হোম > জাতীয়

ডিএজি-এএজি নিয়োগ: সব দলীয় লোক চেয়ে আন্দোলনে একাংশ

এস এম নূর মোহাম্মদ, ঢাকা  

ফাইল ছবি

সুপ্রিম কোর্টে রাষ্ট্রের আইন কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্তদের কয়েকজনের বিরুদ্ধে আপত্তি জানিয়ে তাঁদের নিয়োগ বাতিলের দাবিতে আন্দোলন করছেন বিএনপি-সমর্থক আইনজীবীদের একটি অংশ। তাঁদের অভিযোগ, বিএনপির বাইরের কিছু আইনজীবী টাকার বিনিময়ে নিয়োগ পেয়েছেন।

আইনজ্ঞরা বলছেন, রাষ্ট্রের আইন কর্মকর্তা নিয়োগের জন্য সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড থাকলে নিয়োগের পর এমন অবস্থা হতো না। নিয়োগে বিতর্ক এড়াতে বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের সুপারিশ করা স্থায়ী অ্যাটর্নি সার্ভিস বাস্তবায়নের দাবি তাঁদের।

বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর গত ৩০ জুলাই সুপ্রিম কোর্টের জন্য ২৬৫ জন আইনজীবীকে আইন কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তাঁদের মধ্যে ৮৬ জন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল (ডিএজি) ও ১৭৯ জন সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল (এএজি)। এই নিয়োগের পর প্রায় প্রতিদিন জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের ব্যানারে আইনজীবীদের একটি অংশ বিএনপির বাইরের নিয়োগপ্রাপ্তদের নিয়োগ বাতিলের দাবিতে আন্দোলন করছেন। তাঁরা অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজলেরও পদত্যাগ চেয়েছেন। আন্দোলনকারীরা গত মঙ্গলবারও জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সভাপতির চেম্বারের সামনে বসে অবস্থান করেন। এ নিয়ে বিএনপি-সমর্থক আইনজীবীদের দুই পক্ষের মধ্যে কয়েক দিন আগে হাতাহাতিও হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মাসে ৮০ হাজার টাকা এবং ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ৯০ হাজার টাকা সম্মানি পান। এর বাইরে অন্য কোনো সুযোগ-সুবিধা নেই। নিয়োগের যোগ্যতা হিসেবে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল হতে সুপ্রিম কোর্টে ১০ বছর মামলা পরিচালনার অভিজ্ঞতা ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল হতে ৫ বছর মামলা করার অভিজ্ঞতা থাকতে হয়। নিয়োগের জন্য কোনো পরীক্ষা হয় না।

নিয়োগ বাতিলের আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারীদের অন্যতম এবিএম ইব্রাহিম খলিল বলেন, বিএনপির লোক ছাড়া অন্যদের আইন কর্মকর্তা নিয়োগ করার সুযোগ নেই। কেননা, এখানে সরকারের অনেক গোপনীয় বিষয় থাকে। অতীতেও সব সময় এমন হয়েছে। কিন্তু এবার জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি, সুশীল বেশ কয়েকজন নিয়োগ পেয়েছেন টাকার বিনিময়ে। একজন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। নিয়োগ পাওয়ার পর তিনি দেশে এসেছেন।

এ বি এম ইব্রাহিম খলিল বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল নিয়োগ পেয়েছিলেন। তবে এবার নিয়োগ পাননি। মাসে ৮০ থেকে ৯০ হাজার টাকা সম্মানির এই পদে নিয়োগের জন্য কেউ বিপুল অঙ্কের অর্থ কেন দেবেন–এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, কোনো কোনো আইন কর্মকর্তা পদের অপব্যবহার করে অবৈধ সুবিধা নেন।

অভিযোগের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘আমি নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ না। তবে সরকারের নিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যক্তির সততা, দক্ষতা, কর্মনিষ্ঠা ও রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্যের বিষয়টি বিবেচিত হয়েছে।’ তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ৩৩৭ জন আইন কর্মকর্তা ছিলেন। বর্তমান সরকার মনে করেছে, এত বেশিসংখ্যক প্রয়োজন নেই। কম নিয়োগের কারণে অনেকে বিবেচিত হননি। তাঁর মতে নিয়োগবঞ্চিত হওয়ার কারণেই আন্দোলন। কারও বিরুদ্ধে নিয়োগে লেনদেনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠলে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।

আইনজ্ঞরা বলছেন, বিচারক নিয়োগের মতো পরীক্ষা পদ্ধতির মাধ্যমে আইন কর্মকর্তা নিয়োগ করা হলে এমন অভিযোগ নাও উঠতে পারত। দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখতে এবং আদালত ব্যবস্থাপনায় গতি আনতে দীর্ঘদিন ধরেই স্থায়ী অ্যাটর্নি সার্ভিসের দাবি জানাচ্ছেন বিচারকসহ সংশ্লিষ্টরা। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর দায়িত্ব নেওয়া বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনকে স্থায়ী অ্যাটর্নি সার্ভিসের বিষয়ে লিখিত প্রস্তাব দিয়েছিল জুডিশিয়াল সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন। কমিশন বিচার বিভাগ সম্পূর্ণ স্বাধীন করতে পৃথক সচিবালয়ের পাশাপাশি স্থায়ী অ্যাটর্নি সার্ভিস প্রতিষ্ঠার সুপারিশ করেছিল।

জানতে চাইলে বিলুপ্ত বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের সদস্য ব্যারিস্টার তানিম হোসেইন শাওন আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘জাতীয় অ্যাটর্নি সার্ভিস অধ্যাদেশ’ নামে খসড়া আইনে আইন কর্মকর্তা নিয়োগে বিচারক নিয়োগের মতো পরীক্ষা পদ্ধতি রাখার প্রস্তাব করা হয়েছিল। তবে বিভিন্ন অংশীজনের আপত্তির কারণে নতুন খসড়া চূড়ান্ত করতে সময় লাগায় সেটি অধ্যাদেশ আকারে জারি করা যায়নি। পৃথক অ্যাটর্নি সার্ভিস করতে পারলে নিয়োগ নিয়ে কোনো অভিযোগ উঠতো না।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. শাহজাহান সাজু বলেন, রাষ্ট্রের আইন কর্মকর্তা নিয়োগের ভিত্তি হওয়া উচিত সততা, যোগ্যতা, পেশাগত দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা। সেই সঙ্গে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার ব্যবস্থা থাকা উচিত। তাহলে নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন উঠবে না। বিতর্কের অবসান ঘটাতে পৃথক অ্যাটর্নি সার্ভিস অবিলম্বে বাস্তবায়ন করা উচিত।

পৃথক অ্যাটর্নি সার্ভিসের বিষয়ে জানতে চাইলে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, এটি সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তের বিষয়। এ বিষয়ে তাঁর মন্তব্য করা সমীচীন হবে না।