন। অর্থাৎ এ সময়ে শূন্য থেকে ১৭ বছর বয়সী মোট ১৫ হাজার ৭১৭ নিখোঁজ শিশুর মধ্যে উদ্ধার হয়নি ২ হাজার ৩৮ জন; যা মোট নিখোঁজের ১৩ শতাংশ।

পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০২৫ সালে সারা দেশে ২২ হাজার ৫৫০ জন, ২০২৪ সালে ১৬ হাজার ৪১৪ জন এবং ২০২৩ সালে ১৭ হাজার ৮০৮ জন শিশু নিখোঁজের জিডি হয়েছে। পুলিশের হিসাব অনুযায়ী, প্রতিবছর নিখোঁজের ৯০ শতাংশের বেশি শিশু উদ্ধার হয়।

শিশু নিখোঁজ হওয়ার বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তর বলেছে, শূন্য থেকে ৯ বছর বয়সী শিশুরা সাধারণত পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে অপরিচিত স্থানে ঘুরতে গিয়ে পথ ভুলে, পরিবারের সদস্যদের নাম-ঠিকানা বলতে না পারা এবং একাকী বাসায় ফিরতে গিয়ে অন্য স্থানে চলে যাওয়া ইত্যাদি কারণে নিখোঁজ হয়। ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সীরা অভিমান করে, পড়ালেখার চাপ, অনৈতিক কাজে জড়িয়ে লজ্জার ভয়ে পালিয়ে থাকা, স্বাধীন জীবনযাপনের আকাঙ্ক্ষা, পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে অর্থ বা অন্য কোনো সুবিধা আদায়ের কৌশল, পারিবারিক কলহ ও অশান্তি এবং বন্ধু বা সহপাঠীদের প্রভাব ইত্যাদি কারণে নিখোঁজ হয়।

তবে নিখোঁজ অনেক শিশুর পরিবারের অভিযোগ, নিখোঁজের পরপর থানার পুলিশকে বিষয়টি জানালেও তাদের তৎপরতা তাৎক্ষণিক শুরু হয় না। কখনো কখনো পুলিশ জিডি নিতেও অনীহা দেখায়। তারা আগে আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে খুঁজতে বলে। এরপর না পাওয়া গেলে জিডি করার পরামর্শ দেয়।

চাঁদপুরের মতলব থেকে ৫ সেপ্টেম্বর মাদ্রাসাছাত্র সাবের ইসলাম শাফি (১০) মাদ্রাসায় যাওয়ার পথে নিখোঁজ হয়। খোঁজাখুঁজি করে না পেয়ে দুদিন পর স্থানীয় থানায় শিশুটির বাবা সোহেল প্রধান জিডি করেন।

শাফির পোশাকশ্রমিক মা সাথী আক্তার গতকাল কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, ‘আমি থানায় গেলে পুলিশ কেবল বলে দেখতেছি। কিন্তু রাস্তার সিসি ক্যামেরা পর্যন্ত একবার দেখল না তারা। ১৫ দিনেও পুলিশ কিছু বলতে পারছে না।’

সাথী আক্তারের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ওই জিডির তদন্ত কর্মকর্তা ও মতলব থানার উপপরিদর্শক শুভজিৎ পল বলেন, ‘ছেলেটা রাগ করে হয়তো চলে গেছে, হয়তো লেখাপড়া ভালো লাগে না, তাই নিজে কোথাও পালিয়ে আছে। তার সঙ্গে মোবাইল নেই, তাই কোনো কিছু পাচ্ছি না।’

নিখোঁজ শিশুদের খুঁজে পেতে সহযোগিতা করছে মুন অ্যালার্ট নামে একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। তারা শিশুদের নিখোঁজের বিষয়ে অ্যাপস ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অ্যালার্ট জারি করে। এই প্ল্যাটফর্মের উদ্যোক্তা জিরো মিসিং চিলড্রেন ফাউন্ডেশন। দুই বছর ধরে সংস্থাটি কাজ করছে।

ওই ফাউন্ডেশনের সভাপতি মো. সাদাত রহমান বলেন, নিখোঁজদের পরিবার থানায় গেলে জিডি করা নিয়ে একটি জটিলতা সৃষ্টি হয়। আবার জিডি হলেও দ্রুত খোঁজার কাজে বিলম্ব হয়। নিখোঁজের তিন ঘণ্টার মধ্যে শিশুটিকে উদ্ধার করা সহজ। ওই সময় পেরিয়ে গেলে বিষয়টি জটিল হয়। কিন্তু পুলিশ সাড়া দেয় বিলম্বে। কখনো কখনো থানা থেকে আগে আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে খুঁজে এসে জিডি করতে বলা হয়। তিনি বলেন, নিখোঁজদের খুঁজে পেতে পুলিশের আলাদা সেল গঠন করতে হবে। যেন সঙ্গে সঙ্গে তারা কাজ শুরু করতে পারে। সেই লজিস্টিক সাপোর্টও তাদের থাকতে হবে।

মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিসংখ্যান বলছে, গত জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত সারা দেশে ২৫৪ শিশু খুন হয়েছে। এর মধ্যে নিখোঁজের পর ৩৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে এবং ২৪ শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। এ ছাড়া শারীরিক নির্যাতন করে হত্যা ৬৮ জনকে, গৃহে নির্যাতনের পর খুন ৪৯ জন, বিভিন্ন সময় মরদেহ উদ্ধার হয়েছে ২৩ জনের। এ ছাড়া ধর্ষণের চেষ্টা, আত্মহত্যা, গৃহকর্মীর কাজে গিয়ে খুন, শিক্ষকের নির্যাতনে নিহত, অপহরণের পর হত্যা এবং যৌন নির্যাতনের পর আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটছে।

মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বলেন, নিখোঁজের পর পুলিশ তৎপর হলে এত নৃশংস ঘটনা ঘটত না। থানা-পুলিশ জিডি ও মামলা নিতে চায় না। কারণ, ঊর্ধ্বতনেরা এটাকে অপরাধ হিসেবে মূল্যায়ন করে। তাই অপরাধ কম দেখাতে এসব জিডি নিতে চায় না। নিখোঁজ শিশুদের উদ্ধারে পুলিশকে আন্তরিক হতে হবে। তিনি বলেন, নিখোঁজ হওয়া ঠেকানোর জন্য রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবারকে শিশুদের জন্য আস্থার জায়গা হতে হবে।

দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে পুলিশ সদর দপ্তরের জনসংযোগ ও গণমাধ্যম শাখার সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন আজকের পত্রিকাকে বলেন, নিখোঁজের ঘটনায় করা ৯০ শতাংশ জিডির সমাধান হয় এবং তাদের খুঁজে পাওয়া যায়। বাকিদের বিভিন্ন কারণে খুঁজে পাওয়া যায় না। এর মধ্যে কেউ পালিয়ে বিয়ে করে, কেউ আত্মগোপনে থাকে। তাই তাদের বিষয়ে সমাধান করা যায় না।