হোম > জাতীয়

৫০ লাখ অটোরিকশার ব্যাটারি রিচার্জে দৈনিক বিদ্যুৎ খরচ কত

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

ফাইল ছবি

বিশ্বজুড়ে যখন টেসলার মতো বৃহৎ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের উদ্ভাবিত বিলাসবহুল বৈদ্যুতিক গাড়ি (ইভি) নিয়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে, তখন বাংলাদেশে কোনো হাঁকডাক ছাড়াই গণপরিবহনে ঘটে চলেছে এক অন্যরকম নীরব বিপ্লব। দেশের নগর ও গ্রামাঞ্চলের প্রান্তিক মানুষের চলাচলের অন্যতম প্রধান ভরসা এখন ব্যাটারিচালিত রিকশা বা ইজিবাইক।

যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফারিন মেহনাজের একটি গবেষণাপত্রে বাংলাদেশের এই অপ্রাতিষ্ঠানিক বৈদ্যুতিক যানবাহন খাতের কারিগরি কাঠামো, বিদ্যুৎ ব্যবহার, জাতীয় গ্রিডের ওপর প্রভাব এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সামাজিক-অর্থনৈতিক পরিবর্তনের রূপরেখা উঠে এসেছে। তিনি গত বছর কোর্স ওয়ার্ক হিসেবে এই গবেষণাটি করেন। এ ছাড়া আরও কিছু গবেষণায় বাংলাদেশে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার বিস্তার, অর্থনৈতিক গুরুত্ব ও বিদ্যুৎ খাতের ওপর বাড়তি চাপের চিত্র উঠে এসেছে।

কারিগরি গঠন ও কার্যপ্রণালী

ঐতিহ্যবাহী কায়িক পরিশ্রমের পেডাল রিকশার (পা-চালিত রিকশা) আধুনিক সংস্করণ হলো এই ব্যাটারিচালিত রিকশা। স্থানীয় ওয়ার্কশপগুলোতে নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি এসব যানবাহনের প্রধান উপাদান চারটি: ১. বৈদ্যুতিক মোটর ২. ব্যাটারি প্যাক ৩. কন্ট্রোলার ৪. ইলেকট্রিক থ্রোটল।

গবেষণায় দেখা যায়, এসব ইজি বাইকে সাধারণত ১০০০ ওয়াট থেকে ১ হাজার ২৫০ ওয়াট ক্ষমতার ডিসি সিরিজ মোটর ব্যবহৃত হয়। যাত্রীর সিটের নিচে রাখা থাকে ১২ ভোল্টের ৪টি থেকে ৬টি লেড-অ্যাসিড ব্যাটারি (ইদানীং লিথিয়াম আয়ন বা নিকেল আয়ন ব্যাটারিও ব্যবহৃত হচ্ছে), যা একত্রে ৪৮ ভোল্ট ৭২ ভোল্টেজ এবং ১৪০ অ্যাম্পিয়ার আওয়ার (Ah) থেকে ১৬০ অ্যাম্পিয়ার আওয়ার (Ah) সক্ষমতা দিতে পারে।

একটি নতুন ব্যাটারি সম্পূর্ণ চার্জ হতে প্রায় ৮ ঘণ্টা সময় নেয়। তবে ৮ থেকে ১২ মাস ব্যবহারের পর কার্যক্ষমতা হ্রাস পাওয়ায় চার্জিংয়ের সময় বেড়ে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টায় দাঁড়ায়। প্রতিটি চার্জিং সাইকেলে গাড়িপ্রতি কমপক্ষে ৭ থেকে ১২ কিলোওয়াট-ঘণ্টা (kWh) বিদ্যুৎ ব্যয় হয়।

সাধারণত চালকেরা সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ৯টার মধ্যে যানবাহনগুলো বাণিজ্যিক গ্যারেজ বা গৃহস্থালি সংযোগের মাধ্যমে জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডে যুক্ত করেন।

বিদ্যুৎ খাতের ওপর চাপ

দেশে ব্যাটারিচালিত যানবাহনের দ্রুত বৃদ্ধি জাতীয় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে বিকেল ৫টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত যখন বিদ্যুৎ চাহিদার ‘পিক আওয়ার’ চলে, ঠিক সেই সময়েই বিপুলসংখ্যক ইজিবাইক চার্জে বসানো হয়।

দেশে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার নির্ভুল কোনো সরকারি হিসাব নেই। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) ২০ ধরনের মোটরযানের নিবন্ধন দিলেও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা সেই তালিকায় নেই। কর্মকর্তাদের অনুমান, বর্তমানে এ ধরনের যানবাহনের সংখ্যা ৫০ থেকে ৬০ লাখ। শুধু রাজধানীতেই রয়েছে ১৫ লাখের বেশি।

তবে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণায় বলা হয়েছে, দেশে প্রায় ৬০ লাখ ইলেকট্রিক থ্রি-হুইলার রয়েছে, যার প্রায় ২০ লাখই রাজধানীতে। প্রতিদিন প্রায় ১১ কোটি ২০ লাখ মানুষ এসব যান ব্যবহার করেন। অথচ মাত্র ৫ শতাংশ নিবন্ধিত, বাকি ৯৫ শতাংশই অনুমোদনহীন।

গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, এসব অটোরিকশার ৯০ শতাংশ দেশে তৈরি হলেও মোটর, কন্ট্রোলার ও চার্জারের মতো গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ চীন থেকে আমদানি করা হয়। এগুলো দৈনিক প্রায় ৭৫০ মেগাওয়াট, অর্থাৎ দেশের মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের প্রায় ৫ শতাংশ ব্যবহার করে। ঢাকায় অনুমোদিত চার্জিং স্টেশন মাত্র ৩ হাজার ৩০০টি হলেও অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট রয়েছে ৪৮ হাজার ১৩৬ টি। এতে বছরে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার।

আর বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্য অনুযায়ী, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার বর্তমান সংখ্যা প্রায় ৮০ লাখ। এসব অটোরিকশার মধ্যে প্রায় ২০ লাখ রাজধানী ঢাকায়।

সে হিসাবে দেশে চলমান আনুমানিক ৮০ লাখ ইজি বাইকের দৈনিক সর্বমোট বিদ্যুতের প্রয়োজন হয় প্রায় ৪২ হাজার MWh। প্রতিটি চার্জিং সাইকেলে গাড়িপ্রতি সর্বনিম্ন ৭ কিলোওয়াট-ঘণ্টা (kWh) বিদ্যুৎ চাহিদা বিবেচনায় এই চিত্র পাওয়া যায়।

তবে বর্তমানে বাংলাদেশে পিক আওয়ার বা সর্বোচ্চ সময়ে বিদ্যুতের দৈনিক চাহিদা প্রায় ১৭ হাজার থেকে ১৭ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। তবে আবহাওয়া ও গরমের ওপর ভিত্তি করে এই চাহিদা কিছুটা কম-বেশি হয়ে থাকে। এর বিপরীতে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৩৩ হাজার মেগাওয়াটের বেশি হলেও, গ্যাস ও কয়লা সংকটের কারণে বাস্তবে অনেক সময় চাহিদা অনুযায়ী পুরো বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হয় না।

এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, শুধু অটোরিকশার দৈনিক চাহিদা দেশের মোট উৎপাদনের চেয়ে বেশি হলে চলছে কীভাবে? এর একটি ব্যাখ্যা হলো, সব অটোরিকশা একসঙ্গে রিচার্জ করা হয় না। অনেক অটোরিকশাই পুরো দিন সচল থাকে না। কিছু অলস বসেও থাকে। ফলে দৈনিক পূর্ণ চার্জ দেওয়ারও প্রয়োজন হয় না।

কিন্তু পিক-আওয়ারে এই অতিরিক্ত বিদ্যুতের চাহিদার কারণে একদিকে যেমন গ্রিডের ওপর চাপ বাড়ে ও লোডশেডিংয়ের সৃষ্টি হয়, অন্যদিকে অফ-পিক সময়ে বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো অলস বসে থাকায় উৎপাদন খরচ ও সিস্টেম অপচয় বৃদ্ধি পায়।

রাত ৯টার মধ্যে দেশের সিংহভাগ ইজি বাইক বিদ্যুৎ সংযোগে যুক্ত হওয়াতে এই সংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করতে পারে।

কর্মসংস্থান ও আয় বৃদ্ধিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন

জাতীয় গ্রিডে চাপ সৃষ্টি করলেও দেশের নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর জন্য এই ইজি বাইক এক বিশাল সামাজিক ও অর্থনৈতিক আশীর্বাদ। তুলনামূলক কম ভাড়া—যাতায়াত ভেদে মাত্র ১০ টাকা থেকে ৫০ টাকা হওয়ায় সাধারণ যাত্রীদের কাছে এটি অত্যন্ত জনপ্রিয় ও সাশ্রয়ী।

একটি ব্যাটারিচালিত রিকশা ক্রয়ে খরচ হয় প্রায় ৫০ হাজার টাকা। ঢাকা শহরে একজন চালককে গাড়ির মালিককে দৈনিক জমা দিতে হয় গড়ে ৪০০ টাকা, যেখানে গ্রামীণ অঞ্চলে তা ২০০ টাকা। এ ছাড়া চার্জিং ও গ্যারেজ পার্কিং বাবদ চালকের দৈনিক খরচ হয় প্রায় ১০০ টাকা। মালিকের জমা ও চার্জিং খরচ মেটানোর পরও একজন চালকের দৈনিক নিট আয় থাকে ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা।

চালকেরা গড়ে প্রতিদিন ১০ ঘণ্টা কাজ করেন এবং ৪০টি ট্রিপে প্রায় ১০০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করেন। এর বিপরীতে, হাতে চালানো কায়িক রিকশাচালকদের দৈনিক আয় মাত্র ৬০০ থেকে ৯০০ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ। এটি তাঁদের শারীরিক শ্রমের তুলনায় অপর্যাপ্ত এবং যাত্রীদের জন্যও অত্যন্ত ধীর গতির।

সুনির্দিষ্ট নীতিমালার প্রয়োজনীয়তা

বাংলাদেশের ইজি বাইক খাতটি কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা বা সরকারি নীতিগত সহায়তা ছাড়াই সম্পূর্ণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে গড়ে উঠেছে। কিন্তু লাইসেন্সিং ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অভাবে বিশাল এই খাতটি এখনো আইনি সুরক্ষার বাইরে রয়ে গেছে। এই নীরব পরিবহন বিপ্লবকে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই করতে গবেষক ও খাত সংশ্লিষ্টরা বিভিন্ন সময় কিছু সুপারিশ তুলে ধরেছেন। এর মধ্যে অন্যতম হলো:

১. সমন্বিত নীতিমালা: স্থানীয় সরকার, বিদ্যুৎ বিভাগ এবং ম্যানুফ্যাকচারারদের যৌথ উদ্যোগে ইজি বাইকের নিবন্ধন ও রুট পারমিট সুনির্দিষ্ট করা।

২. নবায়নযোগ্য শক্তির প্রসার: মূল বিদ্যুৎ গ্রিডের ওপর চাপ কমাতে অফ-গ্রিড সোলার ভিত্তিক চার্জিং স্টেশন গড়ে তোলা।

৩. প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন: লেড-অ্যাসিড ব্যাটারির বদলে উন্নত ও দীর্ঘস্থায়ী লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির ব্যবহার উৎসাহিত করা।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গতি বজায় রাখতে এবং গ্রিন ট্রান্সপোর্ট খাতকে একটি সুসংগঠিত রূপ দিতে ইজি বাইককে সরকারি সুনির্দিষ্ট নীতিমালার আওতায় আনা এখন সময়ের দাবি।